প্রধান শিক্ষক
১৮ আগস্ট, ২০২৬ ০৮:২৮ পূর্বাহ্ণ
এআই ভয়েস ক্লোনিং: শিক্ষা ও সামাজিক ব্যবস্থায় নতুন সংকট
এআই ভয়েস ক্লোনিং: শিক্ষা ও সামাজিক ব্যবস্থায় নতুন সংকট
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি আপনি দেখেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনার একটি ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে আপনি এমন কিছু কথা বলছেন, যা আপনি কোনো দিনই বলেননি। অথবা আপনার কণ্ঠে এমন একটি অডিয়ো ভাইরাল হয়েছে, যা আপনি কখনো রেকর্ড করেননি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভিডিয়োটি এতটাই বাস্তব যে আপনার পরিবারের সদস্য, বন্ধু কিংবা সহকর্মীরাও সেটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করছেন। কয়েক বছর আগেও এমন একটি ঘটনা কল্পবিজ্ঞানের গল্প বলে মনে হতো; কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির ফলে আজ এটি বাস্তব। আমরা এমন এক সময়ে প্রবেশ করেছি, যেখানে শুধু মিথ্যা কথাই নয়, মিথ্যা প্রমাণও তৈরি করা সম্ভব। আর এখানেই ডিপফেক প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বিপদ।মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি প্রযুক্তি বিপ্লব মানুষের জীবনকে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী উদ্ভাবন। চিকিৎসা, কৃষি, শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প, ব্যবসা ও প্রশাসন সব ক্ষেত্রেই এআই ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা, ভাষা অনুবাদ, গবেষণা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং সৃজনশীল কাজে এআই ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কিন্তু প্রতিটি শক্তিশালী প্রযুক্তির মতো এআইও একটি দ্বিমুখী অস্ত্র। নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের অভাবে এর অপব্যবহার ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র এবং শিক্ষাব্যবস্থার জন্য গভীর সংকট সৃষ্টি করতে পারে। বর্তমানে সেই অপব্যবহারের সবচেয়ে আলোচিত দুটি রূপ হলো ডিপফেক এবং এআই ভয়েস ক্লোনিং।
ডিপফেক হলো এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে একজন ব্যক্তির মুখমণ্ডল অন্য একজনের শরীর বা ভিডিয়োর সঙ্গে এমনভাবে সংযুক্ত করা হয় যে তা বাস্তব ভিডিয়ো বলে মনে হয়। একইভাবে এআই ভয়েস ক্লোনিং প্রযুক্তির মাধ্যমে মাত্র কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মিনিটের অডিয়ো নমুনা ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির কণ্ঠস্বর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নকল করা যায়। ফলে এমন বক্তব্য, সাক্ষাৎকার বা ভিডিয়ো তৈরি করা সম্ভব, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কখনো বলেননি বা করেননি। প্রযুক্তির এই সক্ষমতা চলচ্চিত্র, ডাবিং, ভাষা শিক্ষা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তা এবং সৃজনশীল শিল্পে ইতিবাচকভাবে ব্যবহৃত হলেও, অনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কারণে বিশ্বজুড়ে সামাজিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রপ্রধান, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, বিচারপতি, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিল্পী এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিদের নিয়ে অসংখ্য ডিপফেক ভিডিয়ো ও ভুয়া অডিয়ো তৈরি হয়েছে। নির্বাচনকে প্রভাবিত করা, রাজনৈতিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো, ব্যক্তিগত চরিত্রহনন বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভুয়া ভিডিয়ো কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হলেও সামাজিক ক্ষতি, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মানুষের বিশ্বাসের সংকট অনেক ক্ষেত্রেই আর পুরোপুরি দূর করা যায় না।
সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিয়ো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগে মেটা ইন্ডিয়ার প্রধান অরুণ শ্রীনিবাসের বিরুদ্ধে মামলা করেছে হায়দরাবাদ পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগ।
পুলিশ জানিয়েছে, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে একাধিক ভুয়া ভিডিয়ো, ছবি ও বিভ্রান্তিকর পোস্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব কনটেন্টের বড় অংশই এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি হওয়ায় সাধারণ ব্যবহারকারীদের পক্ষে সেগুলোর সত্যতা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এরকম ঘটনা বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও ঘটছে।
ডিপফেক ও ভয়েস ক্লোনিংয়ের কারণে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট। একসময় ছবি ও ভিডিয়োকে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু এখন একটি ভিডিয়ো সত্য না কৃত্রিম, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে মানুষ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ধারণে বিভ্রান্ত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক সমাজে সঠিক তথ্যের ওপর জনমত গড়ে ওঠে; অথচ ডিপফেক সেই ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। এ কারণে একে অনেক গবেষক তথ্য বিশৃঙ্খলার নতুন রূপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রযুক্তির অপব্যবহারের বড় শিকার হয়ে উঠছে শিক্ষার্থীরা। বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশ শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়।তারা যেমন সহজেই ডিপফেক প্রযুক্তির শিকার হতে পারে, তেমনি কেউ কেউ না বুঝেই এ ধরনের কনটেন্ট তৈরিতে জড়িয়ে পড়তে পারে। কোনো সহপাঠীর ছবি ব্যবহার করে ব্যঙ্গাত্মক ভিডিয়ো তৈরি করা, শিক্ষকের কণ্ঠস্বর নকল করে ভুয়া ঘোষণা প্রচার করা, মিথ্যা অডিয়ো তৈরি করে সামাজিকভাবে হেয় করা বা পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে। এসব ঘটনা শুধু একটি শিক্ষার্থীর সম্মানহানি ঘটায় না; তার আত্মবিশ্বাস, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষাজীবন এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বর্তমানে সাইবার বুলিং নতুন মাত্রা পেয়েছে। আগে অপমানজনক মন্তব্য বা ছবি শেয়ার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন এআই ব্যবহার করে এমন ভিডিয়ো তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা দেখে অনেকেই সেটিকে বাস্তব বলে বিশ্বাস করেন। ফলে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা সামাজিক লজ্জা, মানসিক চাপ, হতাশা, উদ্বেগ এবং কখনো কখনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে অনীহা প্রকাশ করে। তাদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায়, আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়ে এবং সহপাঠীদের সঙ্গে সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, ডিজিটাল অপমানের ক্ষত অনেক সময় বাস্তব জীবনের অপমানের চেয়েও গভীর হতে পারে, কারণ অনলাইনের তথ্য দীর্ঘদিন ধরে ছড়িয়ে থাকে।
শিক্ষকরাও এই ঝুঁকির বাইরে নন। কোনো শিক্ষকের বক্তব্য বিকৃত করে বা কণ্ঠস্বর নকল করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ভিডিয়ো ছড়িয়ে দিলে শুধু একজন শিক্ষকই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, পুরো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশও অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস দুর্বল হলে শিক্ষার মৌলিক ভিত্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা স্থগিতের মিথ্যা ঘোষণা কিংবা ফলাফল পরিবর্তনের ভুয়া অডিয়ো প্রচার করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার আশঙ্কাও বেড়েছে।
এই বাস্তবতায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এর সামনে নতুন একটি দায়িত্ব এসে দাঁড়িয়েছে। এখন শুধু কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ব্যবহার শেখানো যথেষ্ট নয়; শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল সাক্ষরতা , মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা, এআই সাক্ষরতা এবং ডিজিটাল নাগরিকত্ব শেখানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তাদের জানতে হবে কীভাবে একটি ভিডিয়ো বা অডিয়োর সত্যতা যাচাই করতে হয়, কীভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করতে হয় এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে নৈতিকতার গুরুত্ব কী।
এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ইউনেস্কো ২০২৩ সালে প্রকাশিত Guidance for Generative AI in Education and Research-এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা, তথ্য যাচাই এবং শিক্ষার্থীদের এআই সাক্ষরতা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, যথাযথ নীতিমালা ও সচেতনতা ছাড়া এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার শিক্ষা, গবেষণা এবং সামাজিক বিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একইভাবে ইউনিসেফ শিশু ও কিশোরদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহার, অনলাইন সুরক্ষা এবং ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম ডিপফেককে বৈশ্বিক তথ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম উদীয়মান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা থাকলেও এআই-এর নৈতিক ব্যবহার, ডিপফেক শনাক্তকরণ, তথ্য যাচাই, অনলাইন নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল নাগরিকত্ব বিষয়ে পর্যাপ্ত পাঠ অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি ব্যবহার শিখছে, কিন্তু প্রযুক্তির ঝুঁকি সম্পর্কে সমানভাবে সচেতন হয়ে উঠছে না। এখন সময় এসেছে জাতীয় শিক্ষাক্রমে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার। পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অভিভাবক সচেতনতা, সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক কর্মশালা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ডিজিটাল সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি।
আইন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ডিপফেক শনাক্ত করার জন্য উন্নত সফটওয়্যার, দ্রুত তদন্ত ব্যবস্থা, কার্যকর সাইবার আইন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কোনো ভিডিয়ো বা অডিয়ো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেই সেটিকে সত্য বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রার একটি অনিবার্য অংশ। এই প্রযুক্তিকে থামানো সম্ভব নয়, আবার থামানোর প্রয়োজনও নেই। প্রয়োজন হলো এর নৈতিক, নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা প্রযুক্তির দক্ষ ব্যবহারকারী হওয়ার পাশাপাশি সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে সক্ষম, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন এবং দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে বেড়ে ওঠে। কারণ ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর নির্ভর করবে না; প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে ব্যবহারের জ্ঞান, বিচক্ষণতা ও মূল্যবোধের ওপরই নির্ভর করবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), ইমরান আহমদ সরকারি মহিলা কলেজ।
১৪
২৪ মন্তব্য