সহকারী শিক্ষক
০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় “মুখস্থবিদ্যা বনাম দক্ষতা”-র দ্বন্দ্বটি নতুন নয়। দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রধানত স্মৃতিশক্তি (Rote Learning) এবং ৩ ঘণ্টার পরীক্ষা-নির্ভর সনাতন পদ্ধতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। তবে বর্তমান সময়ে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে এবং ২১ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ তার মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে দক্ষতাভিত্তিক (Skill-based) ধারায় রূপান্তরের একটি ট্রানজিশন বা রূপান্তরকালীন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের মূল্যায়ন ব্যবস্থা বর্তমানে ঠিক কোন পথে এগোচ্ছে এবং এর বাস্তবচিত্র কেমন, তা কয়েকটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হলো:
সরকার ও শিক্ষানীতি প্রণেতারা উপলব্ধি করেছেন যে, জিপিএ-৫ কেন্দ্রিক মুখস্থ নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত করতে পারছে না। ফলে সাম্প্রতিক শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের মাধ্যমে মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে দক্ষতার দিকে মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করা হয়েছে:
ধারাবাহিক মূল্যায়ন (Continuous Assessment): শুধু চূড়ান্ত পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে ক্লাসের প্রজেক্ট, দলগত কাজ, প্রেজেন্টেশন এবং আচরণগত মূল্যায়নে জোর দেওয়া হচ্ছে।
প্রয়োগ ও দক্ষতা যাচাই: মুখস্থ প্রশ্নের জায়গায় বাস্তব জীবনের নানা সমস্যা সমাধান (Problem Solving) এবং সৃজনশীল কাজকে মূল্যায়নের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
নম্বরের চেয়ে ফিডব্যাক: কেবল সংখ্যার নম্বর না দিয়ে শিক্ষার্থী কোন দক্ষতায় কোন পর্যায়ে আছে (যেমন: প্রাথমিক, মধ্যম বা পারদর্শী) তা মূল্যায়নের চেষ্টা চলছে।
কাগজে-কলমে রূপান্তরের কাজ শুরু হলেও মাঠপর্যায়ে বা শ্রেণিকক্ষে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল্যায়ন ব্যবস্থা এখনো মুখস্থবিদ্যা ও পুরনো কাঠামোর টানাপোড়েনে আটকে আছে:
পরীক্ষা ও জিপিএ-র সামাজিক চাপ: সমাজ, অভিভাবক এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো নম্বর ও জিপিএ-কে সাফল্যের মাপকাঠি মনে করে। ফলে দক্ষতা অর্জনের চেয়ে যেকোনো উপায়ে বেশি নম্বর পাওয়ার প্রবণতাই মুখ্য থেকে যাচ্ছে।
কোচিং ও গাইড বইয়ের আধিপত্য: দক্ষতা যাচাইয়ের প্রশ্ন তৈরির সঠিক কাঠামোর অভাবে গাইড বই বা কোচিং সেন্টারগুলো নতুন পদ্ধতির প্রশ্নকেও এক ধরনের "বাঁধানো ছকে" ফেলে মুখস্থ করিয়ে দিচ্ছে।
উচ্চশিক্ষা ও চাকরির বাজারে বৈপরীত্য: স্কুলের মূল্যায়নে দক্ষতার ওপর জোর দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা ও সরকারি-বেসরকারি চাকরির পরীক্ষাগুলো এখনো তথাকথিত তথ্যভিত্তিক বা মুখস্থনির্ভর এমসিকিউ (MCQ) এবং লিখিত পরীক্ষার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের মূল্যায়ন ব্যবস্থা পুরোপুরি দক্ষতাভিত্তিক হতে না পারার পেছনে কিছু মৌলিক অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
১. শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি: একজন শিক্ষক নিজে ঐতিহ্যগত মুখস্থ পদ্ধতিতে পড়ে এসেছেন। পর্যাপ্ত ও কার্যকর প্রশিক্ষণ ছাড়া তাঁর পক্ষে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর 'দক্ষতা' নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা বেশ কঠিন।
২. শ্রেণিকক্ষের ব্যাপ্তি ও শিক্ষার্থী অনুপাত: একটি ক্লাসে ৬০-৮০ জন বা তার বেশি শিক্ষার্থী থাকলে শিক্ষকের পক্ষে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দক্ষতা, প্রজেক্ট বা দলগত কাজ গভীরভাবে মনিটর করে মূল্যায়ন করা প্রায় অসম্ভব।
৩. মূল্যায়নের নিরপেক্ষতা ও স্বজনপ্রীতি: ধারাবাহিক বা অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে অনেক সময় স্বজনপ্রীতি বা অনৈতিক প্রভাবের ঝুঁকি থাকে, যা সার্বজনীন মূল্যায়নের বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়ে দেয়।
বাংলাদেশকে যদি মেধাভিত্তিক ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হয়, তবে মূল্যায়নে চরম একমুখী অবস্থান (পুরো মুখস্থ বা পুরো পরীক্ষা তুলে দেওয়া) না নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ (Balanced Approach) অনুসরণ করতে হবে:
জ্ঞান ও দক্ষতার সমন্বয়: মৌলিক তথ্য বা জ্ঞান জানা থাকা প্রয়োজন (যা মুখস্থ না হলেও মনে রাখা জরুরি), তবে সেই জ্ঞান দিয়ে শিক্ষার্থী নতুন কিছু তৈরি করতে পারছে কিনা—মূল্যায়ন হতে হবে তার ওপর।
পর্যায়ক্রমিক সংস্কার: হঠাৎ করে পুরো ব্যবস্থা বদলে না ফেলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করে ধাপে ধাপে বাস্তবসম্মত মডেল দাঁড় করানো।
উচ্চশিক্ষার সাথে সামঞ্জস্য: মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের মূল্যায়ন পদ্ধতির সাথে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি এবং কর্মক্ষেত্রের প্রবেশদ্বারের মূল্যায়নের মিল রাখা।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, বাংলাদেশের মূল্যায়ন ব্যবস্থা বর্তমানে মুখস্থবিদ্যা থেকে দক্ষতার দিকে যাওয়ার একটি পরিবর্তনশীল বা সন্ধিক্ষণে (In Transition) রয়েছে। দিকটি সঠিক হলেও বাস্তবায়নের গতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক মানসিকতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে এখনো অনেক পথ বাকি। কেবল নীতি পরিবর্তন নয়—শিক্ষক প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং সামাজিক সচেতনতা নিশ্চিত করা গেলেই মূল্যায়ন ব্যবস্থা সফলভাবে "দক্ষতার পথ" গ্রহণ করতে পারবে।
১৪
২১ মন্তব্য