Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৫ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:৫৪ পূর্বাহ্ণ

সৃষ্টির সেবা ও মানবকল্যাণ—ইসলামের মহান শিক্ষা - মোঃ মুজিবুর রহমান

সৃষ্টির সেবা মানবকল্যাণইসলামের মহান শিক্ষা

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর

ভূমিকা

মানুষ সামাজিক জীব। একা কেউ পরিপূর্ণভাবে বাঁচতে পারে না; পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা, ভালোবাসা সেবার মধ্য দিয়েই মানুষের জীবন সুন্দর, নিরাপদ অর্থবহ হয়ে ওঠে। মহান আল্লাহ মানুষকে শুধু নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য পৃথিবীতে পাঠাননি; বরং ন্যায়, সততা, দয়া, দায়িত্ববোধ কল্যাণের পথে জীবন পরিচালনার শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষের প্রতি সদাচরণ, বিপদগ্রস্তের সাহায্য, ক্ষুধার্তকে খাদ্যদান, অসুস্থের সেবা, এতিম-দরিদ্রের প্রতি সহমর্মিতা, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা এবং জীবজন্তু পরিবেশের প্রতি দয়াসবই ইসলামের মানবিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ইসলামের দৃষ্টিতে সেবা কেবল অর্থ দানের নাম নয়। একটি আন্তরিক হাসি, একটি সান্ত্বনার কথা, একজন অসহায় মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা, পথহারা মানুষকে পথ দেখানো, বৃদ্ধকে সম্মান করা, শিশুকে শিক্ষা দেওয়া, বিপদে বন্ধুর পাশে দাঁড়ানোএসবও মানবসেবার অন্তর্ভুক্ত। তাই মানুষের কল্যাণে নিবেদিত জীবনই প্রকৃত অর্থে মহৎ জীবন।

সৃষ্টির প্রতি দায়িত্ব

এই পৃথিবী মহান আল্লাহর অপূর্ব সৃষ্টি। আকাশ, বাতাস, নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বন, বৃক্ষ, পশু-পাখি অসংখ্য জীবের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে আমাদের সুন্দর পৃথিবী। মানুষ এই সৃষ্টিজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং তাকে বিশেষ মর্যাদাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মর্যাদার সঙ্গে দায়িত্বও রয়েছে।

মানুষের দায়িত্ব হলো পৃথিবীতে অন্যায়, জুলুম ধ্বংস সৃষ্টি না করে কল্যাণ, শান্তি ন্যায় প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা। নিজের প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি অন্যের প্রয়োজনের প্রতিও সচেতন হওয়া একজন দায়িত্বশীল মানুষের পরিচয়।

তাই জীবনের প্রশ্ন শুধু এই নয়—‘আমি কী পেলাম?’ বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘আমি অন্যের জন্য কী করলাম?’, ‘আমার কারণে কতজন উপকৃত হলো?’, ‘আমার জ্ঞান, শ্রম, সম্পদ সময় কি মানুষের কাজে লাগল?’

মানবসেবাই মহৎ কাজ

মানুষের কষ্ট লাঘব করা ইসলামের অন্যতম মহৎ শিক্ষা। ক্ষুধার্ত মানুষকে খাদ্য দেওয়া, তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ নেওয়া, বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানবিকতার উজ্জ্বল প্রকাশ।

কেউ হয়তো অনেক অর্থের মালিক; আবার কেউ অর্থ দিতে না পারলেও শ্রম, সময়, জ্ঞান ভালোবাসা দিয়ে অন্যের উপকার করতে পারে। একজন শিক্ষক জ্ঞান দিয়ে সেবা করেন, একজন চিকিৎসক চিকিসার মাধ্যমে সেবা করেন, একজন কৃষক খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে সেবা করেন, একজন শ্রমিক শ্রম দিয়ে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। এভাবেই প্রত্যেক মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে সমাজের কল্যাণে অবদান রাখতে পারে।

সুতরাং মানবসেবার জন্য ধনী হওয়া আবশ্যক নয়; প্রয়োজন আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ কল্যাণের মানসিকতা।

দয়া ইসলামের সৌন্দর্য

ইসলামের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো দয়া রহমত। মহান আল্লাহর অন্যতম গুণ হলো তিনি পরম করুণাময় অসীম দয়ালু। তাঁর বান্দাদেরও দয়া, মমতা কোমলতার গুণে গুণান্বিত হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

একটি কঠিন হৃদয় মানুষের কষ্ট অনুভব করতে পারে না। কিন্তু মমতাময় হৃদয় অন্যের দুঃখে ব্যথিত হয় এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। বৃদ্ধকে সম্মান করা, এতিমের মাথায় স্নেহের হাত রাখা, দরিদ্রকে অপমান না করা, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোএসব দয়ার বাস্তব প্রকাশ।

বিশেষ করে সাহায্য করার সময় মানুষের সম্মান রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দান বা সহযোগিতার মাধ্যমে কাউকে অপমান করা উচিত নয়। এমন সাহায্যই উত্তম, যার মধ্যে থাকে ভালোবাসা, গোপনীয়তা, সম্মান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য।

প্রতিবেশীর অধিকার

মানুষের মানবিক দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ। প্রতিবেশী শুধু পাশের বাড়িতে বসবাসকারী মানুষ নয়; তারও নিরাপত্তা, শান্তি, সম্মান অধিকার রয়েছে।

প্রতিবেশী মুসলিম হোক বা অন্য ধর্মের অনুসারীতার সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত সদাচরণ করা উচিত। তার ঘরে অশান্তি সৃষ্টি করা, তার গোপনীয়তা নষ্ট করা, তাকে কষ্ট দেওয়া বা তার অধিকার হরণ করা ইসলামী নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

প্রতিবেশী অসুস্থ হলে তার খোঁজ নেওয়া, বিপদে সাহায্য করা, অভাবের সময় সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা এবং তার সুখে আনন্দিত হওয়া একটি সুন্দর সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

বড় বড় বক্তৃতায় সমাজ পরিবর্তন হয় না; বরং ঘরে ঘরে ছোট ছোট ভালো কাজের সমষ্টিতেই একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে।

পরিবার থেকেই মানবসেবার শিক্ষা

মানবসেবার প্রথম বিদ্যালয় হলো পরিবার। যে ব্যক্তি বাইরের মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলে কিন্তু নিজের মা-বাবা, স্ত্রী, সন্তান বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করে, তার মানবিকতা পূর্ণাঙ্গ নয়।

মা-বাবার প্রতি সদাচরণ, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার রক্ষা, সন্তানদের ভালোবাসা সুশিক্ষা দেওয়া এবং পরিবারের দুর্বল সদস্যদের যত্ন নেওয়া প্রত্যেকের দায়িত্ব।

একটি শান্তিপূর্ণ পরিবারই একটি শান্তিপূর্ণ সমাজের ভিত্তি। পরিবারে যদি ভালোবাসা, ক্ষমা, সহযোগিতা, দায়িত্ববোধ পারস্পরিক সম্মান থাকে, তাহলে সেই মূল্যবোধ ধীরে ধীরে সমাজেও ছড়িয়ে পড়ে।

জ্ঞান মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে

জ্ঞান মহান আল্লাহর একটি বিশেষ নিয়ামত। কিন্তু জ্ঞান তখনই প্রকৃত অর্থে মূল্যবান হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।

শিক্ষকের জ্ঞান শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ে। চিকিসকের জ্ঞান অসুস্থ মানুষের জীবন রক্ষায় কাজে লাগে। কৃষিবিদের জ্ঞান কৃষকের পাদন বাড়াতে সহায়তা করে। প্রযুক্তিবিদের জ্ঞান মানুষের জীবনকে সহজ করে। আলেমের জ্ঞান মানুষকে সত্য ন্যায়ের পথ দেখায়।

কিন্তু জ্ঞান যদি অহংকার সৃষ্টি করে, মানুষকে তুচ্ছ করতে শেখায় এবং সমাজের কল্যাণে কোনো ভূমিকা না রাখে, তবে সেই জ্ঞান তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করে না।

তাই নিজে শেখার পাশাপাশি অন্যকে শেখানো, অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করা এবং জ্ঞানকে মানুষের উপকারে ব্যবহার করা প্রত্যেক জ্ঞানীর দায়িত্ব।

সুন্দর কথাও এক ধরনের সেবা

মানুষের সেবার জন্য সবসময় অর্থ বা বস্তু প্রয়োজন হয় না। একটি সুন্দর কথা কখনো কখনো একজন হতাশ মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালাতে পারে।

হতাশ হয়ো না, ‘আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো, ‘আমি তোমার পাশে আছি’—এমন আন্তরিক কথা দুঃখী মানুষের হৃদয়ে সাহস সৃষ্টি করতে পারে। বিপরীতে কটু কথা, অপমান, বিদ্রূপ, গীবত অপবাদ মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে।

তাই আমাদের জবানকে নিরাপদ রাখা জরুরি। সত্য কথা বলতে হবে, তবে তা বলতে হবে প্রজ্ঞা, ভদ্রতা কোমলতার সঙ্গে। সুন্দর ভাষা সম্পর্ক গড়ে; কটু ভাষা সম্পর্ক ভেঙে দেয়।

দান সহযোগিতার সঠিক পদ্ধতি

ইসলামে জাকাত, সদকা, ফিতরা বিভিন্ন ধরনের দানের মাধ্যমে সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা রয়েছে। এসবের উদ্দেশ্য শুধু সম্পদ বণ্টন নয়; বরং সমাজে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি করা।

তবে দানের সঙ্গে সততা হালাল উপার্জনের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের অধিকার হরণ করে, প্রতারণা করে বা অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদ দিয়ে কল্যাণের কাজ করলেই তা নৈতিকভাবে সঠিক হয়ে যায় না।

মানুষের হক নষ্ট করে কোনো দান প্রকৃত কল্যাণ হতে পারে না। তাই উপার্জন হতে হবে হালাল, লেনদেন হতে হবে সৎ, আমানত হতে হবে নিরাপদ এবং দান হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।

জীবজন্তু প্রাণীর প্রতি দয়া

ইসলামের মানবিক শিক্ষা শুধু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রাণী অন্যান্য সৃষ্টির প্রতিও দয়া প্রদর্শনের নির্দেশ দেয়। পশু-পাখিরও জীবন অনুভূতি রয়েছে। তাই অকারণে কোনো প্রাণীকে কষ্ট দেওয়া, নির্যাতন করা বা বিনোদনের জন্য যন্ত্রণা দেওয়া অনুচিত।

তৃষ্ণার্ত প্রাণীকে পানি দেওয়া, ক্ষুধার্ত প্রাণীকে খাদ্য দেওয়া এবং তাদের অযথা কষ্ট না দেওয়া দয়ার পরিচয়। পাখির বাসা অকারণে নষ্ট না করা এবং গৃহপালিত প্রাণীর যথাযথ যত্ন নেওয়াও দায়িত্বশীলতার অংশ।

থেকে বোঝা যায়, সত্যিকারের মমতাময় হৃদয় শুধু মানুষের প্রতি নয়, আল্লাহর সমগ্র সৃষ্টির প্রতিই সহানুভূতিশীল হয়।

পরিবেশ রক্ষাও মানবকল্যাণ

মানুষের জীবন প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, পানি জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য এবং সুস্থ পরিবেশ মানুষের জীবনকে নিরাপদ রাখে।

তাই বৃক্ষরোপণ, পানি সংরক্ষণ, পরিবেশ দূষণ রোধ, নদী-খাল রক্ষা, প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় রোধ করা আমাদের দায়িত্ব।

একটি গাছ লাগানো শুধু আজকের জন্য নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি উপহার। পরিবেশ রক্ষা তাই মানবসেবা ভবিষ্য প্রজন্মের অধিকার রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কর্মক্ষেত্রে সেবার আদর্শ

প্রত্যেক পেশার মধ্যেই মানবসেবার সুযোগ রয়েছে। একজন শিক্ষক যদি আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করেন, তবে তিনি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। একজন চিকিসক দায়িত্বশীলতার সঙ্গে চিকিসা দিলে তিনি মানুষের জীবন রক্ষায় অবদান রাখেন।

একজন ব্যবসায়ী যদি প্রতারণা না করেন, সঠিক পণ্য ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করেন, তবে তিনিও সমাজসেবা করেন। কৃষক খাদ্য উৎপাদন করেন, শ্রমিক অবকাঠামো নির্মাণ করেন, কারিগর প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরি করেনসবাই সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সেবক।

তাই বড় পদে থাকা মানবসেবার শর্ত নয়। বরং নিজের দায়িত্ব সততা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করাই বড় কথা।

ক্ষমা সহনশীলতা

মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। প্রত্যেক মানুষেরই ভুল হতে পারে। তাই ভুলের ক্ষেত্রে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া, ক্ষমাশীল হওয়া এবং অযথা প্রতিহিংসা না পোষণ করা মহৎ চরিত্রের লক্ষণ।

তবে ক্ষমা মানে অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। অন্যায় বন্ধ করতে হবে, অধিকার রক্ষা করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু ব্যক্তিগত ক্রোধ, প্রতিহিংসা অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমার পথ বেছে নেওয়া একজন মুমিনের মহৎ গুণ।

ক্ষমাশীলতা মানুষের হৃদয়কে প্রশান্ত করে এবং সমাজে বিদ্বেষের পরিবর্তে ভালোবাসার পরিবেশ সৃষ্টি করে।

সহযোগিতার মাধ্যমে কল্যাণ প্রতিষ্ঠা

একজন মানুষ একা সমাজের সব সমস্যা সমাধান করতে পারে না। এজন্য প্রয়োজন পারস্পরিক সহযোগিতা। সৎ কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করা এবং অন্যায় কাজে সহযোগিতা না করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নীতি।

সমাজের ধনী ব্যক্তি অর্থ দিয়ে, শিক্ষিত ব্যক্তি জ্ঞান দিয়ে, শ্রমিক শ্রম দিয়ে, শিক্ষক শিক্ষা দিয়ে, চিকিৎসক চিকিসা দিয়ে এবং তরুণেরা সময় শক্তি দিয়ে সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারে।

যখন মানুষের শক্তি একত্রিত হয়, তখন ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সহযোগিতার হাত তাই একটি সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক মানবিক সমাজের অন্যতম ভিত্তি।

আধুনিক পৃথিবীতে মানবিকতার প্রয়োজন

আজ বিজ্ঞান প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে অভূতপূর্বভাবে সহজ করেছে। পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে যোগাযোগ করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের পরিচিতির সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু প্রযুক্তিগত নৈকট্য সবসময় হৃদয়ের নৈকট্য তৈরি করে না।

অনেক মানুষের চারপাশে অসংখ্য পরিচিত মানুষ থাকলেও তারা একাকিত্ব হতাশায় ভোগে। তাই আধুনিক সমাজে শুধু প্রযুক্তির উন্নয়ন নয়, মানবিকতারও উন্নয়ন প্রয়োজন।

বৃদ্ধ যেন অবহেলায় না কাঁদেন, শিশু যেন নিরাপদে বেড়ে ওঠে, দরিদ্র যেন অপমানিত না হয়, অসুস্থ যেন একা পড়ে না থাকে, দুর্বল যেন শক্তিশালীর জুলুমের শিকার না হয়এমন একটি সমাজ গঠনই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

প্রকৃত মুমিনের চরিত্র

ঈমান শুধু মুখের দাবি নয়; ঈমানের প্রভাব মানুষের চরিত্র আচরণে প্রকাশ পেতে হয়। নামাজ মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে, রোজা আত্মসংযম শেখায়, জাকাত মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে এবং কুরআন ন্যায় কল্যাণের পথে পরিচালিত করে।

যার হাতে মানুষ নিরাপদ, যার মুখের কথায় অন্যের ভয় দূর হয়, যার হৃদয় অন্যের দুঃখে ব্যথিত হয় এবং যে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অন্যের জন্যও তা পছন্দ করেতার চরিত্রে ঈমানের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।

অতএব প্রকৃত ধার্মিকতা মানুষের প্রতি দায়িত্বহীন হতে শেখায় না; বরং মানুষকে আরও দয়ালু, ন্যায়পরায়ণ, দায়িত্বশীল উপকারী করে তোলে।

সাফল্যের প্রকৃত সংজ্ঞা

বর্তমান সমাজে সাফল্যকে অনেক সময় অর্থ, সম্পদ, ক্ষমতা, পদ খ্যাতির সঙ্গে তুলনা করা হয়। কিন্তু এগুলো জীবনের একমাত্র সাফল্য নয়। প্রকৃত সাফল্য হলো এমন জীবন গড়ে তোলা, যার মাধ্যমে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন এবং মানুষ উপকৃত হয়।

মানুষের উপকারে আসে এমন জ্ঞান, সৎভাবে অর্জিত সম্পদ, মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা শ্রম, দুঃখীর পাশে দাঁড়ানো সময় এবং সত্য ন্যায়ের পক্ষে দেওয়া সাহসএসবই জীবনের প্রকৃত সম্পদ।

মানুষ হয়তো কোনো একদিন আমাদের দান বা উপকার ভুলে যেতে পারে; কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো সৎকর্মই অজানা থাকে না। তাই প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সেবা করা উচিত।

ছোট কাজের বড় মূল্য

মানবসেবা সবসময় বড় কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে করতে হয় না। রাস্তা থেকে একটি কাঁটা সরিয়ে দেওয়া, একজন অন্ধ মানুষকে পথ দেখানো, বৃদ্ধকে বসার জায়গা করে দেওয়া, তৃষ্ণার্তকে পানি দেওয়া, অসুস্থের খোঁজ নেওয়া, শিশুকে পড়ানো কিংবা একজন হতাশ মানুষের কথা মন দিয়ে শোনাএসব ছোট কাজও মানুষের জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

একটি প্রদীপ যেমন অন্ধকার দূর করে, তেমনি একটি ভালো কাজও কারও জীবনে আশার আলো জ্বালাতে পারে। তাই কোনো ভালো কাজকে ছোট মনে করা উচিত নয়।

সেবার মূল ভিত্তিনিয়তের বিশুদ্ধতা

ইসলামে কাজের বাহ্যিক রূপের পাশাপাশি নিয়তের গুরুত্বও অপরিসীম। মানুষকে দেখানোর জন্য করা সেবা একরকম; আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা সেবা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তাই সেবা করার সময় মনে রাখতে হবেমানুষের প্রশংসা পাওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়; আমার উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। কেউ জানুক বা না জানুক, কেউ কৃতজ্ঞ হোক বা না হোক, আমি যদি আন্তরিকভাবে কল্যাণ করি, তবে আমার শ্রম বৃথা যাবে না।

বিশুদ্ধ নিয়ত সামান্য কাজকেও মহৎ করে তুলতে পারে।

আমাদের করণীয়

মানবকল্যাণকে জীবনের বাস্তব কর্মসূচিতে পরিণত করতে হলে আমাদের প্রত্যেককে নিজের অবস্থান থেকে কিছু দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। আমরা

  • সত্য কথা বলব এবং আমানত রক্ষা করব।

  • অন্যের অধিকার হরণ করব না।

  • মা-বাবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সদাচরণ করব।

  • প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করব।

  • অসুস্থ, দরিদ্র, এতিম অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াব।

  • সামর্থ্য অনুযায়ী জাকাত, সদকা দান করব।

  • সাহায্য করার সময় মানুষের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখব।

  • জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করব।

  • গীবত, অপবাদ, কটূক্তি অশ্লীল ভাষা পরিহার করব।

  • জীবজন্তুর প্রতি দয়া করব।

  • বৃক্ষরোপণ পরিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখব।

  • কর্মক্ষেত্রে সততা নিষ্ঠা বজায় রাখব।

  • সৎ কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করব।

  • অন্যায় পাপের কাজে কাউকে সহযোগিতা করব না।

  • রাগের সময় সংযমী এবং ভুলের ক্ষেত্রে ক্ষমাশীল হওয়ার চেষ্টা করব।

  • মানুষের উপকার করব আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।

উপসংহার

সৃষ্টির সেবা মানবকল্যাণ ইসলামের কোনো গৌণ শিক্ষা নয়; বরং ইসলামের নৈতিক সামাজিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের অধিকার রক্ষা, সৃষ্টির প্রতি দয়া, ন্যায় প্রতিষ্ঠা, দুর্বলকে সহযোগিতা, প্রতিবেশীর যত্ন, পরিবারকে ভালোবাসা, জ্ঞান বিতরণ, পরিবেশ রক্ষা এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্বও আমাদের পালন করতে হবে।

আমাদের জীবন যেন শুধু আমিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত না হয়। আমাদের চিন্তায় থাকুক আমরা; আমাদের কাজে থাকুক মানুষের কল্যাণ; আমাদের হৃদয়ে থাকুক দয়া; আমাদের কথায় থাকুক সত্য মাধুর্য; আমাদের উপার্জনে থাকুক হালাল সততা; আমাদের আচরণে থাকুক ন্যায়; আর আমাদের সব ভালো কাজের চূড়ান্ত লক্ষ্য হোক মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি।

তাই আজ আমাদের অঙ্গীকার হোকক্ষুধার্তের পাশে অন্ন নিয়ে দাঁড়াব, অসহায়ের পাশে মমতা নিয়ে দাঁড়াব, দুঃখীর পাশে সান্ত্বনা হয়ে দাঁড়াব, অন্ধকারে আশার প্রদীপ জ্বালাব। প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করব, পরিবারকে ভালোবাসব, পশু-পাখির প্রতি দয়া করব, পরিবেশ রক্ষা করব, সত্য আমানতকে আঁকড়ে ধরব এবং অন্যের অধিকার কখনো নষ্ট করব না।

আমরা এমন মানুষ হতে চাই, যাদের কারণে মানুষের কষ্ট কমে, হতাশ মানুষের মনে আশা জাগে, সমাজে শান্তি বাড়ে, ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পৃথিবীতে দয়া মানবতার আলো ছড়িয়ে পড়ে।

হে মহান আল্লাহ! আমাদের এমন হৃদয় দান করুন, যে হৃদয় মানুষের দুঃখে ব্যথিত হয়; এমন হাত দান করুন, যে হাত কল্যাণে এগিয়ে যায়; এমন জ্ঞান দান করুন, যা মানুষের উপকারে আসে; এমন জবান দান করুন, যা সত্য সুন্দর কথা বলে; এমন চরিত্র দান করুন, যা আপনার সন্তুষ্টি অর্জন করে। আমাদের দ্বারা আপনার সৃষ্টির কল্যাণ সাধিত হোক, মানুষের কষ্ট লাঘব হোক, সমাজে ন্যায় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক এবং পৃথিবীতে দয়া, ভালোবাসা মানবতার আলো ছড়িয়ে পড়ুক। আমিন।

সৃষ্টির সেবা হোক আমাদের ব্রত, মানবকল্যাণ হোক আমাদের কর্ম, ন্যায় তাকওয়া হোক আমাদের পথ, আর আল্লাহর সন্তুষ্টি হোক আমাদের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ