সহকারী অধ্যাপক
২৭ আগস্ট, ২০২৬ ০৩:৩১ পূর্বাহ্ণ
এখনই—এই মুহূর্তই আত্মগঠনের সময় - মোঃ মুজিবুর রহমান
এখনই—এই মুহূর্তই আত্মগঠনের সময়
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
ভূমিকা
মানুষের জীবন সময়ের সমষ্টি। একেকটি মুহূর্ত, একেকটি মিনিট, একেকটি ঘণ্টা মিলেই গড়ে ওঠে একটি দিন; আর অসংখ্য দিনের সমষ্টিতে গড়ে ওঠে মানুষের জীবন। তাই জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সময়। অর্থ-সম্পদ হারিয়ে গেলে তা অনেক সময় আবার অর্জন করা যায়, কিন্তু যে সময় একবার চলে যায়, তা কোনো মূল্যে ফিরে পাওয়া যায় না। গতকাল আমাদের জীবনের অংশ ছিল, কিন্তু তা এখন অতীত; আগামীকাল আমাদের সামনে আসতে পারে, কিন্তু তার নিশ্চয়তা আমাদের হাতে নেই। আমাদের হাতে আছে কেবল বর্তমান মুহূর্ত। আর এই বর্তমান মুহূর্তই হলো কাজ করার, নিজেকে সংশোধন করার, ভালো হওয়ার এবং জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।
এই কারণে আত্মগঠন শুরু করার জন্য কোনো বিশেষ দিন, বিশেষ বয়স বা বিশেষ পরিস্থিতির অপেক্ষা করা উচিত নয়। এখনই—এই মুহূর্তেই আত্মগঠনের সময়। “কাল থেকে শুরু করব”, “সুযোগ পেলে করব”, “সময় হলে নিজেকে বদলাব”—এ ধরনের ভাবনা মানুষকে কর্মহীন করে রাখে। অথচ জীবনের পরিবর্তন শুরু হয় একটি সিদ্ধান্ত থেকে, আর সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার শ্রেষ্ঠ সময় হলো বর্তমান।
অতীত থেকে শিক্ষা, ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রস্তুতি
অতীতকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মানুষের জীবনে ভালো-মন্দ, সাফল্য-ব্যর্থতা, আনন্দ-বেদনা—সবই অতীতের অংশ। কিন্তু অতীতকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকা আত্মগঠনের পথ নয়। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে, ব্যর্থতা থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে এবং সাফল্য থেকে অনুপ্রেরণা নিতে হবে। গতকালের ভুল যদি আজকে আমাদের আরও সচেতন, আরও দায়িত্বশীল ও আরও ভালো মানুষ হতে সাহায্য করে, তাহলে সেই ভুলও আমাদের শিক্ষার উপকরণ হয়ে ওঠে।
আবার ভবিষ্যৎ নিয়েও মানুষের দায়িত্ব আছে। ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে হবে, লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে এবং প্রস্তুতি নিতে হবে। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত ভয়, দুশ্চিন্তা বা অনিশ্চয়তার মধ্যে ডুবে থেকে বর্তমানকে নষ্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ভবিষ্যৎ কী হবে, তা সম্পূর্ণভাবে মানুষ জানে না। ইসলামী জীবনদৃষ্টিতে মানুষ তার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করবে এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করবে।
সুতরাং সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো—অতীত থেকে শিক্ষা নেব, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হব এবং বর্তমানকে কাজে লাগাব। অতীত শিক্ষার পাতা, ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির ক্ষেত্র; আর বর্তমান হলো কর্মের সময়।
এখনই কেন আত্মগঠনের সময়?
আত্মগঠন কোনো একদিনের কাজ নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। মানুষ প্রতিদিন নিজেকে একটু একটু করে উন্নত করে। আজ একটি বদভ্যাস ত্যাগ করা, একটি ভালো অভ্যাস গড়ে তোলা, একটি ভালো বই পড়া, একটি ভালো কাজ করা, একটি ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া, একটি গুনাহ থেকে ফিরে আসা—এসব ছোট ছোট পদক্ষেপই একদিন মানুষের চরিত্রকে সুন্দর করে তোলে।
জীবনের বড় পরিবর্তন অনেক সময় ছোট সিদ্ধান্ত থেকেই শুরু হয়। একজন শিক্ষার্থী আজ মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা শুরু করলে তার জ্ঞানভাণ্ডার ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হয়। একজন যুবক আজ অলসতা পরিহার করে পরিশ্রম শুরু করলে তার কর্মজীবনের ভিত্তি শক্ত হয়। একজন মানুষ আজ সত্যবাদিতা গ্রহণ করলে ধীরে ধীরে তার চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি হয়। একজন মুসলিম আজ আন্তরিকভাবে তাওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে এলে তার জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
তাই আত্মগঠনের জন্য “একদিন” অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। যে মুহূর্তে ভালো হওয়ার ইচ্ছা জাগে, সেই মুহূর্তই পরিবর্তনের মুহূর্ত।
আত্মগঠনের প্রথম ধাপ—নিয়ত ও আত্মশুদ্ধি
আত্মগঠনের সূচনা হয় অন্তর থেকে। মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে তার চরিত্র, নিয়ত ও কর্মের সৌন্দর্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিজেকে গড়তে হলে প্রথমে নিজের অন্তরকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করতে হবে।
নিয়ত হতে হবে সৎ ও কল্যাণমুখী। মানুষের প্রশংসা বা বাহ্যিক সাফল্যের জন্য নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে ভালো কাজ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ, প্রতারণা, মিথ্যা ও অন্যায় থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে।
নিজের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করাও আত্মগঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ানোর আগে নিজের দোষ দেখা উচিত। যে ব্যক্তি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে, সে নিজেকে সংশোধনের পথে এগিয়ে যেতে পারে। আত্মসমালোচনা মানুষকে ছোট করে না; বরং তাকে আরও পরিণত ও দায়িত্বশীল করে।
সালাত, কুরআন ও আল্লাহর স্মরণ
একজন মুসলিমের আত্মগঠনে ইবাদতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সালাত মানুষের জীবনকে শৃঙ্খলিত করে এবং তাকে আল্লাহর স্মরণে রাখে। নিয়মিত সালাত আদায়ের মাধ্যমে মানুষ সময়ের মূল্য, পবিত্রতা, বিনয় ও আত্মসংযমের শিক্ষা লাভ করে।
কুরআন হলো মুমিনের জন্য হেদায়াত ও জীবন পরিচালনার প্রধান উৎস। তাই শুধু কুরআন তিলাওয়াত নয়, এর শিক্ষা বোঝা এবং জীবনে প্রয়োগ করার চেষ্টা করা প্রয়োজন। জিকির, দোয়া, ইস্তিগফার ও অন্যান্য নেক আমল অন্তরকে আল্লাহমুখী রাখতে সহায়তা করে।
আত্মগঠন তখনই পূর্ণতা পায়, যখন মানুষের জ্ঞান ও আমলের মধ্যে সমন্বয় ঘটে। শুধু ভালো কথা জানা যথেষ্ট নয়; সেই জ্ঞানকে জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। জ্ঞান পথ দেখায়, আর আমল সেই পথে চলার প্রমাণ দেয়।
জ্ঞানার্জন ও অধ্যবসায়
আত্মগঠনের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো জ্ঞানার্জন। জ্ঞান মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যায়। একজন শিক্ষার্থীর জন্য বই পড়া, মনোযোগ দিয়ে পাঠ গ্রহণ করা, শিক্ষকের নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং নিয়মিত অধ্যবসায় করা আত্মগঠনের অপরিহার্য অংশ।
তবে জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে বিনয় থাকতে হবে। জ্ঞান মানুষকে অহংকারী নয়, দায়িত্বশীল ও বিনয়ী করবে—এটাই কাম্য। জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। যে জ্ঞান চরিত্রকে উন্নত করে না এবং কর্মকে সৎ করে না, সেই জ্ঞানের প্রকৃত সুফল অর্জিত হয় না।
তাই শিক্ষার্থীর অঙ্গীকার হতে পারে—আজ আমি একটি নতুন বিষয় শিখব, শেখা বিষয়টি বুঝব এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা জীবনে প্রয়োগ করব।
সময়ের সদ্ব্যবহার
সময় আল্লাহর দেওয়া অমূল্য নিয়ামত। ঘড়ির কাঁটা থেমে থাকে না। সময় নিজের গতিতে এগিয়ে চলে। মানুষ চাইলেও চলে যাওয়া একটি মুহূর্ত ফিরিয়ে আনতে পারে না। তাই সময়কে অবহেলা করা মানে জীবনের একটি অংশকে নষ্ট করা।
অলসতা আত্মগঠনের বড় শত্রু। অকারণে দীর্ঘ সময় ঘুমানো, উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো, অনর্থক কথাবার্তা, অতিরিক্ত বিনোদন কিংবা প্রযুক্তির অপব্যবহার মানুষের মূল্যবান সময় কেড়ে নিতে পারে। প্রযুক্তি নিজে খারাপ নয়; কিন্তু এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সময় ও মনোযোগ নষ্ট করতে পারে। তাই প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে জ্ঞান, শিক্ষা, কাজ ও কল্যাণের কাজে ব্যবহার করা উচিত।
প্রতিদিনের কাজের একটি সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা থাকা দরকার। কখন পড়ব, কখন কাজ করব, কখন বিশ্রাম নেব, কখন ইবাদত করব—এসব বিষয়ে সচেতনতা জীবনকে সুন্দর ও কার্যকর করে।
চরিত্রই আত্মগঠনের আয়না
একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় শুধু তার পোশাক, পদবি, অর্থ বা বাহ্যিক সৌন্দর্যে প্রকাশ পায় না; তার চরিত্র ও আচরণেই তার প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে। সত্যবাদিতা, আমানতদারি, বিনয়, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা, দয়া, ন্যায়পরায়ণতা ও মানুষের প্রতি সম্মান—এসব গুণ একজন মানুষের চরিত্রকে মহৎ করে।
মিথ্যা, গিবত, পরনিন্দা, অহংকার, হিংসা, প্রতারণা ও অন্যের অধিকার নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কথা বলার আগে ভাবতে হবে—আমার কথায় কেউ কষ্ট পাবে কি না। কারণ কথার আঘাত অনেক সময় শারীরিক আঘাতের চেয়েও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে।
রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা আত্মগঠনের বড় পরীক্ষা। রাগের বশে বলা একটি কথা বা নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত অনেক সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে। তাই রাগ এলে নিজেকে থামানো, ধৈর্য ধারণ করা এবং ক্ষমার মানসিকতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
দৃষ্টি, মন ও জিহ্বার সংযম
আত্মগঠন শুধু বাহ্যিক আচরণের বিষয় নয়; চোখ, কান, জিহ্বা ও মন—সবকিছুর সংযম প্রয়োজন। চোখকে হারাম থেকে সংযত রাখতে হবে, কানকে অশ্লীল ও ক্ষতিকর কথা থেকে দূরে রাখতে হবে এবং জিহ্বাকে সত্য ও কল্যাণকর কথায় অভ্যস্ত করতে হবে।
জিহ্বা মানুষের জন্য কল্যাণের মাধ্যম হতে পারে, আবার ক্ষতির কারণও হতে পারে। একটি সুন্দর কথা একজন মানুষের মন আনন্দে ভরিয়ে দিতে পারে; আবার একটি কটু কথা দীর্ঘদিনের সম্পর্কেও ফাটল ধরাতে পারে। তাই কথা বলার আগে চিন্তা করা এবং অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকা আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
পিতা-মাতা, শিক্ষক ও মানুষের প্রতি দায়িত্ব
আত্মগঠন কখনো শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন সত্যিকারের ভালো মানুষ তার আচরণে পরিবার, সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়।
পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা ও সেবা করা সন্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাদের সঙ্গে কোমল আচরণ করতে হবে এবং তাদের প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়াতে হবে। একইভাবে শিক্ষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, বড়দের মর্যাদা দেওয়া এবং ছোটদের স্নেহ করা সুন্দর সামাজিক জীবনের অংশ।
প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখের প্রতি সচেতন হওয়া, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দরিদ্রের সাহায্য করা এবং দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করা মানবিক চরিত্রের পরিচায়ক।
তাওবা—নতুনভাবে শুরু করার সুযোগ
মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। জীবনে ভুল হতে পারে, গুনাহ হতে পারে, ব্যর্থতা আসতে পারে। কিন্তু ভুলের কারণে হতাশ হয়ে জীবন থামিয়ে দেওয়া উচিত নয়। ভুল বুঝতে পারলে তা থেকে ফিরে আসতে হবে এবং সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।
ইসলামী জীবনদর্শনে তাওবা মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার পথ দেখায়। তাই কেউ যদি অতীতে ভুল করে থাকে, তাকে সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানেই সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। “আমি অনেক ভুল করেছি, তাই আর ভালো হওয়ার সুযোগ নেই”—এমন হতাশা আত্মগঠনের পথে বাধা।
বরং বলা উচিত—আমি ভুল করেছি, কিন্তু এখনই সংশোধন শুরু করব। আজকের একটি আন্তরিক তাওবা, একটি সৎ সিদ্ধান্ত এবং একটি ভালো কাজ মানুষের জীবনের নতুন সূচনা হতে পারে।
তাওয়াক্কুল মানে বসে থাকা নয়
ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় না পাওয়ার অর্থ দায়িত্বহীন হয়ে বসে থাকা নয়। ইসলামী দৃষ্টিতে তাওয়াক্কুলের সঙ্গে চেষ্টা ও দায়িত্ববোধের সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। মানুষ তার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করবে, সঠিক পরিকল্পনা করবে, পরিশ্রম করবে এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করবে।
শুধু স্বপ্ন দেখলে সফলতা আসে না। স্বপ্নের সঙ্গে লক্ষ্য, লক্ষ্যর সঙ্গে পরিকল্পনা এবং পরিকল্পনার সঙ্গে পরিশ্রম যুক্ত করতে হয়। দোয়া ও চেষ্টা পাশাপাশি চলবে। এভাবেই একজন মানুষ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে যেতে পারে।
ছোট ছোট ভালো কাজের শক্তি
আত্মগঠনের জন্য সবসময় বড় কোনো কাজের প্রয়োজন হয় না। প্রতিদিনের ছোট ছোট ভালো কাজই ধীরে ধীরে মানুষকে বদলে দেয়।
আজ একটি ভালো বই পড়া যায়।
আজ একটি ভালো কথা বলা যায়।
আজ একজনের উপকার করা যায়।
আজ কাউকে ক্ষমা করা যায়।
আজ একটি কুরআনের আয়াত শেখা যায়।
আজ সালাতে আরও মনোযোগী হওয়া যায়।
আজ একটি বদভ্যাস ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
আজ একটি ভালো অভ্যাস শুরু করা যায়।
এই ছোট ছোট কাজের ধারাবাহিকতাই একসময় বড় পরিবর্তন সৃষ্টি করে। তাই “আমি একদিনে অনেক কিছু করব”—এর চেয়ে “আমি আজ একটি ভালো কাজ করব এবং তা নিয়মিত করব”—এই সংকল্প অধিক কার্যকর।
তরুণদের প্রতি আহ্বান
তরুণ বয়স আত্মগঠনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে জ্ঞান, চরিত্র, দক্ষতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যৎ জীবন শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়। তরুণদের উচিত সময়ের অপচয় না করে শিক্ষা, দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিকতার চর্চায় মনোযোগ দেওয়া।
তরুণ বয়সে গড়ে ওঠা অভ্যাস পরবর্তী জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই আজ থেকেই মাদক, অশ্লীলতা, অসৎ সঙ্গ, অনর্থক বিনোদন, অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা ও সময় অপচয়ের মতো ক্ষতিকর বিষয় থেকে দূরে থাকতে হবে। জ্ঞান, শৃঙ্খলা, ইবাদত, পরিশ্রম, সৎ সঙ্গ ও মানবসেবাকে জীবনের অংশ করতে হবে।
আত্মগঠন থেকে সমাজগঠন
একজন মানুষের আত্মগঠন শুধু তার নিজের কল্যাণ বয়ে আনে না; এর প্রভাব পরিবার ও সমাজেও পড়ে। একজন সৎ মানুষ পরিবারে আস্থা সৃষ্টি করে, একজন দায়িত্বশীল মানুষ কর্মক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনে এবং একজন ন্যায়পরায়ণ মানুষ সমাজে ন্যায়ের পরিবেশ সৃষ্টি করতে সাহায্য করে।
তাই আত্মগঠন মানে কেবল “আমি ভালো হব”—এমন ব্যক্তিগত সংকল্প নয়; বরং “আমি ভালো হব এবং অন্যের জন্যও কল্যাণের কারণ হব”—এই বৃহত্তর মানসিকতা গড়ে তোলা।
মানুষ মানুষের জন্য—এই চেতনা সমাজকে সুন্দর করে। সত্য, ন্যায়, দয়া, ভালোবাসা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্মানের চর্চা বাড়লে সমাজে শান্তি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়।
দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ
ইসলামী জীবনদর্শনে মানুষের সাফল্য শুধু পার্থিব অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা, কর্ম, অর্থ, সম্মান ও সামাজিক সফলতার পাশাপাশি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের মুক্তিও মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
তাই আত্মগঠন এমন হতে হবে, যাতে মানুষ দুনিয়ার দায়িত্বও সঠিকভাবে পালন করে এবং আখিরাতের জন্য নেক আমলও সঞ্চয় করে। হালাল উপার্জন, মানুষের অধিকার রক্ষা, আমানতদারি, সত্যবাদিতা, সালাত, তাওবা, দোয়া, মানবসেবা ও সৎকর্ম—সবকিছুর সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে হবে।
বর্তমান মুহূর্তের অঙ্গীকার
আমাদের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো ভালো কাজকে ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া। “কাল করব”—এই দুটি শব্দ অনেক ভালো উদ্যোগকে থামিয়ে দেয়। অথচ কাল কখনো আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তাই ভালো কাজের সুযোগ এলে অযথা বিলম্ব না করে তা সম্পন্ন করার চেষ্টা করা উচিত।
অতীতের জন্য অনুতপ্ত হও, কিন্তু অতীতের মধ্যে আটকে থেকো না। ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করো, কিন্তু ভবিষ্যতের ভয় তোমার বর্তমানকে গ্রাস করতে দিও না। তোমার হাতে যে সময়টি আছে, সেটিকে মূল্য দাও। কারণ বর্তমানই তোমার কর্মক্ষেত্র।
আজ যদি তুমি নিজেকে বদলাতে শুরু করো, আজ যদি একটি ভালো অভ্যাস গড়ে তোলো, আজ যদি একটি ভুল থেকে ফিরে আসো, আজ যদি একটি সৎ সিদ্ধান্ত নাও—তাহলেই তোমার জীবন পরিবর্তনের পথে এগোতে শুরু করবে।
উপসংহার
জীবন অপেক্ষা করে না। সময় থেমে থাকে না। গতকাল চলে গেছে; তাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আগামীকাল আসবে কি না, তার নিশ্চয়তাও মানুষের হাতে নেই। কিন্তু বর্তমান মুহূর্ত আমাদের সামনে আছে। এই মুহূর্তেই আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি, কাজ করতে পারি, ভুল সংশোধন করতে পারি, জ্ঞান অর্জন করতে পারি, চরিত্র গড়তে পারি এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে পারি।
তাই আত্মগঠনের জন্য আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা নয়। এখনই শুরু করতে হবে। আজকের একটি সৎ সিদ্ধান্ত আগামী দিনের জীবনকে বদলে দিতে পারে। আজকের একটি ভালো অভ্যাস ভবিষ্যতের চরিত্র নির্মাণ করতে পারে। আজকের পরিশ্রম আগামী দিনের সাফল্যের ভিত্তি হতে পারে। আজকের নেক আমল আখিরাতের জন্য কল্যাণের কারণ হতে পারে।
অতীত আমাদের শিক্ষা দিক, ভবিষ্যৎ আমাদের প্রস্তুত করুক, আর বর্তমান আমাদের কর্মে পরিণত হোক। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে অর্থবহ করে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
কাল নয়—আজ।
আগামীকাল নয়—এখন।
Yesterday নয়—Right Now।
Tomorrow নয়—At this moment।
এই মুহূর্তেই শুরু হোক আত্মশুদ্ধি।
এই মুহূর্তেই শুরু হোক চরিত্রগঠন।
এই মুহূর্তেই শুরু হোক জ্ঞান ও আমলের পথচলা।
এই মুহূর্তেই শুরু হোক মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার অঙ্গীকার।
এখনই—এই মুহূর্তই আত্মগঠনের সময়।
নিজেকে গড়ি, পরিবারকে সুন্দর করি, সমাজকে আলোকিত করি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে জীবন পরিচালনা করি—এটাই হোক আমাদের জীবনের মহৎ প্রত্যয়।
১৪
২৪ মন্তব্য