সহকারী শিক্ষক
০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:০৭ পূর্বাহ্ণ
ডার্ক ম্যাটার কণা......
এখনো কেউ ডার্ক ম্যাটারকে সরাসরি হাতে ধরে দেখেনি। অথচ বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই মুহূর্তে আপনার শরীরের ভেতর দিয়ে কোটি কোটি ডার্ক ম্যাটার কণা চলে যাচ্ছে। এমন একটা জিনিস, যা আলোকে স্পর্শ করে না, কোনো আয়নায় প্রতিফলিত হয় না, কোনো ক্যামেরায় ধরা পড়ে না। তাহলে বিজ্ঞানীরা কীভাবে এর অস্তিত্ব খুঁজে বের করছেন?
ডার্ক ম্যাটার শনাক্ত করার গল্পটা অনেকটা রাতের অন্ধকারে একটা অদৃশ্য পাখির ডাক শোনার মতো। পাখিটা দেখা যায় না, কিন্তু তার ডাক শোনা যায়। বিজ্ঞানীরাও ঠিক তেমনি করে ডার্ক ম্যাটারের 'ডাক' শোনার চেষ্টা করছেন তিনটি ভিন্ন উপায়ে।
প্রথম পদ্ধতি: সরাসরি শনাক্তকরণ। এটা সবচেয়ে সোজা মনে হলেও বাস্তবে সবচেয়ে কঠিন। ধরুন, অন্ধকার ঘরে বসে আছেন। হঠাৎ অদৃশ্য বল আপনার হাতে আঘাত করল, আপনি ব্যথা পেলেন কিন্তু বল দেখতে পেলেন না। ডাইরেক্ট ডিটেকশন ঠিক এমনই। বিজ্ঞানীরা বিশেষ ডিটেক্টর তৈরি করেন, যেখানে ডার্ক ম্যাটার কণা যদি সাধারণ পরমাণুর সঙ্গে ধাক্কা খায়, তাহলে সেই ধাক্কার ছোট্ট সংকেত ধরা পড়ে।
এই ডিটেক্টরগুলো সাধারণত পৃথিবীর গভীরে বসানো হয়। খনি বা পাহাড়ের নিচে। কারণ উপরের স্তরে মহাজাগতিক রশ্মি ডিটেক্টরকে বিভ্রান্ত করে। ডিটেক্টরে তরল জেনন বা জার্মেনিয়ামের মতো পদার্থ ব্যবহার করা হয়। যখন ডার্ক ম্যাটার কণা পরমাণুর সঙ্গে ধাক্কা খায়, তখন ক্ষুদ্র আলো বা বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, এই ধাক্কা খুবই বিরল। একটা ডিটেক্টরে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয় একটা সম্ভাব্য সংকেতের জন্য। এখন পর্যন্ত কোনো পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে ডার্ক ম্যাটার ধরা পড়েনি।
দ্বিতীয় পদ্ধতি: পরোক্ষ শনাক্তকরণ। এখানে বিজ্ঞানীরা ডার্ক ম্যাটার কণার নিজেদের মধ্যে ধাক্কা বা ধ্বংসের ফলে তৈরি হওয়া অন্যান্য কণা খুঁজেন। ধরুন, দুটো ডার্ক ম্যাটার কণা ধাক্কা খেয়ে গামা রশ্মি, নিউট্রিনো বা পজিট্রন তৈরি করল। সেই গামা রশ্মি বা নিউট্রিনো যদি আমরা মহাকাশ থেকে ধরতে পারি, তাহলে বুঝতে পারব—হয়তো ডার্ক ম্যাটার সেখানে আছে।
এই কাজের জন্য ফার্মি গামা-রে স্পেস টেলিস্কোপ ও অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে বসানো আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি ব্যবহার করা হয়। যদি কোনো গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অতিরিক্ত গামা রশ্মি পাওয়া যায়, যা সাধারণ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উৎস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, তাহলে সেটা ডার্ক ম্যাটারের ইঙ্গিত হতে পারে। কিন্তু অসুবিধা হলো অন্যান্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাও একই রকম সংকেত দিতে পারে।
লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে প্রোটনকে প্রায় আলোর গতিতে ধাক্কা খাওয়ানো হয়। যদি সেই ধাক্কায় ডার্ক ম্যাটার কণা তৈরি হয়, তাহলে সেটা ডিটেক্টর থেকে বেরিয়ে যাবে, কারণ সে আলোর সঙ্গে বিক্রিয়া করে না। ফলে ডিটেক্টরে 'মিসিং এনার্জি' বা অদৃশ্য শক্তির হিসাব দেখা যাবে। এখন পর্যন্ত এলএইচসিতেও নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গ্যালাক্সির ঘূর্ণন গতি, মহাকর্ষীয় লেন্সিং, মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ডগুলো ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ। কিন্তু এগুলো কণার প্রকৃতি বলে না, শুধু বলে: "অদৃশ্য ভর আছে"।
এতগুলো পদ্ধতি, পরীক্ষা ও বছরের পর বছর চেষ্টা করেও কেন এখনো নিশ্চিতভাবে ধরা পড়েনি? কারণ ডার্ক ম্যাটার হয়তো আমাদের ধারণার চেয়েও বেশি রহস্যময়। হয়তো সে WIMP নয়, অ্যাক্সিয়ন নামক আরেক ধরনের হালকা কণা। হয়তো সম্পূর্ণ নতুন কোনো পদার্থ, যা আমরা এখনো কল্পনাও করিনি।
বিজ্ঞানীরা এখন নতুন নতুন ডিটেক্টর তৈরি করছেন, কেউ আরও সংবেদনশীল, কেউ ভিন্ন ভিন্ন ভরের কণা খুঁজছে। ভবিষ্যতে হয়তো কোনো একদিন একটা সংকেত আসবে, যা সব সন্দেহ দূর করে দেবে।
এই পুরো প্রচেষ্টা আমাদের একটা গভীর শিক্ষা দেয়। যা দেখা যায় না, তাকেও খোঁজা যায়। যা স্পর্শ করা যায় না, তার প্রভাবও মাপা যায়। ডার্ক ম্যাটার শনাক্তকরণের এই যাত্রা শুধু একটা কণা খোঁজার গল্প নয়; এটা মানুষের কৌতূহলের গল্প। অজানা জিনিসকে জানার ইচ্ছাই বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় শক্তি।
শেষে মনে রাখবেন, সেই অদৃশ্য সুতো এখনো আমাদের চোখ এড়িয়ে চলছে। কিন্তু মানুষের তৈরি যন্ত্রগুলো ধীরে ধীরে সেই সুতোর কাছে পৌঁছাচ্ছে। হয়তো কোনো একদিন আমরা সেই সুতোকে স্পর্শ করতে পারব। আর সেই দিনটা হবে মানব ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের শুরু।
১
১ মন্তব্য