সহকারী শিক্ষক
৩০ আগস্ট, ২০২৬ ১২:১৬ অপরাহ্ণ
লুটপাট করতে কারমাইকেল কলেজের অনলাইন ট্রানজেকশন নগদে!

সরকারি কারমাইকেল কলেজের ত্রিশ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে আদায় করা কোটি কোটি টাকার ওপর অধ্যক্ষ সিন্ডিকেটের শ্যেনদৃষ্টি যেন সরছেই না। লুটপাট নিরঙ্কুশ করতে অনলাইনে ফি আদায়ের পদ্ধতি স্থগিত করে হাতে নগদ পদ্ধতি চালু করেছে এই সিন্ডিকেট। এতে সহযোগিতা করছেন বেনামিতে প্রতিষ্ঠান গড়ে সারাদেশের সরকারি কলেজে ডিজিটাল লুটেরা হিসেবে গত ১২ বছর ধরে চিহ্নিত শিক্ষা ক্যাডারের সহযোগী অধ্যাপক আবু সালেহ মোহাম্মদ মোজাহিদুল এবং কলেজটির কয়েকজন শিক্ষক, প্রধান সহকারি ও কয়েজন কর্মচারী। দৈনিক আমাদের বার্তার অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
অভিযোগ উঠেছে, গত ৩১ ডিসেম্বর নিয়োগ পাওয়ার নতুন অধ্যক্ষ চলতি বছরের মার্চে মৌখিক নির্দেশে ডিজিটাল লেনদেন সেবা ও অনলাইনে লেনদেন স্থগিত করে দেন। তিনি কলেজটিতে লুটপাট নিরঙ্কুশ ও নিচ্ছিদ্র করতে শতভাগ অনলাইনে চলা ট্রানজেকশন বন্ধ করেছেন মর্মে মত ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের।
নাম প্রকাশে অনিচছুক একাধিক শিক্ষার্থী দৈনিক আমাদের বার্তাকে জানিয়েছেন, কলেজের মোট ২৪টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকলেও অধিকাংশ ফি জমা নেওয়া হয় হাত-ক্যাশে। শুধু প্রত্যয়নপত্র ও প্রশংসাপত্র বাবদই হাতে নগদ টাকা আদায় করা হয় বার্ষিক প্রায় ত্রিশ লাখ টাকা। এসব খাতে টাকা আদায়ের কোনো রিসিটও দেওয়া হয় না।
যেসব খাতে টাকা নেওয়া হয় : একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ভর্তি, টিসি, পাঠ বিরতি, ফরম পূরণ ফি। অনার্সের বিভিন্ন বর্ষের নিয়মিত, গ্রেড উন্নয়ন, সেমিনার, ফরম পূরণ ফি, সেশন চার্জ, ল্যাব ফি ইত্যাদি। ডিগ্রি পাস কোর্সের বিভিন্ন বর্ষের নিয়মিত, অনিয়মিত ও প্রাইভেট এবং সার্টিফিকেট কোর্স, স্পেশাল কোর্স ও কন্ডিশনাল প্রোমোটেড পরীক্ষার ফি। মাস্টার্স নিয়মিত, অনিয়মিত, গ্রেড/মানোন্নয়ন ইত্যাদি পরীক্ষার ফি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ত্রিশ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর এই কলেজটিতে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের ফিসহ বার্ষিক বৈধ লেনদেন প্রায় ২০ কোটি টাকা। এর একটা অংশ ব্যাংকে লেনদেন হয়। এর বাইরেও আরও কয়েক কোটি টাকা নগদ লেনদেন হয় যা পুরোটাই ভাগাভাগি হয় সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে।
কলেজের প্রধান সহকারী মেহেদী হাসান দৈনিক আমাদের বার্তাকে বলেন, আমাদের কলেজের লেনদেন হয় ব্যাংকে। গত ত্রিশ বছর যাবত ব্যাংকে লেনদেন হয়। আমি কোনো আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই।
এর আগে চলতি বছরের ২২ জুলাই কলেজটিতে নানা অনিয়মের অভিযোগ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন শিক্ষার্থীরা। এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে অনিয়ম, শিক্ষার মানের অবনতি, আর্থিক অনিয়ম ও দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকটের অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলনে আলটিমেটাম দেন শিক্ষার্থীরা। কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়।
সচেতন শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কলেজের শিক্ষার্থী মুহাফিজ মোস্তফা, মাহমুদুল হাসান ও হাফিজুল ইসলাম বক্তব্য দেন।
ওই দিন তারা অভিযোগ করেন, টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নিতে না দেওয়ার নিয়ম থাকলেও পরে অর্থের বিনিময়ে অনেক শিক্ষার্থীকে এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত ফি ছাড়াও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের দাবি। এমনকি তিনটির বেশি বিষয়ে অকৃতকার্য কয়েকজন শিক্ষার্থীও টাকার বিনিময়ে ফরম পূরণ করতে পেরেছেন বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, এ কাজে কলেজের এক কম্পিউটার অপারেটর জড়িত ছিলেন। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রায় ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। এ–সংক্রান্ত স্ক্রিনশট ও শিক্ষার্থীদের বক্তব্য তাঁদের কাছে রয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেন। তবে ওই কর্মচারী তাঁদের জানিয়েছেন, অধ্যক্ষ ও উচ্চমাধ্যমিক কমিটির আহ্বায়কের অনুমতি ছাড়া তিনি কোনো কাজ করেননি।
আরও অভিযোগ করা হয়, গ্রন্থাগার ফি ও কলেজ ম্যাগাজিন বাবদ প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলেও সে অনুযায়ী সেবা মিলছে না। দরিদ্র তহবিলের অর্থও শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন না বলে দাবি করেন তাঁরা।
এ বিষয়ে কারমাইকেল কলেজের অধ্যক্ষ আবুল হোসেন মন্ডল দৈনিক আমাদের বার্তাকে বলেন, সব ধরনের লেনদেন হয় জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে। এখানে নগদ ক্যাশ গ্রহণের সুযোগ নেই। কারমাইকেল কলেজে কোনো আর্থিক অনিয়ম নাই।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ সঠিক নয় উল্লেখ করে অধ্যক্ষ আরো বলেন, শিক্ষার্থীরা না জেনে এসব অভিযোগ করেছে, তারা ভালো ভাবে জানেনা।
ফিরে দেখা : এদিকে ‘কারমাইকেল কলেজ অধ্যক্ষের দুর্নীতির তদন্ত করবে অধিদপ্তর’ শিরোনামে ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি দৈনিক শিক্ষাডটকম-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে তৎকালীন অধ্যক্ষ আবদুল লতিফ মিঞার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ লোপাট, দুর্ব্যবহারসহ তদন্ত করার কথা থাকলে তা করা হয়নি। ওই অধ্যক্ষ ছিলেন আওয়ামী লীগের শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের ভায়রা।
দৈনিক শিক্ষাডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, কলেজের শিক্ষকরা মোট ২০টি অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনের স্থানীয় অফিসে দাখিল করেছেন। এর মধ্যে আছে- ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে রংপুরের মাস্টারপাড়ায় সাত হাজার ২০০ এবং চার হাজার ৮০০ বর্গফুটের দুটি বাড়ি নির্মাণে অর্থের উৎস, কারমাইকেল কলেজ এবং অধ্যক্ষের সাবেক কর্মস্থল রোকেয়া কলেজে নিরীক্ষার নামে ২ কোটি টাকা আত্মসাৎ, দুই সন্তানকে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস পড়ানোর অর্থের উৎস, কর্মচারী না থাকা সত্ত্বেও মাসে ৭ হাজার টাকা করে আত্মসাৎ।


১৪
২৪ মন্তব্য