Loading..

ব্লগ

রিসেট

০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০৭ পূর্বাহ্ণ

সন্তানের প্রতি দায়িত্ব ও সুন্দর চরিত্র গঠনে অভিভাবকের ভূমিকা - মোঃ মুজিবুর রহমান

                                                            সন্তানের প্রতি দায়িত্ব সুন্দর চরিত্র গঠনে

অভিভাবকের ভূমিকা

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর

সন্তান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানুষের জন্য এক মহামূল্যবান আমানত। সন্তান শুধু পরিবারের আনন্দের উৎ নয়; সে ভবিষ্যৎ সমাজ, জাতি রাষ্ট্রের নির্মাতা। আজকের শিশু আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আলেম, প্রশাসক, কৃষক, ব্যবসায়ী, গবেষক, সমাজসেবক নেতৃত্বদাতা। তাই সন্তানের জন্ম দেওয়া যেমন দায়িত্ব, তেমনি তাকে সৎ, আদর্শবান, জ্ঞানী, বিনয়ী মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও অভিভাবকের অন্যতম প্রধান কর্তব্য।

রাসুলুল্লাহ সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা, মর্যাদা উত্তম শিক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। বর্ণিত হয়েছে

«أَكْرِمُوا أَوْلَادَكُمْ وَأَحْسِنُوا أَدَبَهُمْ»

অর্থাৎ, “তোমাদের সন্তানদের মর্যাদা দান করো এবং তাদের সুন্দর আচার-ব্যবহার শেখাও।
ইবনে হিব্বান

এই বাণীর মধ্যে সন্তান প্রতিপালনের একটি গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে। সন্তানকে শুধু খাদ্য, পোশাক বস্তুগত সুবিধা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং তার হৃদয়ে ঈমান, জীবনে আদব, আচরণে সৌন্দর্য, চিন্তায় শুদ্ধতা এবং কর্মে সততা সৃষ্টি করাই প্রকৃত দায়িত্ব।

সন্তান আল্লাহর আমানত

ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; সে আল্লাহর দেওয়া আমানত। আমানতের যথাযথ হক আদায় করা প্রত্যেক অভিভাবকের দায়িত্ব। সন্তানকে পৃথিবীতে এনে তার শিক্ষা, চরিত্র, ঈমান ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদাসীন থাকা একজন দায়িত্বশীল অভিভাবকের কাজ হতে পারে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন

হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ পাথর।
সূরা আত-তাহরীম,

এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নিজের সংশোধনের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সংশোধনের দায়িত্বও আমাদের ওপর রয়েছে। সন্তানকে শুধু দুনিয়াবি সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করলেই হবে না; তাকে আখিরাতের সফলতার পথও দেখাতে হবে।

সন্তানকে মর্যাদা দেওয়া কেন জরুরি

প্রত্যেক শিশুর একটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব রয়েছে। তার অনুভূতি আছে, অভিমান আছে, আনন্দ আছে, ভয় আছে, স্বপ্ন আছে এবং নিজের মতো করে পৃথিবীকে বোঝার চেষ্টা আছে। তাই সন্তানকে সব সময় তুচ্ছ করা, অন্যের সঙ্গে তুলনা করা, অপমান করা কিংবা তার কথা না শুনে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া তার মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সন্তানকে মর্যাদা দেওয়া মানে তার সব কথা মেনে নেওয়া নয়। বরং তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া, ভালো কাজের প্রশংসা করা, বয়স সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়া এবং তাকে পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা।

যে শিশু পরিবারে সম্মান পায়, সে অন্যকেও সম্মান করতে শেখে। যে শিশু ভালোবাসা পায়, তার হৃদয়ে ভালোবাসা জন্ম নেয়। যে শিশু কোমল ব্যবহার দেখে বড় হয়, সে সাধারণত কোমল সুন্দর আচরণের মূল্য বুঝতে শেখে।

সন্তানের প্রথম বিদ্যালয় পরিবার

শিশুর প্রথম বিদ্যালয় হলো তার পরিবার এবং প্রথম শিক্ষক তার মা-বাবা। শিশুরা শুধু উপদেশ শুনে শেখে না; তারা সবচেয়ে বেশি শেখে দেখে দেখে। বাবা-মা কীভাবে কথা বলেন, কীভাবে অতিথিকে অভ্যর্থনা করেন, কীভাবে প্রতিবেশীর সঙ্গে আচরণ করেন, কীভাবে দুর্বল মানুষের প্রতি সহানুভূতি দেখানশিশুরা সেসব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে।

অভিভাবক যদি সন্তানকে সত্যবাদিতা শেখান, কিন্তু নিজের জীবনে মিথ্যার আশ্রয় নেন, তাহলে শুধু মুখের উপদেশ সন্তানের চরিত্র গঠন করতে পারবে না। বাবা-মা যদি নামাজের গুরুত্ব বোঝান, কিন্তু নিজেরাই নামাজে অবহেলা করেন, তাহলেও শিশুর মনে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে পারে।

তাই সন্তানকে আদর্শ মানুষ করতে হলে আগে অভিভাবকদের নিজেদের আচরণে আদর্শ স্থাপন করতে হবে। সন্তানের সামনে দেওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষা হলো অভিভাবকের নিজের জীবন।

সুন্দর আচার-ব্যবহার শেখানো

সুন্দর চরিত্র ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই সালাম দেওয়া, সত্য কথা বলা, বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা, অসহায়কে সাহায্য করা, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করা, অতিথির সম্মান করা, ক্ষমা করতে শেখা এবং অন্যের কষ্ট বুঝতে শেখানো উচিত।

তাকে শেখাতে হবে

  • মিথ্যা বলা যাবে না;

  • প্রতারণা করা যাবে না;

  • কারও অধিকার নষ্ট করা যাবে না;

  • অহংকার করা যাবে না;

  • গালি দেওয়া যাবে না;

  • কাউকে উপহাস করা যাবে না;

  • দুর্বলকে কষ্ট দেওয়া যাবে না;

  • নিজের ভুল স্বীকার করতে হবে;

  • অন্যের ভালো কাজে আনন্দিত হতে হবে;

  • ক্ষমা ধৈর্যের চর্চা করতে হবে।

এগুলো শুধু সামাজিক শিষ্টাচার নয়; এগুলো একজন মুমিনের চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ঈমান আকিদার শিক্ষা

সন্তানের শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ হতে পারে না। তার হৃদয়ে আল্লাহর পরিচয়, ভালোবাসা ভয় সৃষ্টি করা প্রয়োজন। তাকে বোঝাতে হবেআল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তিনি আমাদের দেখেন, আমাদের কথা শোনেন এবং আমাদের সব কাজ সম্পর্কে অবগত।

শিশুকে বয়স বোধগম্যতা অনুযায়ী শেখাতে হবেআল্লাহ এক অদ্বিতীয়; তিনি সৃষ্টিকর্তা পালনকর্তা। রাসুলুল্লাহ আমাদের আদর্শ। কুরআন আমাদের জীবনপথের নির্দেশনা দেয়। সালাত, সিয়াম, দান, সত্যবাদিতা, পিতা-মাতার সেবা মানুষের প্রতি সদাচরণ আল্লাহর প্রিয় কাজ।

তবে ধর্মীয় শিক্ষা দিতে গিয়ে শিশুর ওপর অযথা কঠোরতা চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। ভালোবাসা, প্রজ্ঞা, ধৈর্য সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে দ্বীনের শিক্ষা তার হৃদয়ে পৌঁছে দিতে হবে।

নামাজের প্রতি অভ্যস্ত করা

সন্তানের চরিত্র গঠনে সালাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন

তোমার পরিবারকে সালাতের নির্দেশ দাও এবং নিজেও তাতে অবিচল থাকো।
সূরা ত্ব-হা, ১৩২

সন্তানকে নামাজ শেখাতে হবে ভালোবাসা নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে। আজান শুনলে নামাজের প্রস্তুতি নেওয়া, ওযু শেখানো, মসজিদ জামাতের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করাএসব শিশুর জীবনে সুন্দর অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

নামাজ শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি সময়ানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা আল্লাহসচেতনতারও শিক্ষা দেয়।

জ্ঞানার্জনে উৎসাহ দেওয়া

সন্তানের ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো শিক্ষা। ইসলাম জ্ঞানার্জনের প্রতি গভীরভাবে সাহিত করেছে। তাই সন্তানকে কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়, সত্যিকার জ্ঞানী বিবেকবান মানুষ হওয়ার জন্য শিক্ষা দিতে হবে।

তার মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস সৃষ্টি করতে হবে। প্রশ্ন করতে উৎসাহ দিতে হবে। কৌতূহলকে দমন না করে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে। তাকে কুরআন ইসলামী জ্ঞানের পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস, প্রযুক্তি প্রয়োজনীয় অন্যান্য জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করতে হবে।

দ্বীনি দুনিয়াবি কল্যাণকর জ্ঞানের সমন্বিত শিক্ষা একজন শিশুকে ভারসাম্যপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

শুধু ফল নয়, প্রচেষ্টার মূল্যায়ন

অনেক অভিভাবক সন্তানের পরীক্ষার ফলাফলকে তার যোগ্যতার একমাত্র মানদণ্ড মনে করেন। ফলে ভালো ফল না করলে সন্তানকে অপমান, ভর্ৎসনা কিংবা অন্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এতে শিশুর আত্মবিশ্বাস নষ্ট হতে পারে।

অভিভাবকের উচিত সন্তানের সামর্থ্য বুঝে তাকে উৎসাহ দেওয়া। সে কত নম্বর পেলতার পাশাপাশি সে কতটা চেষ্টা করেছে, কী শিখেছে এবং কোথায় উন্নতি করেছেসেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

একজন শিশু আজ দুর্বল হতে পারে, কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে আগামীকাল সে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে পারে। তাই সন্তানকে ব্যর্থতার জন্য ভেঙে না দিয়ে ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার চেষ্টা করতে শেখাতে হবে।

শাসন নয়, সুশাসন

সন্তানকে শাসন করা প্রয়োজন, কিন্তু শাসন মানেই রাগ, অপমান বা নির্যাতন নয়। প্রকৃত শাসন হলো ভালোবাসার সঙ্গে ভুল সংশোধন করা।

শিশু ভুল করলে প্রথমে জানতে হবেসে কেন ভুল করেছে। তারপর তার ভুলের ক্ষতিকর দিকটি বোঝাতে হবে এবং সঠিক পথ দেখাতে হবে। অযথা চিৎকার, গালাগালি কিংবা অপমান শিশুর হৃদয়ে ভয় সৃষ্টি করতে পারে; কিন্তু ভালোবাসা যুক্তিনির্ভর সংশোধন তার বিবেক জাগ্রত করতে পারে।

অভিভাবককে মনে রাখতে হবে, শিশু ভুল করে শেখে; তাই তার ভুলকে শুধু অপরাধ হিসেবে না দেখে শেখার সুযোগ হিসেবেও দেখতে হবে।

সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক

সন্তানের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে তার আনন্দ, দুঃখ, ভয়, সমস্যা ভুলের কথা অভিভাবকের কাছে নির্ভয়ে বলতে পারে। সন্তান যদি মনে করে—“আমি ভুল করলে মা-বাবা আমাকে বুঝবেন”—তাহলে সে বিপদের সময় পরিবারের কাছেই ফিরে আসবে।

কিন্তু যদি সে মনে করে—“আমার কথা বললে আমাকে অপমান করা হবে”—তাহলে সে নিজের সমস্যার সমাধান অন্যত্র খুঁজতে পারে। তাই সন্তানকে সময় দেওয়া, তার কথা শোনা এবং তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।

তুলনা নয়, উৎসাহ

তোমার ভাই তোমার চেয়ে ভালো, “অমুকের ছেলে এত ভালো, তুমি কেন পারো না”— ধরনের কথায় সন্তান সাময়িকভাবে অনুপ্রাণিত হওয়ার পরিবর্তে হীনম্মন্যতায় ভুগতে পারে।

প্রত্যেক শিশুর মেধা, আগ্রহ, সক্ষমতা শেখার গতি এক নয়। তাই একজনকে আরেকজনের সঙ্গে তুলনা না করে তার নিজের আগের অবস্থার সঙ্গে তুলনা করা উচিত।

আজ সে গতকালের চেয়ে একটু ভালো হয়েছে কি নাসেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

সন্তানের মধ্যে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি

শিশুকে ছোটবেলা থেকেই বয়স উপযোগী দায়িত্ব দিতে হবে। নিজের বই-খাতা গুছানো, ঘর পরিচ্ছন্ন রাখা, ছোট ভাই-বোনকে সহযোগিতা করা, গাছের যত্ন নেওয়া, অতিথিকে পানি দেওয়া ধরনের ছোট ছোট কাজ তার মধ্যে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে।

যে শিশু দায়িত্ব নিতে শেখে, সে ভবিষ্যতে পরিবার, সমাজ রাষ্ট্রের দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম হয়।

শিষ্টাচার সামাজিক মূল্যবোধ

সন্তানকে শেখাতে হবেমানুষ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তাই প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব রয়েছে, আত্মীয়ের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে, শিক্ষক বয়োজ্যেষ্ঠের প্রতি সম্মান রয়েছে এবং দরিদ্র অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা রয়েছে।

তাকে শেখাতে হবে রাস্তা-ঘাট নোংরা করা যাবে না, পরিবেশের ক্ষতি করা যাবে না, অন্যের সম্পদ নষ্ট করা যাবে না এবং জনসাধারণের সম্পদকে নিজের সম্পদের মতোই সম্মান করতে হবে।

এভাবে শিশুর মধ্যে ব্যক্তিগত নৈতিকতার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধও গড়ে উঠবে।

প্রযুক্তি ব্যবহারে অভিভাবকের দায়িত্ব

বর্তমান যুগে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুর জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তি জ্ঞানার্জনের অসাধারণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে, আবার অপব্যবহারের ঝুঁকিও রয়েছে।

তাই সন্তানকে শুধু মোবাইল ব্যবহার করবে না বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাকে প্রযুক্তির ভালো খারাপ দিক সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। বয়স উপযোগী ব্যবহারবিধি তৈরি করতে হবে। কোন বিষয় দেখা যাবে, কোনটি এড়িয়ে চলতে হবে এবং অনলাইনে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কীভাবে নিরাপদ আচরণ করতে হবেএসব শেখাতে হবে।

অভিভাবকের নিজের ব্যবহারও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে যে আচরণ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়, অভিভাবককেও সম্ভব হলে সেই আচরণ এড়িয়ে চলতে হবে।

ভালোবাসা শৃঙ্খলার ভারসাম্য

সন্তানকে ভালোবাসতে হবে, কিন্তু অন্ধ প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। আবার শৃঙ্খলা শেখাতে হবে, কিন্তু কঠোরতার নামে হৃদয় ভেঙে দেওয়া যাবে না।

অতিরিক্ত প্রশ্রয়ে শিশু দায়িত্বহীন স্বেচ্ছাচারী হতে পারে। আবার অতিরিক্ত কঠোরতায় সে ভীত, সংকুচিত কিংবা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রয়োজন ভালোবাসা, শৃঙ্খলা, স্বাধীনতা দায়িত্বের সুষম সমন্বয়।

সন্তানকে বলতে হবে—“তুমি আমাদের কাছে মূল্যবান; কিন্তু তোমার প্রতিটি কাজেরও একটি দায়িত্ব আছে।

সন্তানের সামনে পারিবারিক কলহ এড়িয়ে চলা

শিশুর কোমল মন পরিবারের পরিবেশ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। বাবা-মায়ের পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা শান্তিপূর্ণ আচরণ সন্তানের চরিত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে নিয়মিত ঝগড়া, গালাগালি, অপমান অশান্তি শিশুর মনে ভয় অনিরাপত্তা সৃষ্টি করতে পারে। তাই পারিবারিক সমস্যার সমাধানে ধৈর্য, সংযম পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা উচিত।

সন্তানের জন্য দোয়া করা

সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য অভিভাবকের দোয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনে আল্লাহর নেক বান্দাদের একটি দোয়া এসেছে

হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা দান করো এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানাও।
সূরা আল-ফুরকান, ৭৪

সন্তানের জন্য শুধু দুনিয়াবি সাফল্য নয়; ঈমান, তাকওয়া, উত্তম চরিত্র, হালাল জীবিকা, উপকারী জ্ঞান, নেক আমল আখিরাতের সফলতার জন্য দোয়া করা উচিত।

অভিভাবকের নিজের আমলই সন্তানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা

সন্তানের সামনে ইসলাম শেখানোর সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো নিজের জীবনকে ইসলামের আদর্শে গড়ে তোলা।

বাবা যদি সত্যবাদী হন, সন্তান সত্যের মূল্য শিখবে। মা যদি ধৈর্যশীল হন, সন্তান ধৈর্যের শিক্ষা পাবে। বাবা-মা যদি সালাতের প্রতি যত্নবান হন, সন্তানও নামাজের প্রতি আগ্রহী হবে। পরিবারে যদি কুরআন তিলাওয়াত, সালাম, দোয়া, সৌজন্য, পারস্পরিক সম্মান মানবিকতা থাকে, তাহলে শিশুর চরিত্রেও তার প্রতিফলন ঘটবে।

তাই সন্তানকে বদলানোর আগে অভিভাবককে নিজের জীবন পরিবর্তনের চেষ্টা করতে হবে।

সন্তানের ভবিষ্যৎ শুধু পেশা নয়, চরিত্র

আমরা সন্তানের জন্য ভালো চাকরি চাই, সুন্দর বাড়ি চাই, আর্থিক সচ্ছলতা চাইএসব প্রয়োজনীয়। কিন্তু সন্তানের চরিত্র যদি সুন্দর না হয়, তাহলে এসব অর্জনও পূর্ণ সাফল্য এনে দিতে পারে না।

একজন মানুষ উচ্চশিক্ষিত হয়েও অসৎ হতে পারে; ধনী হয়েও নিষ্ঠুর হতে পারে; ক্ষমতাবান হয়েও অন্যের অধিকার নষ্ট করতে পারে। তাই সন্তানের শিক্ষার সঙ্গে চরিত্রের শিক্ষা না থাকলে তার জ্ঞান সমাজের জন্য কল্যাণের বদলে ক্ষতির কারণও হতে পারে।

সন্তানের হাতে শুধু সনদ নয়, চরিত্রের শক্তি তুলে দিতে হবে।

সন্তানের অধিকার অভিভাবকের জবাবদিহি

সন্তানের খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান চিকিৎসার পাশাপাশি তার শিক্ষা, নিরাপত্তা, ভালোবাসা, মর্যাদা নৈতিক বিকাশের অধিকার রয়েছে। অভিভাবকের দায়িত্ব হলো এসব অধিকার যথাসম্ভব পূরণ করা।

আখিরাতে প্রত্যেক মানুষকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। রাসুলুল্লাহ বলেছেন

তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
সহিহ বুখারি সহিহ মুসলিম

অতএব সন্তান প্রতিপালনকে নিছক পারিবারিক বিষয় মনে করলে চলবে না; এটি একটি আমানত এবং দায়িত্ব।

আদর্শ সন্তান গঠনে পরিবার, বিদ্যালয় সমাজের সমন্বয়

সন্তানের চরিত্র গঠনে শুধু পরিবার নয়, বিদ্যালয় সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিবার যদি একটি শিক্ষা দেয়, বিদ্যালয় যদি বিপরীত শিক্ষা দেয় এবং সমাজ যদি সম্পূর্ণ ভিন্ন মূল্যবোধ সামনে তুলে ধরে, তাহলে শিশুর মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে।

তাই অভিভাবক, শিক্ষক, আলেম, সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে শিশুদের নৈতিক মানবিক শিক্ষা দিতে হবে।

বিদ্যালয়ে জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি শিষ্টাচার, সততা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম, পরিবেশসচেতনতা সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা থাকা প্রয়োজন।

আজকের সন্তান, আগামী দিনের সমাজ

একটি শিশুর চরিত্র আসলে ভবিষ্যৎ সমাজের চরিত্র। আজ যদি আমরা সন্তানদের সত্যবাদী করি, আগামীকাল সমাজে সত্যের চর্চা বাড়বে। আজ যদি তাদের আমানতদার করি, আগামীকাল কর্মক্ষেত্রে দুর্নীতি কমবে। আজ যদি তাদের মানুষের প্রতি ভালোবাসা শেখাই, আগামীকাল সমাজে হিংসা বিদ্বেষ কমবে।

অন্যদিকে আমরা যদি সন্তানদের শুধু অর্থ, প্রতিযোগিতা ব্যক্তিগত সাফল্যের শিক্ষা দিই, কিন্তু ন্যায়, সততা, মানবিকতা আল্লাহভীতি না শেখাই, তাহলে ভবিষ্যৎ সমাজে জ্ঞানী মানুষের সংখ্যা বাড়লেও আদর্শ মানুষের সংখ্যা নাও বাড়তে পারে।

তাই সন্তান গঠন মানেই ভবিষ্যৎ সমাজ গঠন।

অভিভাবকদের জন্য কিছু বাস্তব করণীয়

সন্তানের সুন্দর চরিত্র গঠনে অভিভাবকেরা নিয়মিতভাবে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অনুসরণ করতে পারেন

. সন্তানকে প্রতিদিন কিছু সময় মনোযোগ দিয়ে কথা শুনুন।
. তার ভালো কাজের প্রশংসা করুন।
. ভুল করলে অপমান না করে সংশোধন করুন।
. অন্য শিশুর সঙ্গে তাকে অহেতুক তুলনা করবেন না।
. ছোটবেলা থেকেই সালাম, সত্যবাদিতা শিষ্টাচার শেখান।
. কুরআন প্রয়োজনীয় দ্বীনি জ্ঞান শেখার সুযোগ দিন।
. নামাজের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করুন।
. বই পড়া জ্ঞানার্জনে উৎসাহ দিন।
. প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা শৃঙ্খলা শেখান।
১০. সন্তানকে বয়স অনুযায়ী দায়িত্ব দিন।
১১. তার সামনে মিথ্যা, গালি অশালীন আচরণ পরিহার করুন।
১২. পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখুন।
১৩. দরিদ্র, অসহায় প্রতিবেশীর প্রতি সহমর্মিতা শেখান।
১৪. সন্তানের বন্ধু পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকুন।
১৫. তার জন্য নিয়মিত দোয়া করুন।
১৬. সর্বোপরি নিজের জীবনকে সন্তানের জন্য উত্তম আদর্শ হিসেবে গড়ে তুলুন।

উপসংহার

সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া এক অমূল্য আমানত। তাকে শুধু বড় করে তোলা নয়, বরং সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই অভিভাবকের প্রকৃত সাফল্য। সন্তানের শরীরের যত্ন যেমন প্রয়োজন, তেমনি তার মন, মেধা, নৈতিকতা, ঈমান চরিত্রের যত্নও অপরিহার্য।

তোমাদের সন্তানদের মর্যাদা দান করো এবং তাদের সুন্দর আচার-ব্যবহার শেখাও”—এই বাণী তাই কেবল একটি উপদেশ নয়; এটি সন্তান প্রতিপালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা। সন্তানকে ভালোবাসতে হবে, মর্যাদা দিতে হবে, তার কথা শুনতে হবে, জ্ঞানার্জনে উৎসাহ দিতে হবে, নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে এবং সর্বোপরি আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক দৃঢ় করে দিতে হবে।

মনে রাখতে হবে, সন্তান আমাদের সম্পদ নয়আমানত; সন্তান আমাদের অহংকার নয়দায়িত্ব; সন্তান শুধু আজকের শিশু নয়আগামী দিনের সমাজ।

আজ আমরা যে সন্তান গড়ে তুলব, আগামীকাল সেই সন্তানই আমাদের পরিবার, সমাজ জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে। তাই আসুন, আমরা সন্তানদের শুধু সফল নয়সৎ, শুধু শিক্ষিত নয়সুশিক্ষিত, শুধু মেধাবী নয়বিবেকবান, শুধু প্রতিষ্ঠিত নয়মানবিক এবং শুধু দুনিয়ার জন্য নয়আখিরাতের সফলতার উপযোগী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার আন্তরিক চেষ্টা করি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্তানদের নেক, আদর্শবান, জ্ঞানী, বিনয়ী, আমানতদার মানবকল্যাণে নিবেদিত বান্দা হিসেবে কবুল করুন এবং আমাদেরকে তাদের হক যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

মন্তব্য করুন