সিনিয়র শিক্ষক
০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:২০ অপরাহ্ণ
প্রথম শ্রেণির ভর্তিতে লটারি: সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমমান করার কার্যকর পদক্ষেপ
শিক্ষাক্ষেত্রে নানা অব্যবস্থাপনার ফলে শিক্ষার সার্বিক মান বিপর্যয় হয়েছে। একথা অস্বীকার করার অবকাশ নেই। তবে নামিদামি বিদ্যালয়গুলোর সুনামের মুখোশ অনেকটা ফুটে উঠেছে। তেল, মসলা যথাযথ না হলে যেমন রান্নার নিখুঁত স্বাদ পাওয়া যায় না, তেমনি ভর্তিতে লটারি ব্যবস্থা প্রমাণ করেছে, ভালো শিক্ষার্থী বাছাই করে ভর্তি না করলে, শুধু শিক্ষকদের দিয়ে পাঠদান করিয়ে বিদ্যালয়ের ভালো রেজাল্টের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখা যায় না।
আমাদের সমাজে নামিদামি স্কুল বলতে বুঝায়, যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়ে থাকেন। সাধারণত জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য খুব কড়াকড়িভাবে প্রিটেস্ট/টেস্টে বাছাই করে শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার জন্য সেন্টারে পাঠানো হয়ে থাকে। ভালো ছাত্র-ছাত্রী স্বাভাবিকভাবে অতি উত্তম রেজাল্ট করে থাকে। সাধারণত আমাদের প্রেক্ষাপটের কথা চিন্তা করলে দেখা যায়, মেধাবী ও লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগীরা ভালো ফলাফল অর্জন করে থাকেন।এ ছাড়া নামিদামি স্কুলগুলোর বেশিরভাগ অভিভাবকই আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। তারা টাকার বিনিময়ে ছেলে-মেয়েদের একাধিক শিক্ষক রেখে বা কোচিং সেন্টারে পড়িয়ে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট অর্জন করে থাকেন। লটারির মাধ্যমে ভর্তি হয়ে যে সব আর্থিক সক্ষমতাবিহীন অভিভাবক রয়েছেন, তাদের কেউ কেউ সন্তানদের অন্যত্র ভর্তি করান। দরিদ্র পরিবারের অন্যান্যরা নিজেদের আর্থিক দৈন্য সত্ত্বেও সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চেষ্টা করে থাকেন। তাদের পরীক্ষার ফলাফল অন্যদের তুলনায় কিছুটা খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। নামিদামি স্কুলগুলোর কোচিং বাণিজ্য ব্যাপক। বেশিরভাগ শিক্ষক কোচিংয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগতভাবে বুঝানোর সময় পায় না। শিটের মাধ্যমে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করিয়ে থাকেন। এ সব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জন ব্যতিরেকে জিপিএ-৫ নিয়ে বেড়ে ওঠে। প্রথমত, হোঁচট খেয়ে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল, বুয়েট ভর্তি পরীক্ষায়। পরবর্তীতে হোঁচট খেয়ে থাকে চাকরি বা মেধা যাচাই পরীক্ষায়। আমাদের অভিভাবকদের ভালো ভালো স্কুল আর উত্তম রেজাল্ট নিয়ে গর্বের অন্ত নেই। প্রতিযোগিতায় না টিকতে পারায় এ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করতে একটুও কৃপণতা করেন না। এর মূল গলদ শিট ও মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উগরে দিয়ে নাম্বার পাওয়া। জ্ঞান অর্জন করে পাস করলে এ অবস্থা হতো না। আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান (সাবেক উপদেষ্টা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার) পিপিআরসির উদ্যোগে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সুশিক্ষা আন্দোলন সম্পর্কিত গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল। আলোচনার বিষয় ছিল, ‘ভালো স্কুল সম্পর্কে’। সে আলোচনায় আমার বক্তব্য ছিল, যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের পড়া ভালোভাবে বিদ্যালয়ে শিখিয়ে দেওয়া হয়, বাড়িতে লেখাপড়ার চাপ বা মুখস্থ করতে বা গৃহ শিক্ষক তথা কোচিংমুখী হতে হয় না। যে সব স্কুলে শিক্ষার্থীর শারীরিক ও মানসিক বিকাশসহ জ্ঞান অর্জনমুখী শিক্ষা দেওয়া হয়। ঐ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত ভালো শিক্ষালয়। উপস্থিত সুধীবৃন্দসহ সবাই আমার বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেছিলেন। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞান সমৃদ্ধির পরিবর্তে মুখস্থনির্ভর শিক্ষা চলে আসছে। এতে বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করেও জ্ঞান সমৃদ্ধ হচ্ছেন না। এজন্য দরকার পাঠ্যবইয়ের কনটেন্ট কমিয়ে জ্ঞাননির্ভর বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা।
বর্তমান নামিদামি স্কুলসহ অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চ্যালেঞ্জ: দুই শিফটের স্কুলে পাঠদানের কম সময়, জানুয়ারি মাসে শীতে শ্রেণির কার্যক্রম হয় না বললেই চলে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশেষ করে মাত্রাধিক বৃষ্টিতে ক্লাস হয় না। নভেম্বর মাসের মধ্যেই বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করায় কর্মঘণ্টা কমে যায়। কেবলমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষা ও ফলাফল ডিসেম্বর মাসে সমাপ্ত করা হয়ে থাকে। নামিদামি স্কুলগুলোতে এসএসসি, এইচএসসি, প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার সেন্টার হয়ে থাকে। নানা কারণে শিক্ষকেরা বইয়ের বিষয়বস্তু শেষ করতে পারে না। ফলে বাধ্য হয়ে গৃহ শিক্ষক, কোচিং ও নোট গাইডের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। অপরদিকে বর্তমান বেতন দিয়ে শিক্ষকদের জীবনযাপন কোনো অবস্থায় সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়ে তাদের কোচিং, টিউশনি করতে হচ্ছে। চ্যালেঞ্জগুলো দূর না করে কেবলমাত্র হুমকি-ধমকি দিয়ে শিক্ষা-জ্ঞান অর্জনমুখী করার পরিবর্তে শুধু সনদে থাকবে। লটারি পদ্ধতি বাতিল করা মানে শুধু তেলা মাথায় তেল দেওয়া। ভর্তি কোচিং চালু জোরদার করা, নামিদামি স্কুলগুলোতে ধনী-দরিদ্র বৈষম্য সৃষ্টি করা, কোচিং ও টিউশনি বাণিজ্য তথা দুর্নীতি প্রসার ব্যতিরেকে কিছুই দৃশ্যমান হবে না। যে সব স্কুল খারাপ রেজাল্ট করেছে, তাদের এমপিও বন্ধ না করে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের সহযোগিতায় রাষ্ট্র এগিয়ে আসবেন। আর নয় শিক্ষা বাণিজ্যকরণ। আমাদের শিক্ষার উদ্দেশ্য হোক জ্ঞান অর্জন। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হোক একই মানের।
লেখক: Siddiqur Raman শিক্ষাবিদ
১
১ মন্তব্য