সিনিয়র শিক্ষক
২৬ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৫৭ অপরাহ্ণ
যে আদর্শে সমাজ গড়েছেন নবীজি (সা.)
যে আদর্শে সমাজ গড়েছেন নবীজি (সা.)
ফয়সল আহমদ বাবুল
মানবসভ্যতার ইতিহাসে সমাজ পরিবর্তনের বহু চেষ্টা হয়েছে। কেউ আইন করেছেন। কেউ রাষ্ট্র গড়েছেন। কেউ অর্থনৈতিক সংস্কার করেছেন। কিন্তু মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সমাজগঠন ছিল ভিন্নধর্মী। তিনি শুধু সমাজের কাঠামো বদলাননি। মানুষের মনও বদলেছেন। মানুষের চরিত্র গড়েছেন। তাঁর সমাজের ভিত্তি ছিল ঈমান, ন্যায়, মানবিক মর্যাদা, ভ্রাতৃত্ব, জ্ঞান ও দায়িত্ববোধ। তাই তাঁর গড়া সমাজ ইতিহাসে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
নবীজি (সা.) মানুষের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। বংশ মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়। সম্পদও নয়। জাতি বা গোত্রও নয়। পবিত্র কুরআনে সূরা আল-হুজুরাতের ১৩ আয়াতে বলেছে, মানুষকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে সৃষ্টি করা হয়েছে পরিচয়ের জন্য। আল্লাহর কাছে মর্যাদার মাপকাঠি হলো তাকওয়া। এই শিক্ষা সমাজে সাম্যের ভিত্তি তৈরি করে। বিলাল (রা.) ছিলেন একজন মুক্তদাস। তবু তিনি ইসলামী সমাজে অত্যন্ত সম্মানিত ছিলেন। সালমান ফারসি (রা.) ও সুহাইব রুমি (রা.)-ও বিশেষ মর্যাদা পেয়েছেন। এতে বোঝা যায়, মানুষের আসল পরিচয় তার চরিত্র ও কর্মে।
ন্যায়বিচার ছিল নবীজি (সা.)-এর সমাজের অন্যতম ভিত্তি। কুরআন ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিয়েছে। সূরা আন-নিসার ৫৮ আয়াতে আমানত যথাস্থানে ফিরিয়ে দিতে বলা হয়েছে। মানুষের মধ্যে বিচার করতে ন্যায় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নবীজি (সা.) ন্যায়কে ব্যক্তি ও গোত্রের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। আপনজনের জন্য এক নিয়ম এবং অন্যের জন্য আরেক নিয়ম তিনি গ্রহণ করেননি। তাঁর সমাজে ন্যায় ছিল সবার জন্য সমান। এই নীতিই আইনের শাসনের শক্ত ভিত তৈরি করেছিল।
মদিনায় হিজরতের পর নবীজি (সা.) নতুন সমাজ গড়ার কাজ শুরু করেন। তিনি মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এতে সামাজিক দূরত্ব কমে যায়। অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ে। পারস্পরিক দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। একজনের কষ্ট অন্যজনের কষ্ট হয়ে ওঠে। সহিহ মুসলিমে মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ককে একটি ভবনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। একটি অংশ অন্য অংশকে শক্ত করে। এই শিক্ষা সামাজিক সংহতির একটি শক্তিশালী ভিত্তি।
সহিহ মুসলিমে এসেছে, প্রতিবেশীর অধিকারও নবীজি (সা.) বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। অতিথির সম্মান করতে বলেছেন। মানুষের সঙ্গে ভালো কথা বলতে বলেছেন। প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ করতে বলেছেন। এসব বিষয়কে তিনি ঈমানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। । অর্থাৎ ভালো মানুষ শুধু নিজের জন্য ভালো থাকবেন না। তাঁর আচরণে অন্য মানুষও নিরাপদ থাকবে। সমাজে শান্তি থাকবে। পারস্পরিক বিশ্বাস বাড়বে।
নবীজি (সা.) চরিত্র নির্মাণকে সমাজ পরিবর্তনের মূল ভিত্তি করেছেন। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, তাঁর নিজের চরিত্র ছিল সর্বোত্তম। আনাস (রা.) তাঁর উত্তম চরিত্রের সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি সত্যবাদিতা শিখিয়েছেন। আমানতদারি শিখিয়েছেন। ক্ষমা করতে বলেছেন। ধৈর্য ধরতে বলেছেন। অহংকার থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। মানুষের প্রতি দয়া করতে বলেছেন। কারণ শুধু আইন দিয়ে মানুষকে ভালো করা যায় না। মানুষের বিবেকও জাগ্রত করতে হয়।
মদিনার সমাজ ছিল বহুধর্মীয় ও বহুগোষ্ঠীর সমাজ। সেখানে মুসলিমদের পাশাপাশি ইহুদি ও বিভিন্ন গোত্রের মানুষ বসবাস করত। তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক পরিচালনার জন্য একটি লিখিত চুক্তি করা হয়েছিল। ইতিহাসে এটি ‘মদিনা সনদ’ নামে পরিচিত। এতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর দায়িত্ব ও পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয় নির্ধারিত হয়েছিল। এটি সামাজিক শান্তি ও সহাবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। ভিন্ন পরিচয়ের মানুষও শান্তিপূর্ণভাবে একটি সমাজে বসবাস করতে পারে। এই শিক্ষা আজও গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক ন্যায় ছিল নববী সমাজের আরেকটি বৈশিষ্ট্য। যাকাতের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এতিমের অধিকার রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মিসকিন ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে বলা হয়েছে। ব্যবসায় প্রতারণা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাপে কম দিতে নিষেধ করা হয়েছে। অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করতে নিষেধ করা হয়েছে। অর্থাৎ সম্পদ শুধু ভোগের বিষয় নয়। সম্পদের সঙ্গে দায়িত্বও রয়েছে। ধনীর সম্পদে দরিদ্রের অধিকার রয়েছে। এই নীতি সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নারী ও শিশুর মর্যাদাও নবীজি (সা.) প্রতিষ্ঠা করেছেন। নারীর সম্পত্তির অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। উত্তরাধিকারের অধিকার দেওয়া হয়েছে। কন্যাশিশুর প্রতি ভালোবাসার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। শিশুদের সঙ্গে তিনি কোমল আচরণ করতেন। তাদের সালাম দিতেন। তাদের ভালোবাসতেন। তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতেন। দুর্বল মানুষের প্রতি এই মমতা একটি মানবিক সমাজের পরিচয় বহন করে।
জ্ঞান ও শিক্ষা ছিল নবীজি (সা.)-এর সমাজগঠনের অন্যতম শক্তি। কুরআনের প্রথম ওহির শুরু হয়েছে ‘পড়ো’ নির্দেশ দিয়ে। জ্ঞান মানুষকে সচেতন করে। জ্ঞান মানুষকে দায়িত্বশীল করে। জ্ঞান মানুষকে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। নবীজি (সা.) গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। পবিত্র কুরআনে সূরা আশ-শূরার ৩৮ আয়াতে কুরআনও পারস্পরিক পরামর্শের প্রশংসা করেছে। এতে নেতৃত্বে অংশগ্রহণ ও জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
আজ পৃথিবী অনেক এগিয়েছে। প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করেছে। যোগাযোগ দ্রুত হয়েছে। কিন্তু নৈতিক সংকট এখনও আছে। দুর্নীতি আছে, প্রতারণা আছে, বৈষম্য আছে, সহিংসতা আছে এবং অসহিষ্ণুতাও আছে। তাই আজও নবীজি (সা.)-এর সমাজগঠনের আদর্শ প্রাসঙ্গিক। সুন্দর সমাজ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নে তৈরি হয় না। প্রয়োজন সৎ মানুষ। প্রয়োজন ন্যায়বান নেতৃত্ব। প্রয়োজন দায়িত্বশীল নাগরিক। প্রয়োজন মানবিক পরিবার। প্রয়োজন দুর্বল মানুষের প্রতি সহমর্মিতা।
নবীজি (সা.)-এর সমাজ গঠনের মূল শিক্ষা ছিল মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া। ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। দুর্বলকে রক্ষা করা। জ্ঞানকে সম্মান করা। প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করা। সম্পদের সঙ্গে দায়িত্বকে যুক্ত করা। নেতৃত্বকে আমানত হিসেবে গ্রহণ করা। তাঁর সমাজে মানুষ আগে নিজেকে সংশোধন করেছে। তারপর পরিবারকে বদলেছে। এরপর সমাজ বদলেছে। এভাবেই একটি নৈতিক সমাজ গড়ে উঠেছে।
নবীজি (সা.)-এর আদর্শ তাই শুধু ইতিহাসের বিষয় নয়। এটি বর্তমান সমাজের জন্যও একটি নৈতিক দিশা। সত্য, ন্যায়, মানবতা ও দায়িত্ববোধের ওপর সমাজ গড়ে উঠলে মানুষের জীবন সুন্দর হয়। সমাজে শান্তি আসে। পারস্পরিক বিশ্বাস বাড়ে। দুর্বল মানুষ নিরাপদ হয়। মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই আদর্শ অনুসরণ করেই একটি সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখকঃ শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
সিনিয়র শিক্ষক, সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসা, সদর, সিলেট
৭
৭ মন্তব্য