সহকারী শিক্ষক
৩০ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
শিক্ষকতার দীর্ঘ পথচলায় প্রতি বছর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি মৌসুম এলেই একটি চেনা দৃশ্য চোখে ভাসে: অভিভাবকের উদ্বিগ্ন মুখ, শিক্ষার্থীর অনিশ্চয়তা, আর নানা প্রশ্ন নিয়ে ছুটে আসা বিভিন্ন শ্রেণির অংশীজন। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রণীত ‘একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির নীতিমালা’ হাতে নিয়ে প্রতিটি ধারা ধরে ধরে পড়ে একজন শিক্ষকের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করছি।
আমাদের শিক্ষাজীবনের একটি বড় অংশজুড়ে কলেজে ভর্তি ছিল অনিশ্চয়তা ও হয়রানির আরেক নাম। সে তুলনায় এই নীতিমালার অনলাইন আবেদন (ধারা ৪ দশমিক শূন্য), স্বচ্ছ সময়সূচি (ধারা ৬ দশমিক শূন্য), মেধাক্রম নির্ধারণের সুস্পষ্ট নিয়ম (ধারা ৩ দশমিক ৪) এবং বিভাগ নির্বাচনের গোছানো কাঠামো (ধারা ২ দশমিক ৩) নিঃসন্দেহে অগ্রগতি হয়েছে। তবে ধারা ধরে এগোতে গিয়ে কয়েক জায়গায় থমকে গেছি; মনে হয়েছে এই ভালো কাঠামোর ভেতরেই কিছু বিক্ষিপ্ত বিধান রয়ে গেছে, যা একটি অভিন্ন যুক্তির সুতোয় গাঁথা গেলে নীতিমালাটি আরও সহজ, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত হয়ে উঠতে পারে। সমালোচনা নয়, একজন অংশীজনের ইতিবাচক প্রস্তাব হিসেবেই ভাবনাগুলো লিখছি।
মতামত জরিপে ভোট দেওয়ার জন্য ক্লিক করুন এখানে
ধারা ৩ দশমিক ২ অনুযায়ী ৯৩ শতাংশ আসন সর্বজনীন মেধার ভিত্তিতে থাকলেও বাকি ৭ শতাংশ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তরে কর্মরতদের সন্তানদের জন্য ১+১ শতাংশ, আর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পুত্র-কন্যা, নাতি নাতনিদের জন্য ৫ শতাংশ এভাবে বণ্টিত। গত বছর সুবিধা প্রাপ্তদের ধারায় ২৪ এর জুলাইযোদ্ধাদের জন্য অংশ ছিল। লক্ষণীয়, ধারা ৩ দশমিক ৩ স্পষ্ট করে বলছে, এই কোটাপদ্ধতি কেবল ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্যই প্রযোজ্য। নীতিনির্ধারকরা নিজেরাই একে সাময়িক রেখেছেন, আর এই বাস্তবতাই ভবিষ্যতের জন্য ভাবার সুযোগ করে দেয়।
মুক্তিযোদ্ধারা জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান; তাদের প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান ও মর্যাদা চিরস্থায়ী ও নিঃশর্ত থাকা উচিত, আর সে সম্মান রক্ষার নানা পথ: স্মৃতি সংরক্ষণ, ভাতা, চিকিৎসা সুবিধা, রাষ্ট্রীয় সম্মাননা অক্ষুণ্ন থাকা দরকার। প্রশ্নটি এই সম্মানকে খাটো করার নয়; বরং ভর্তিক্ষেত্রে আসন-সংরক্ষণ নামক একটি নির্দিষ্ট মাধ্যম কতদিন প্রাসঙ্গিক থাকবে, তা নিয়ে। ধারা ৩ দশমিক ৩ নিজেই যেহেতু এই কোটাকে সাময়িক বলছে, তাই একটি ধীর, সময় নির্ধারিত পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসন-সংরক্ষণের বাইরে অন্য কোনো টেকসই স্বীকৃতির পথ খোঁজা যায় কি না, এই প্রশ্নটি বিনয়ের সঙ্গে তোলা যেতে পারে যাতে সম্মানও অক্ষুণ্ন থাকে, প্রতিযোগিতার মাঠও ক্রমেই সমান হয়ে ওঠে।
ধারা ৩ দশমিক ৫-এ ইতোমধ্যে এক ধরনের ক্যাচমেন্ট যুক্তি স্বীকৃত: স্কুল অ্যান্ড কলেজ/সমমানের প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত যোগ্যতা সাপেক্ষে নিজ নিজ বিভাগে অগ্রাধিকার পাবে, কারণ তারা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক সেবা এলাকার অংশ। এ যুক্তিকেই ভিত্তি ধরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ক্যাচমেন্ট এরিয়া কাঠামো দাঁড় করানো যায়, যেখানে সংরক্ষণের ভিত্তি হবে শিক্ষার্থীর স্থায়ী ঠিকানা ও প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত উপজেলা/থানাভিত্তিক সেবা এলাকা অভিভাবকের পেশা বা কর্মস্থল নয় -যাতে একই এলাকার একজন কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা বেকার অভিভাবকের সন্তানও একই সুযোগ পায়। কর্মস্থলসংলগ্ন প্রতিষ্ঠানে সীমিত ব্যবস্থার প্রয়োজন হলে তা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত, অত্যন্ত সীমিত ব্যতিক্রম হিসেবেই থাকবে, নিয়ম নয়; এর বাইরে বাকি সব আসন শতভাগ উন্মুক্ত মেধার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। এভাবে বসবাসভিত্তিক ক্যাচমেন্ট এরিয়াকে কোটার মূল বিকল্প করা গেলে বর্তমান ১+১+৫ শতাংশের খণ্ডিত কাঠামোর বদলে একটি অভিন্ন, স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত সংরক্ষণনীতি দাঁড়ায়।
ধারা ২.৩.১-এ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী চাইলে যে কোনো বিভাগে যেতে পারে, কিন্তু ২.৩.২ অনুযায়ী মানবিক বা ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থীর জন্য বিজ্ঞানের দরজা পুরোপুরি বন্ধ। তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সে আমরা কজন সত্যিই নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারি, ভবিষ্যতে কোন পথে এগোব? অনেকের আগ্রহ পরে বদলায়, সামর্থ্যও প্রকাশ পায় দেরিতে। তাই সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে একটি শর্তসাপেক্ষ দ্বিতীয় সুযোগ রাখা যায় গণিত ও সাধারণ বিজ্ঞানে নির্দিষ্টমানের ফল ও একটি সংক্ষিপ্ত ব্রিজ কোর্স বা যোগ্যতা যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী বিজ্ঞানে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। শিক্ষার কাজ কেবল দরজা বন্ধ করা নয়, যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ দিয়ে নতুন দরজা খুলে দেওয়াও।
ভর্তি ফি (উপনীতি ৪ দশমিক ২) ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা (ধারা ৫ দশমিক ৫ থেকে ৫ দশমিক ৭) উপনীতি ৪ দশমিক ২-এ সংযুক্ত ফি কাঠামোয় ঢাকা মহানগর, অন্যান্য মহানগর, জেলা ও উপজেলা/মফস্বলের জন্য ভিন্ন ভিন্ন অঙ্ক নির্ধারিত। একই পাঠ্যক্রমে পড়া দুজন শিক্ষার্থীর ফি শুধু ঠিকানার কারণে এত আলাদা হবে কেন, প্রশ্নটা থেকেই যায়। ঢাকা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের পরিচালন ব্যয়ের পার্থক্য বাস্তব, তবু প্রস্তাব হলো একটি অভিন্ন মূল ফি থাকুক, আর প্রয়োজনে স্থানীয় অতিরিক্ত ব্যয়ের জন্য একটি পৃথক, স্বচ্ছ খাত রাখা হোক। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কোন খাতে কত অর্থ নেওয়া হচ্ছে তার হিসাব প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা গেলে ধারা ৫ দশমিক ৭ এর ‘বোর্ড অনুমোদিত ফি এর অতিরিক্ত কোনো অর্থ নেওয়া যাবে না’ শর্তটি কাগজে না থেকে বাস্তবেও কার্যকর হবে। একইভাবে ধারা ৫ দশমিক ৫-৫ দশমিক ৬ এ ভর্তি ফি প্রকাশের কথা থাকলেও ভর্তির পরের দুই বছরে সেশন চার্জ, রেজিস্ট্রেশন ফি, পরীক্ষা ও ল্যাব খরচসহ প্রকৃত মোট ব্যয় অভিভাবকের হাতে থাকে না; প্রতিটি প্রতিষ্ঠান একটি খাতভিত্তিক ছকে সম্ভাব্য মোট ব্যয় আগেই প্রকাশ করলে অভিভাবক জেনেশুনে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
শুধু আসন নয়, শিক্ষার নিশ্চয়তাও ভর্তি প্রক্রিয়া যত সুশৃঙ্খলই হোক, ভর্তি করানো আর মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এক কথা নয়। ভালো কলেজে প্রতিযোগিতা যতটা তীব্র, অনেক প্রতিষ্ঠানে আসন শূন্য থাকার বাস্তবতাও ততটাই প্রকট; পর্যাপ্ত শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ ও গ্রন্থাগার না থাকলে সেই ভর্তি কেবল একটি পরিসংখ্যান হয়ে থাকে। তাই ভর্তিনীতির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের মান ও অবকাঠামোর একটি স্বচ্ছ তথ্যভান্ডার, দুর্বল প্রতিষ্ঠানের পুনর্বিন্যাস এবং ভর্তি-পরবর্তী ঝরে পড়া রোধে কাউন্সেলিং সহায়তাও গুরুত্ব পাওয়া দরকার।
সময়ের কথা যখন কাগজে লেখা থাকে অনলাইন আবেদন ও সমন্বিত সময়সূচি ভর্তি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা আনতে ইতোমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সংযুক্ত সিডিউল অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়া একটি সুনির্দিষ্ট রেখচিত্রে বাঁধা: আবেদন গ্রহণ ২ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা পর্যন্ত, পুনঃনিরীক্ষণে ফল-পরিবর্তিত শিক্ষার্থীদের জন্য ১২-১৩ সেপ্টেম্বর আলাদা সুযোগ, ফল প্রকাশ ১৭ সেপ্টেম্বর, ভর্তি ২০-২২ সেপ্টেম্বর, ক্লাস শুরু ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে। প্রতিটি ধাপের জন্য দিন ও সময়সীমা পর্যন্ত বেঁধে দেওয়া এই বিস্তারিত সময়সূচিই প্রমাণ করে, অনিশ্চয়তা কমিয়ে একটি অনুমানযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি সম্ভব। সব শিক্ষা বোর্ডে একই প্রযুক্তিগত মান ও এমন সুনির্দিষ্ট সিডিউল প্রতিবছর নিশ্চিত করা
১৪
২৪ মন্তব্য