সহকারী শিক্ষক
২২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
1. বাংলাদেশের স্কুল-কলেজে ব্যবহারিক শিক্ষা ও পরীক্ষার দুরবস্থা: সংকট ও সমাধানের পথ
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় তাত্ত্বিক জ্ঞানের ওপর অতি-নির্ভরতা থাকলেও ব্যবহারিক বা প্রাকটিক্যাল শিক্ষার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। সাধারণ স্কুল ও কলেজগুলোতে বিজ্ঞান ও কারিগরি বিষয়ের ব্যবহারিক ক্লাস এবং পরীক্ষা প্রক্রিয়া প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে কেবল নামকাওয়াস্তে আনুষ্ঠানিকতায়।
বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র
· নোটবই কপির সংস্কৃতি: শ্রেণিকক্ষে অধিকাংশ সময় প্রাকটিক্যাল ক্লাস হয় না। পরীক্ষার আগে বাজার থেকে কেনা গাইড বই বা সহপাঠীর খাতা দেখে 'প্রাকটিক্যাল নোটবুক' হুবহু কপি করাই মূল কাজে পরিণত হয়েছে।
· ঢালাও নম্বর বণ্টন: এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ব্যবহারিক খাতা জমা দেওয়া এবং উপস্থিতি দেখিয়েই ২৫ নম্বর বা নির্ধারিত নম্বরের সিংহভাগ প্রদান করা হয়, যা মূল্যায়নের নিরপেক্ষতা নষ্ট করে।
· অকার্যকর ল্যাবরেটরি: মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ স্কুলে ল্যাবরেটরি থাকলেও তা ধুলোবালি ও তালাবদ্ধ আলমারিতে বন্দি থাকে; অনেক জায়গায় কেমিক্যাল বা উপকরণের মেয়াদ বহু আগেই উত্তীর্ণ।
দুরবস্থার পেছনে মূল কারণসমূহ
· অবকাঠামো ও সরঞ্জামের চরম ঘাটতি: দেশের অর্ধেকেরও বেশি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত ল্যাবরেটরি কিংবা প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান ও যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে।
· প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব: বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ের ল্যাব পরিচালনার জন্য দক্ষ ল্যাব প্রদর্শক (Demonstrator) বা টেকনিশিয়ান বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে পদায়ন করা হয়নি।
· জিপিএ-কেন্দ্রিক মানসিকতা: জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা কেবল তত্ত্বীয় পরীক্ষার নম্বরকে প্রাধান্য দেন। ব্যবহারিক শিক্ষার শিখনফল অর্জনকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়।
· প্রশাসনের তদারকির অভাব: শিক্ষাবোর্ড বা স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত প্রাকটিক্যাল ক্লাস হচ্ছে কি না—তা তদারকি করার জন্য দৃশ্যমান কোনো মনিটরিং ব্যবস্থা নেই।
নেতিবাচক প্রভাব
হাতে-কলমে না শেখার কারণে শিক্ষার্থীরা বাস্তবভিত্তিক সমস্যা সমাধান ও গবেষণায় পিছিয়ে পড়ছে। ফলে উচ্চশিক্ষা বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক ল্যাব সরঞ্জাম পরিচালনায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়।
উত্তরণ ও প্রতিকারের উপায়
· ল্যাব আধুনিকীকরণ ও নির্দিষ্ট বাজেট: প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধুনিক ল্যাব গঠন এবং বার্ষিক বাজেটে কেমিক্যাল ও সরঞ্জাম কেনার জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
· পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার: কেবল খাতা জমাদানের মাধ্যমে নম্বর দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের সরাসরি পরীক্ষণ সম্পাদনের ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
· নিয়মিত নজরদারি: শিক্ষাবোর্ডের মাধ্যমে আকস্মিক ল্যাব পরিদর্শন ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু করে নিয়মিত ব্যবহারিক ক্লাস নিশ্চিত করতে হবে।
· প্রশিক্ষণ ও পদায়ন: বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষকদের ব্যবহারিক ক্লাসের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দক্ষ ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ দেওয়া জরুরি।
· ডিজিটাল ও ভার্চুয়াল ল্যাবের ব্যবহার: যেসব দুর্গম এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ ল্যাব স্থাপন সম্ভব নয়, সেখানে সিমুলেশনভিত্তিক সফটওয়্যার বা ভার্চুয়াল ল্যাব প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাথমিক পরিচিতি ঘটানো যেতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর বর্তমান বিশ্বে মুখস্থবিদ্যার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে হাতে-কলমে শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প নেই। প্রাকটিক্যাল ক্লাসের কার্যকারিতা ফেরানোই পারে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দক্ষ ও মানসম্মত নতুন প্রজন্ম তৈরি করতে।
১৪
২৪ মন্তব্য