সহকারী শিক্ষক
২৫ আগস্ট, ২০২৬ ০৭:৫১ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
বহু বছর ধরে গাইড বই, নোট ও সাজেশন দেখে উত্তর মুখস্থ করার প্রবণতা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য অনেক শিক্ষার্থী বিষয়টি বুঝে শেখার পরিবর্তে নির্দিষ্ট প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর মুখস্থ করতেই বেশি গুরুত্ব দেয়। এর ফলে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি যুক্তি, বিশ্লেষণ, সমস্যা সমাধান ও সৃজনশীল চিন্তার দক্ষতা যথেষ্ট বিকশিত হয় না।
বর্তমানে জেনারেটিভ এআই এই বাস্তবতাকে আরও নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এআই একটি রচনা লিখে দিতে, কঠিন প্রশ্নের উত্তর তৈরি করতে কিংবা কোনো বিষয় ব্যাখ্যা করতে পারে। এটি শিক্ষার জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করলেও ভুলভাবে ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীর নিজের চিন্তা করার অভ্যাস দুর্বল হয়ে যেতে পারে। শিক্ষার্থী যদি কোনো বিষয় বোঝার চেষ্টা না করে শুধু এআই থেকে প্রস্তুত উত্তর নিয়ে তা জমা দেয় বা মুখস্থ করে, তাহলে প্রযুক্তি তার শেখার সহায়ক না হয়ে চিন্তার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
তাই এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত—এআই কি শিক্ষার্থীর হয়ে চিন্তা করবে, নাকি শিক্ষার্থীকে আরও ভালোভাবে চিন্তা করতে সাহায্য করবে?
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় জাতীয় পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন—
১. মুখস্থ উত্তরের পরিবর্তে যুক্তি ও ব্যাখ্যা
একটি প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর কী—তার পাশাপাশি কেন এমন উত্তর হলো, শিক্ষার্থী কীভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছাল এবং তার যুক্তি কী—এসব মূল্যায়ন করা দরকার।
২. বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান
শিক্ষার্থীদের এমন সমস্যা দেওয়া যেতে পারে, যার উত্তর বইয়ে হুবহু নেই। এতে তারা নিজেদের জ্ঞান ব্যবহার করে সমাধান খুঁজতে শিখবে।
৩. সৃজনশীল ও মুক্ত প্রশ্ন
একটি সমস্যার একাধিক সম্ভাব্য সমাধান থাকতে পারে—এমন প্রশ্ন শিক্ষার্থীর মৌলিক চিন্তা ও সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করবে।
৪. এআই-সহায়ক শিক্ষার দক্ষতা
এআইকে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হয়, সেটিও শেখানো জরুরি। শিক্ষার্থীকে জানতে হবে—এআইয়ের উত্তর যাচাই করা, ভুল শনাক্ত করা, তথ্যের উৎস খোঁজা এবং নিজের চিন্তার সঙ্গে এআইয়ের পরামর্শের তুলনা করা।
৫. প্রক্রিয়াভিত্তিক মূল্যায়ন
শুধু চূড়ান্ত উত্তর নয়, শিক্ষার্থী কীভাবে গবেষণা করেছে, কীভাবে চিন্তা করেছে এবং কীভাবে সমাধানে পৌঁছেছে—সেটিও মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত।
আসলে এআইয়ের যুগে তথ্য মনে রাখার ক্ষমতার গুরুত্ব কমছে, কিন্তু তথ্যকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতার গুরুত্ব বাড়ছে। কারণ একটি তথ্য বা উত্তর খুঁজে পাওয়া এখন আগের তুলনায় অনেক সহজ। কিন্তু সেই তথ্য সত্য কি না, কোন পরিস্থিতিতে তা ব্যবহার করা যাবে, এর সীমাবদ্ধতা কী এবং এর ভিত্তিতে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত—এসব নির্ধারণ করতে মানুষের মৌলিক চিন্তাশক্তিই প্রয়োজন।
তাই ভবিষ্যতের শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু “শিক্ষার্থী কী জানে” তা যাচাই করা নয়; বরং “শিক্ষার্থী কীভাবে চিন্তা করে, প্রশ্ন করে, যুক্তি দেয়, সমস্যা সমাধান করে এবং নতুন কিছু তৈরি করতে পারে”—তা মূল্যায়ন করা।
গাইড বইয়ের মুখস্থবিদ্যা যেমন শিক্ষার্থীর মৌলিক চিন্তার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও একই সমস্যা তৈরি করতে পারে। পার্থক্য শুধু মাধ্যমের। আগে শিক্ষার্থী বই থেকে প্রস্তুত উত্তর মুখস্থ করত, এখন চাইলে এআই থেকে প্রস্তুত উত্তর পেতে পারে।
তাই সমাধান এআইকে দূরে সরিয়ে রাখা নয়; বরং এআই ব্যবহারের মধ্য দিয়েই শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তিকে আরও শক্তিশালী করা। নতুন পাঠ্যক্রমে এমন শিক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে মুখস্থ উত্তর নয়, প্রশ্ন করার ক্ষমতা; তথ্য নয়, তার প্রয়োগ; এবং নির্দিষ্ট উত্তর নয়, যুক্তিনির্ভর চিন্তা ও সৃজনশীলতাই হবে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি।
৫
৬ মন্তব্য