সহকারী শিক্ষক
০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:১১ অপরাহ্ণ
মিডিয়া ব্যবহার ও সাইবার সচেতনতা
দায়িত্বশীল সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার ও সাইবার সচেতনতা
মনিরুল হক,
বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। Facebook, YouTube, TikTok, Instagram কিংবা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আমরা প্রতিদিন অসংখ্য তথ্য, ছবি, ভিডিও ও সংবাদ দেখি এবং শেয়ার করি। কিন্তু অনলাইনে কোনো তথ্য দেখলেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া বা যাচাই না করে অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের জন্য যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি সমাজের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে। তাই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হওয়া উচিত: Think Before You Share.
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া সব ভুল বা ক্ষতিকর তথ্য একই ধরনের নয়। কোনো ব্যক্তি না জেনে ভুল তথ্য শেয়ার করলে তাকে বলা হয় Misinformation। আবার কেউ কোনো তথ্য মিথ্যা জেনেও মানুষকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দিলে সেটি Disinformation। অন্যদিকে কোনো তথ্য সত্য হলেও যদি সেটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়, যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্ষতি হয়, সেটি Malinformation। তাই একটি তথ্য দেখার পর শুধু তথ্যটি কী বলছে তা নয়, বরং তথ্যটির উৎস কী, উদ্দেশ্য কী এবং এর প্রভাব কী হতে পারে, সেটিও আমাদের বিবেচনা করতে হবে।
কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে আমরা একটি সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারি: STOP, TRACE, OBSERVE, PROVE। অর্থাৎ প্রথমে STOP, একটু থামুন এবং আবেগের বশে সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার করবেন না। এরপর TRACE, তথ্যটির উৎস কোথায় এবং মূল উৎসটি বিশ্বাসযোগ্য কি না তা খুঁজে দেখুন। তারপর OBSERVE, ছবির তারিখ, ভিডিওর প্রেক্ষাপট, ভাষা, শিরোনাম এবং তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল আছে কি না লক্ষ্য করুন। সবশেষে PROVE, একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্যটি যাচাই করুন। যাচাই করতে না পারলে শেয়ার না করাই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
এর সঙ্গে আমাদের Netiquette বা Internet Etiquette সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে। Netiquette হলো ইন্টারনেটে ভদ্র, দায়িত্বশীল ও সম্মানজনক আচরণের নিয়ম। অনলাইনে কাউকে অপমান করা, গালাগালি করা, Cyberbullying করা, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা, গুজব ছড়ানো, অন্যের লেখা বা ছবি নিজের নামে ব্যবহার করা কিংবা কারও মতামতের কারণে তাকে হেয় করা কখনোই দায়িত্বশীল আচরণ নয়। মনে রাখতে হবে, পর্দার ওপাশেও একজন বাস্তব মানুষ আছেন। তাই অনলাইনে এমন কিছু লিখব বা প্রকাশ করব না, যা সামনাসামনি কাউকে বলা বা করা আমাদের পক্ষে গ্রহণযোগ্য হতো না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো Cyber Crime বা সাইবার অপরাধ। ইন্টারনেট, কম্পিউটার, স্মার্টফোন বা ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধকে সাধারণভাবে সাইবার অপরাধ বলা হয়। এর মধ্যে অনলাইন প্রতারণা, ফিশিং, হ্যাকিং, পরিচয় চুরি, অ্যাকাউন্ট দখল, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি বা অপব্যবহার, সাইবারবুলিং, অনলাইনে হয়রানি, ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণা এবং ক্ষতিকর বা অবৈধ কনটেন্ট ছড়ানোর মতো ঘটনা থাকতে পারে। এসব অপরাধ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে শক্তিশালী ও আলাদা password ব্যবহার, Two-Factor Authentication চালু রাখা, OTP বা password কাউকে না দেওয়া, সন্দেহজনক link-এ click না করা এবং ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।
বাংলাদেশেও সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইন রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কাঠামো তৈরি করেছিল; পরবর্তীতে বাংলাদেশের সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত আইনি কাঠামোয় পরিবর্তন এসেছে। তাই শিক্ষার্থীদের মনে রাখা জরুরি, অনলাইনে করা কাজেরও বাস্তব ও আইনগত পরিণতি হতে পারে। কোনো ব্যক্তিকে হয়রানি, প্রতারণা, হুমকি বা ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা কখনোই নিছক মজা নয়।
সবশেষে আমি তোমাদের একটি বিষয় মনে রাখতে বলব। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা শুধু Information Consumer নই, আমরা Information User এবং Information Sharer-ও। তাই একটি তথ্য আমাদের কাছে পৌঁছানোর পর সেটি অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আগে আমাদের দায়িত্বশীল হতে হবে।
থামো। যাচাই করো। ভাবো। তারপর শেয়ার করো।
কারণ একটি ভুল click একজন মানুষের ক্ষতি করতে পারে, একটি মিথ্যা post একটি পরিবারকে বিপদে ফেলতে পারে, আর একটি গুজব পুরো সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
তাই আমাদের মূল অঙ্গীকার হোক:
STOP → TRACE → OBSERVE → PROVE → THINK BEFORE YOU SHARE
সচেতন ব্যবহারকারী হই, দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক হই।
মোঃ মনিরুল হক সহকারী শিক্ষক আমলাবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয় খোকসা, কুষ্টিয়া। ০১৭২২ ২৭৩২৭২
|
|
১
১ মন্তব্য