সিনিয়র শিক্ষক
২০ আগস্ট, ২০২৬ ০৮:০৬ অপরাহ্ণ
সরকারি কলেজের শিক্ষকতা থেকে বঙ্গভবন
সরকারি কলেজের শ্রেণিকক্ষে অর্থনীতির শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু। এরপর সরকারি কর্মকর্তা, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দলটির সংকটময় সময়েও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবার পা রাখতে যাচ্ছেন দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে। আজ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। শিক্ষকতা থেকে বঙ্গভবন—তাঁর দীর্ঘ পথচলায় যুক্ত হলো নতুন এক অধ্যায়।
রাজনীতির কঠিন সময়ে দলের হাল ধরার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে পড়া এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করার সময়ে দীর্ঘদিন দল পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মির্জা ফখরুল। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৭ বছরের শাসনামলে বিরোধী দলের রাজনীতির কারণে মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবাসসহ নানা চাপের মুখেও তাঁকে দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকতে হয়েছে।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের এই দীর্ঘ পথচলার শুরু অবশ্য রাজনীতির মঞ্চে নয়, শিক্ষকতা দিয়ে। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন। অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে ঢাকা কলেজসহ কয়েকটি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন তিনি।
শিক্ষকতার পাশাপাশি সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্বও পালন করেছেন মির্জা ফখরুল। ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর এস এ বারী পদত্যাগ করলে তিনি আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যন। পরে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মির্জা ফখরুল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী হিসেবে তিনি সংগঠনটির এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি।
১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দের পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে শিক্ষকতা ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি। ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এর পরপরই এরশাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগ দেন।
১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রথম বড় সাফল্য আসে ২০০১ খ্রিষ্টাব্দ। ওই বছরের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। বিএনপি সরকার গঠন করলে খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি মন্ত্রিসভায় ছিলেন।
২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের জাতীয় নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেনের কাছে পরাজিত হন মির্জা ফখরুল। তবে নির্বাচনী রাজনীতিতে পরাজয় তাঁর রাজনৈতিক পথচলাকে থামাতে পারেনি।
২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। সে সময় আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে। বিরোধী দলের রাজনীতিতে মির্জা ফখরুল ধীরে ধীরে বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।
২০১১ খ্রিষ্টাব্দের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা গেলে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মির্জা ফখরুলকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। এরপর প্রায় পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হন।
সেই থেকে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দলটির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্যতম কেন্দ্রীয় মুখ তিনি।
বিএনপির রাজনীতিতে মির্জা ফখরুলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৭ বছরের সময়কাল। ওই সময়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। ফলে দেশের রাজনীতির মাঠে দলীয় কর্মসূচি, নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে মির্জা ফখরুলকে সামনের সারিতে থাকতে হয়েছে।
বিরোধী দলের রাজনীতির কারণে এ সময়ে তিনি একাধিক মামলায় আসামি হন, গ্রেফতার ও কারাবরণ করেন। রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় তাঁকে আটক ও জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখিও হতে হয়েছে। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি।
এই সময়ের মির্জা ফখরুলকে অনেকটা ‘সংকটকালের সারথি’ হিসেবেই দেখেছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। সংসদে দলের উপস্থিতি সীমিত থাকা, শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি এবং দীর্ঘদিন রাজপথের আন্দোলনের মধ্যে দলকে সংগঠিত রাখার দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর।
২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী হন মির্জা ফখরুল। বগুড়া-৬ আসনে জয়ী হলেও বিএনপির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। পরে আসনটি শূন্য ঘোষণা করে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। এবার তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় সরকারের মন্ত্রিত্ব। তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন।
মন্ত্রিসভায় প্রায় ছয় মাস দায়িত্ব পালনের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতি পদকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দেয়।
আজ ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর দীর্ঘ পথচলায় যুক্ত হবে নতুন এক অধ্যায়।
একজন শিক্ষক হিসেবে যাঁর কর্মজীবনের শুরু, সেই মির্জা ফখরুলের সামনে তখন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র থেকে কলেজের শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা থেকে পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য থেকে প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব থেকে মহাসচিব—দীর্ঘ এই পথ পেরিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গন্তব্য হতে যাচ্ছে বঙ্গভবন।
তবে এই যাত্রা কেবল পদ-পদবির পরিবর্তনের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনীতির কয়েক দশকের উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম, কারাবাস ও প্রতিকূল সময়ের স্মৃতি। বিএনপির সংকটময় সময়ে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া মির্জা ফখরুলের জন্য রাষ্ট্রপতি পদে যাত্রা তাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।
১৪
২৪ মন্তব্য