ট্রেড ইন্সট্রাক্টর
৩০ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতিহাস ও ক্রমধারা
শিক্ষা কেবল বিদ্যালয়ের চারদেওয়ালে সীমাবদ্ধ নয়; মানবজাতি জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শেখে। তবে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে বিশদ জ্ঞান অর্জন ও গবেষণার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা ঘটে প্রাচীনকাল থেকেই। বাংলায় কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হলো এবং এর ক্রমবিকাশ কীভাবে ঘটলো, তা নিয়ে নিচে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।
বাংলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনাকাল ও বিকাশকে মূলত ৪টি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. প্রাক-ব্রিটিশ কালের শিক্ষা
২. ব্রিটিশ আমলের শিক্ষা
৩. পাকিস্তান আমলের শিক্ষা
৪. স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষা
১. প্রাক-ব্রিটিশ আমলে শিক্ষা
প্রাক-ব্রিটিশ আমলে শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল মূলত ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ নির্ভর। হিন্দু সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা টোল ও চতুষ্পাঠীতে গুরুদের সান্নিধ্যে ধর্মীয় ও শাস্ত্রীয় শিক্ষা গ্রহণ করত। অন্যদিকে, মুসলমান শিক্ষার্থীরা মসজিদের পাশাপাশি মক্তবে প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা নিত।
ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি কিছু সাধারণ পাঠশালাও ছিল, যেখানে অক্ষরের সাথে হাতেখড়ি এবং 'শুভঙ্করী আর্যা'র মাধ্যমে হিসাব-নিকাশ বা প্রাথমিক গণিত শেখানো হতো। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি অনুদান ছাড়াই স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও সামাজিক উদ্যোগে পরিচালিত হতো।
মোগল আমল থেকেই মক্তব শিক্ষা ব্যাপকভাবে চালু হয়। মক্তবগুলোতে আরবি, ফার্সি ও দেশীয় ভাষা শেখানো হতো। যেহেতু তৎকালীন মোগল প্রশাসনে ফার্সি ছিল দাপ্তরিক ভাষা, তাই প্রশাসনিক চাকরির সুবিধার্থে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে মক্তব বা মাদ্রাসায় ফার্সি ও আরবি শিখতে যেতেন। রাজা রামমোহন রায়, রাজা টোডর মল, পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, অক্ষয় কুমার দত্ত, দিনেশচন্দ্র সেন এবং স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বরা আরবি-ফার্সি শেখার জন্য প্রখ্যাত মাওলানাদের নিকট যেতেন বা নিয়মিত মক্তবে পড়েছেন।
১৮৩০ সালে স্কটিশ মিশনারি ও শিক্ষাবিদ উইলিয়াম অ্যাডাম (William Adam) তাঁর শিক্ষা রিপোর্টে উল্লেখ করেন, তৎকালীন মাদ্রাসায় মুসলিম শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি হিন্দু শিক্ষার্থীরাও অধ্যয়ন করত, কারণ এই বিদ্যা সরকারি চাকরি পেতে সহায়তা করত।
প্রাথমিক শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হিসেবে মক্তব চালু থাকায় আমাদের অনেক কবি-সাহিত্যিক ও গবেষক শৈশবে মক্তবে পড়েছেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বিজ্ঞান গবেষক আবদুল্লাহ আল-মুতী, ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বরা শৈশবে মক্তবে যাতায়াত করেছেন বলে শোনা যায়।
২. ব্রিটিশ আমলে শিক্ষাব্যবস্থা
ব্রিটিশ শাসনামলের শুরুর দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শিক্ষা বিস্তারে তেমন আগ্রহী ছিল না। বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে আধুনিক শিক্ষার সূচনা হয়; যেমন—১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু কলেজ এবং কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি।
১৮৩৫ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ নীতি নির্ধারকদের ধারণা ছিল শিক্ষা কেবল প্রাচ্য ভাষা (আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃতি)-র মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। তবে ১৮৩৫ সালে লর্ড মেকলে-র শিক্ষা প্রস্তাবের পর ব্রিটিশ সরকার নীতি পরিবর্তন করে এবং ইংরেজি মাধ্যম ও আধুনিক শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়ে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দাপ্তরিক কাজে সহায়তার জন্য শিক্ষিত প্রশাসনিক কর্মী তৈরি করা।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে গড়ে ওঠে 'কলেজিয়েট স্কুল' (যেমন: ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল, রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল)। পাশাপাশি বৃহত্তর জেলা শহরগুলোতে 'জিলা স্কুল' প্রতিষ্ঠা করা হয়। চিকিৎসা শিক্ষার জন্য ১৮৩৫ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ। পরবর্তীতে ঢাকার তৎকালীন কালেক্টর রবার্ট মিটফোর্ডের দান করা অর্থে ১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মিটফোর্ড হাসপাতাল (বর্তমান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ)।
১৮৫৪ সালের বিখ্যাত 'উডস ডেসপ্যাচ' (Wood's Despatch) অনুযায়ী প্রতিটি জেলায় আদর্শ বা মডেল স্কুল ও জিলা স্কুল স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তৎকালীন জমিদার, ব্যবসায়ী ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্বদের অনুদানে বাংলার গ্রামে-গঞ্জে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
ব্রিটিশ আমলের বিভিন্ন ধরনের স্কুল:
কলেজিয়েট স্কুল: কলেজের পূর্বধাপ হিসেবে উচ্চস্তরের শিক্ষার জন্য প্রবর্তিত বিশেষায়িত সরকারি বিদ্যালয়।
জিলা স্কুল (Zilla School): জেলা শহরগুলোতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়।
এইডেড স্কুল (Aided School): ব্রিটিশ সরকার 'Grant-in-Aid' প্রথা চালু করার পর যেসকল বেসরকারি স্কুল সরকারি শর্ত পূরণ করে বার্ষিক অনুদান পেত।
ভার্নাকুলার স্কুল (Vernacular School): মাতৃভাষা বা বাংলা মাধ্যমে প্রাথমিক ও নিম্ন-মাধ্যমিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত স্কুল (লোয়ার ও আপার ভার্নাকুলার)।
মিডল ইংলিশ স্কুল (M.E. School): মাতৃভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা শেখানোর জন্য তৈরি মধ্যম স্তরের বিদ্যালয়।
মাইনর স্কুল (Minor School): উচ্চ প্রাথমিক বা মধ্য-ইংরেজি পর্যায়ের স্কুল।
এইচ. ই. স্কুল (H.E. School / High English School): এগুলো ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনট্রান্স (বর্তমান এসএসসি/মাধ্যমিক) স্তরের বিদ্যালয়।
অ্যাংলো-ভার্নাকুলার স্কুল: যেখানে ইংরেজি এবং দেশীয় ভাষা—উভয় মাধ্যমেই পাঠদান করা হতো।
৩. বৃটিশ পরবর্তী শিক্ষা ও বিশেষায়িত ধারা
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এখতিয়ার থেকে বের হয়ে আসে। মাধ্যমিক স্তরের পরিচালনা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবং উচ্চশিক্ষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্থানান্তরিত হয়।
কারিগরি শিক্ষা ও পলিটেকনিক: ১৯৫৫ সালে কারিগরি শিক্ষার প্রসারে 'ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট' প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পলিটেকনিক শিক্ষার যাত্রা শুরু হয়।
ক্যাডেট কলেজ: সুশৃঙ্খল ও নেতৃত্ব গুণসম্পন্ন নাগরিক তৈরির লক্ষ্যে ১৯৫৮ সালে 'ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ' প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ক্যাডেট পদ্ধতির সূচনা হয়।
পাইলট স্কুল: ১৯৫৯ সালের 'জাতীয় শিক্ষা কমিশন' (শরিফ কমিশন)-এর সুপারিশে ষাটের দশকে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি প্র্যাকটিক্যাল বা কারিগরি শাখা যুক্ত করে 'পাইলট হাই স্কুল' প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করা হয়।
৪. স্বাধীন বাংলাদেশে শিক্ষা
স্বাধীনতা পর প্রায় ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। শিক্ষাবিদ ড.কুদরাত-এ-খুদা-কে প্রধান করে প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ৮০-র দশকে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য এমপিও (MPO) প্রথা চালু করা হয়।ফলে ব্যপকভাবে স্কুল-কলেজ, সংযুক্ত ও স্বতন্ত্র কারিগরী প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়।মডেল এবং পাইলট বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।শিক্ষকতা পেশায় অনেকে আগ্রহী হয়। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের জন্য NTRCA প্রতিষ্ঠা করা হয়।যা ছিলো একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি, আধা-সরকারি, এমপিওভুক্ত ও প্রাইভেট শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
বিভিন্ন সময় পাঠ্যপুস্তক সংশোধন, পরিমার্জন হয়েছে। বেসরকারি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হয়েছে এবং হচ্ছে। ভবিষ্যতে বাকীগুলো হয়তো জাতীয়করণ হবে এমনটাই জানা যাচ্ছে।
মাদ্রাসা ও কওমী শিক্ষার বিবর্তন
আলিয়া ধারা: ১৭৮০ সালে লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস প্রতিষ্ঠা করেন 'কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা'। এটিই উপমহাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসা শিক্ষার ভিত্তি। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে ১৯৪৯ সালের 'পূর্ববঙ্গ শিক্ষা কমিশন'-এর সুপারিশে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড গঠিত হয় এবং ইবতেদায়ী, দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল স্তর বিন্যস্ত করে আধুনিক সিলেবাস যুক্ত করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশেও ১৯৮০-র দশকে আলিয়া মাদ্রাসাগুলোকে এমপিওভুক্তির আওতায় আনা হয়।
কওমী ধারা: ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর উপমহাদেশের মুসলিম সমাজ এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটে পড়ে। নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সত্ত্বা বজায় রাখার লক্ষ্যে আলেম সমাজ সাধারণ মানুষের অর্থায়নে স্বাধীন ধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৮৬৬ সালের ৩০ মে মাওলানা কাসেম নানুতুবীর নেতৃত্বে ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দে 'দারুল উলুম দেওবন্দ' প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দেওবন্দী শিক্ষার আদলেই পরবর্তীতে বাংলাদেশে হাটহাজারী মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন কওমী মাদ্রাসা গড়ে ওঠে, যা আজও নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে।
১৪
২৪ মন্তব্য