সহকারী শিক্ষক
০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:৫৮ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
বর্তমান পরীক্ষা ব্যবস্থা মূলত মেধা মাপার চেয়ে শিক্ষার্থীর "স্মরণশক্তি" এবং "নির্দিষ্ট ছকে উত্তর দেওয়ার দক্ষতা" বেশি পরিমাপ করে।
শিক্ষা গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মেধা কেবল পাঠ্যবই মুখস্থ করা বা তিন ঘণ্টার পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং ব্যবহারিক বুদ্ধিমত্তার সমাহার।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আলোকে বিষয়টি নিচে গভীরভাবে মূল্যায়ন করা হলো:
মুখস্থবিদ্যার প্রাধান্য: ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের পাবলিক পরীক্ষাগুলো (যেমন—SSC বা HSC) এমনভাবে ডিজাইন করা যে, যে শিক্ষার্থী মূল বই বা গাইড বই বেশি মুখস্থ রাখতে পারে, সে পরীক্ষায় ভালো ফল করে। এতে চিন্তাশক্তি বা মৌলিকত্বের জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়।
সৃজনশীল পদ্ধতির ত্রুটিপূর্ণ প্রয়োগ: সৃজনশীল (Creative) পদ্ধতি চালু করা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে গাইডের ওপর নির্ভরতা কমেনি। শিক্ষকরাও অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু "নমুনা উত্তর" অনুযায়ী নম্বর প্রদান করেন, যা শিক্ষার্থীর নিজস্ব চিন্তা প্রকাশে বাধা দেয়।
‘তিন ঘণ্টার পরীক্ষা’র ভাগ্য নির্ধারণ: একজন শিক্ষার্থী সারাবছর কতটা শিখল বা তার মেধা কতটা, তা মাত্র তিন ঘণ্টার একটি লিখিত পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। পরীক্ষার দিন অসুস্থতা, মানসিক চাপ বা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে একজন মেধাবী শিক্ষার্থীও খারাপ ফল করতে পারে।
কোচিং ও প্রশ্নব্যাংক নির্ভরতা: বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী বিগত বছরের প্রশ্ন (Question Bank) এবং কোচিং সেন্টারের 'সাজেশন' মুখস্থ করে জিপিএ-৫ (GPA-5) পাচ্ছে। এটি পরীক্ষা পাসের কৌশল হতে পারে, কিন্তু মেধার সঠিক প্রতিফলন নয়।
একজন মানুষের মেধার বহুধা রূপ (Multiple Intelligences) থাকতে পারে, যা আমাদের প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতিতে মূল্যায়নের কোনো সুযোগ নেই:
ব্যবহারিক ও কারিগরি দক্ষতা: বিজ্ঞানের থিওরি মুখস্থ করা আর বাস্তব জীবনে ল্যাবরেটরিতে কাজ করা বা প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান করা এক নয়।
সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা: ছবি আঁকা, লেখালেখি, নতুন কোনো চিন্তার বিকাশ বা নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতার মূল্যায়ন সাধারণ লিখিত পরীক্ষায় সম্ভব নয়।
আবেগিক বুদ্ধিমত্তা (EQ): দলগত কাজ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, চাপ সামলানো এবং সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করার ক্ষমতাও মেধার অংশ, যা পরীক্ষায় প্রতিফলিত হয় না।
বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি যে নতুন শিক্ষাক্রম (New Curriculum) চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, তার মূল লক্ষ্যই ছিল পরীক্ষা-নির্ভরতা কমিয়ে সামগ্রিক ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন (Continuous Assessment) চালু করা। এর উদ্দেশ্য হলো:
শিক্ষার্থী কতটুকু মুখস্থ করতে পারল তার চেয়ে সে কতটুকু প্রয়োগ করতে পারছে তা দেখা।
প্রজেক্ট ওয়ার্ক, দলগত কাজ এবং উপস্থাপনার মাধ্যমে তার মেধার বহুমুখী বিকাশ ঘটানো।
তবে এই নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির সফল বাস্তবায়নে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও সঠিক অবকাঠামোর অভাব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
পরীক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থাকলেও এটি পুরোপুরি নিরর্থক নয়। বাংলাদেশে বড় আকারের জনসংখ্যা ও সীমিত সম্পদের কারণে:
এটি একটি সার্বজনীন ও বস্তুবাদী (Objective) বাছাই প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করে।
শিক্ষার্থীর নিয়মিত পড়াশোনার শৃঙ্খলা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশে প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থা প্রধানত একটি "বাছাইকরণ ও নম্বর দেওয়ার প্রক্রিয়া", এটি পূর্ণাঙ্গ "মেধা পরিমাপের যন্ত্র" নয়।
পরীক্ষায় প্রাপ্ত জিপিএ-৫ বা উচ্চ নম্বর কোনো শিক্ষার্থীর পরিশ্রমী হওয়া বা ভালো নম্বর পাওয়ার কৌশলে পারদর্শী হওয়ার প্রমাণ হতে পারে, কিন্তু এটিকে তার মেধার চূড়ান্ত মাপকাঠি ধরা ভুল। প্রকৃত মেধা মূল্যায়নের জন্য লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি প্রাক্টিক্যাল পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট, বিশ্লেষণী পরীক্ষা এবং শিক্ষার্থীর সার্বিক দক্ষতার ধারাবাহিক মূল্যায়ন আবশ্যক।
১৪
২১ মন্তব্য