প্রভাষক
০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:২৯ অপরাহ্ণ
একজন শিক্ষার্থীকে ভেঙে নয়, গড়ে তুলতে হবে
একজন শিক্ষকের নীরব প্রভাব
একটি সুন্দর কথা একজন শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিতে পারে
শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি মানুষ গড়ার মহান দায়িত্ব। একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেন না; তিনি শিক্ষার্থীর চিন্তা, আচরণ, আত্মবিশ্বাস ও মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
একজন শিক্ষকের একটি উৎসাহের বাক্য যেমন একজন শিক্ষার্থীকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিতে পারে, তেমনি একটি অপমানজনক বাক্য তার আত্মবিশ্বাসকে দীর্ঘদিনের জন্য ভেঙে দিতে পারে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কখনো কখনো শিক্ষার্থীর ভুল, দুর্বল ফলাফল কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের কারণে তাকে সবার সামনে অপমান করার ঘটনা ঘটে। শিক্ষক হয়তো রাগের মুহূর্তে কথাটি বলে ফেলেন এবং কিছুক্ষণ পর তা ভুলেও যান। কিন্তু সেই কথাটি শিক্ষার্থীর মনে কতটা গভীর ক্ষত তৈরি করেছে—তা হয়তো শিক্ষক কখনো জানতে পারেন না।
অপমান কি সত্যিই শিক্ষার উপায়?
একজন শিক্ষার্থী ভুল করতেই পারে। বরং ভুল করা শেখারই একটি স্বাভাবিক অংশ। যে শিক্ষার্থী আজ একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না, সঠিক দিকনির্দেশনা ও উৎসাহ পেলে আগামীকাল সে-ই হয়তো শ্রেণির সবচেয়ে ভালো উত্তরটি দিতে পারে।
তাই ভুল করলে তাকে বলা যেতে পারে—
“আরেকবার চেষ্টা করো, তুমি পারবে।”
কিন্তু যদি বলা হয়—
“তোমার মাথায় কিছু নেই”, “তুমি কোনোদিন কিছু করতে পারবে না”, “তুমি এত বোকা কেন?”
তাহলে শিক্ষার্থী হয়তো উত্তরটি শেখার পরিবর্তে নিজের যোগ্যতা নিয়েই সন্দেহ করতে শুরু করবে।
শিক্ষার উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীকে ছোট করা নয়; বরং তাকে তার সম্ভাবনার জায়গায় পৌঁছে দেওয়া।
শাসন ও অপমান এক নয়
শিক্ষার্থীর ভুল হলে তাকে শাসন করা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু শাসন আর অপমান এক বিষয় নয়।
শিক্ষক দৃঢ়ভাবে বলতে পারেন—
“তোমার কাজটি ঠিক হয়নি। কেন ঠিক হয়নি, আমরা সেটা বুঝে নিই। ভবিষ্যতে যেন এমন না হয়।”
এখানে ভুলটি চিহ্নিত করা হয়েছে, কিন্তু শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্বকে আঘাত করা হয়নি।
একজন দক্ষ শিক্ষক শিক্ষার্থীর আচরণ সংশোধন করেন, ব্যক্তিত্বকে অপমান করেন না।
শ্রেণিকক্ষ হোক নিরাপদ
একটি আদর্শ শ্রেণিকক্ষ এমন হওয়া উচিত, যেখানে শিক্ষার্থী ভুল উত্তর দিতে ভয় পাবে না, প্রশ্ন করতে সংকোচ বোধ করবে না এবং নিজের মতামত প্রকাশ করতে নিরাপদ অনুভব করবে।
শিক্ষার্থীর মনে যদি থাকে—
“আমি ভুল করলেও আমার শিক্ষক আমাকে বুঝিয়ে দেবেন”
তাহলে সে শেখার জন্য আরও বেশি আগ্রহী হবে।
কিন্তু যদি তার মনে থাকে—
“ভুল করলে শিক্ষক আমাকে সবার সামনে অপমান করবেন”
তাহলে সে ধীরে ধীরে প্রশ্ন করা, উত্তর দেওয়া ও অংশগ্রহণ করা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেবে।
প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পেছনে একটি গল্প আছে
একজন শিক্ষার্থী কেন পড়াশোনায় দুর্বল, কেন সে অমনোযোগী কিংবা কেন সে বারবার ভুল করছে—আমরা সবসময় তার কারণ জানি না।
হয়তো সে পারিবারিক কোনো সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। হয়তো তার শেখার পদ্ধতি অন্যদের চেয়ে আলাদা। হয়তো সে আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছে। আবার হয়তো তার প্রয়োজন একটু বেশি সময় ও সহযোগিতা।
তাই দুর্বল শিক্ষার্থীকে অপমান নয়, বরং প্রয়োজন আরও বেশি সহানুভূতি ও সহযোগিতা।
একজন শিক্ষক যদি তাকে বলেন—
“তুমি ধীরে ধীরে চেষ্টা করো, আমি তোমার পাশে আছি।”
এই একটি বাক্যই হয়তো তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
শিক্ষকের কথা শিক্ষার্থীর মনে থেকে যায়
আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই এমন কোনো শিক্ষক থাকেন, যাঁর একটি কথা আমরা বহু বছর পরও মনে রাখি।
কারণ শিক্ষকের কথা শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা শিক্ষার্থীর মনে, আচরণে এবং ভবিষ্যৎ জীবনে প্রভাব ফেলে।
তাই কোনো শিক্ষার্থীকে কঠিন কথা বলার আগে একজন শিক্ষক যদি নিজেকে প্রশ্ন করেন—
“এই কথাটি যদি আমার নিজের সন্তানের উদ্দেশ্যে বলা হতো, আমি কি তা মেনে নিতে পারতাম?”
তাহলে হয়তো অনেক কথাই বলার আগে তিনি থেমে যাবেন।
শিক্ষক নিজেই একটি জীবন্ত পাঠ্যবই
শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কাছ থেকে শুধু বাংলা, ইংরেজি, গণিত, আরবি কিংবা অন্য কোনো বিষয় শেখে না। তারা শিক্ষকের আচরণ দেখে শেখে—
কীভাবে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়,
কীভাবে ভুল করা মানুষকে সংশোধনের সুযোগ দিতে হয়,
কীভাবে দুর্বল মানুষকে সহযোগিতা করতে হয় এবং
কীভাবে অন্যের সম্মান রক্ষা করতে হয়।
তাই শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীকে সম্মান করেন, শিক্ষার্থীও অন্যকে সম্মান করতে শেখে।
একজন শিক্ষকের আচরণই অনেক সময় শিক্ষার্থীর জন্য সবচেয়ে কার্যকর জীবন্ত পাঠ।
আমরা কী করতে পারি?
শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সম্মানজনক ও ইতিবাচক শ্রেণিকক্ষ তৈরি করতে আমরা শিক্ষকরা কিছু বিষয় সচেতনভাবে অনুসরণ করতে পারি—
১. সবার সামনে শিক্ষার্থীকে অপমান না করা।
২. ভুল উত্তর দিলে উপহাস না করে সংশোধন করা।
৩. শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব নয়, তার ভুল আচরণকে চিহ্নিত করা।
৪. রাগের মুহূর্তে কষ্টদায়ক কথা বলা থেকে বিরত থাকা।
৫. দুর্বল শিক্ষার্থীকে অবহেলা না করে সহযোগিতা করা।
৬. শিক্ষার্থীর প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া।
৭. একজন শিক্ষার্থীকে অন্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে তুলনা করে হেয় না করা।
৮. ভালো কাজের জন্য প্রশংসা ও উৎসাহ দেওয়া।
৯. শাসনের সময়ও শিক্ষার্থীর আত্মসম্মান রক্ষা করা।
১০. প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যে সম্ভাবনা আছে—এই বিশ্বাস রাখা।
একজন শিক্ষার্থীকে ভেঙে নয়, গড়ে তুলতে হবে
আজ যে শিক্ষার্থীটি পড়াশোনায় দুর্বল, সে-ই হয়তো আগামী দিনের একজন আদর্শ শিক্ষক, চিকিৎসক, গবেষক, উদ্যোক্তা কিংবা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
আমরা জানি না, আমাদের শ্রেণিকক্ষে বসে থাকা কোন শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে কত বড় দায়িত্ব পালন করবে।
তাই শিক্ষার্থীর ভুল দেখে তাকে ভেঙে না দিয়ে গড়ে তুলি।
তার দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসি না করে তার শক্তির জায়গাটি খুঁজে বের করি।
ভয় দেখিয়ে নয়, ভালোবাসা, শাসন ও সম্মানের সমন্বয়ে তাকে শেখাই।
কারণ—
“শিক্ষার্থীকে অপমান করে হয়তো সাময়িকভাবে নীরব করা যায়; কিন্তু সম্মান ও ভালোবাসা দিয়ে তাকে আজীবনের জন্য শেখার পথে এগিয়ে দেওয়া যায়।”
শেষ কথা
একজন প্রকৃত শিক্ষক সেই ব্যক্তি নন, যাঁকে শিক্ষার্থীরা শুধু ভয় পায়। প্রকৃত শিক্ষক হলেন তিনি, যাঁকে শিক্ষার্থীরা সম্মান করে, বিশ্বাস করে এবং জীবনের কঠিন সময়ে যার কথা মনে করে।
আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো এমন হোক, যেখানে শিক্ষার্থী ভুল করার পর ভেঙে পড়বে না; বরং নতুন করে চেষ্টা করার সাহস পাবে।
আমরা এমন শিক্ষক হতে চাই, যাঁদের কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা শুধু একটি বিষয় নয়—জীবনকে সুন্দরভাবে বাঁচার শিক্ষাও শিখবে।
আসুন, আমরা শিক্ষার্থীদের অপমান না করি; তাদের সম্ভাবনাকে সম্মান করি।
তাদের ভয় না দেখিয়ে আত্মবিশ্বাসী করে তুলি।
তাদের ছোট না করে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখাই।
কারণ একজন শিক্ষকের হাতে শুধু একটি ক্লাস নয়—একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।
লেখক পরিচিতি
মো. সাইফুল ইসলাম
প্রভাষক (আরবি) কলামিস্ট।
১৪
২১ মন্তব্য