সহকারী শিক্ষক
০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:১০ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
নম্বরের পেছনে ছোটার এই তীব্র ইঁদুরদৌড়ে আমরা যে প্রকৃত শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি—তা বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম নির্মম বাস্তবতা। নম্বর বা জিপিএ মূলত ছিল শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞান প্রকাশের একটি মাধ্যম, কিন্তু বর্তমানে সেই মাধ্যমটাই হয়ে উঠেছে শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য।
নম্বরের এই অন্ধ প্রতিযোগিতা আমাদের শিখন প্রক্রিয়াকে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তা নিচের দিকগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়:
নম্বরকেন্দ্রিক ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীরা বইয়ের বিষয়বস্তু বুঝে আয়ত্ত করার চেয়ে পাস করার কৌশল (Exam Skills) শিখতে বেশি সময় ব্যয় করে।
সিলেবাসের কোন অংশ থেকে বেশি প্রশ্ন আসে, কোন প্রশ্ন মুখস্থ করলে বেশি নম্বর পাওয়া যাবে—পড়াশোনা এখন এই হিসাব-নিকাশে সীমাবদ্ধ।
আনন্দের জন্য বা কৌতূহল মেটাতে পড়া এখন আর দেখা যায় না; যা পরীক্ষায় আসবে না, তা শেখার কোনো আগ্রহ শিক্ষার্থীদের মাঝে তৈরি হয় না।
নম্বর পাওয়ার সবচেয়ে সহজ ও প্রচলিত পথ হলো গাইড বই বা সাজেশনের উত্তর হুবহু মুখস্থ করে খাতায় লিখে আসা।
শিক্ষার্থী বিষয়টি বাস্তবে কতটুকু বুঝল বা প্রয়োগ করতে পারছে, তা গৌণ হয়ে দাঁড়ায়।
ফলে জিপিএ-৫ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থীও বাস্তব জীবনে বা পরবর্তী উচ্চশিক্ষায় সাধারণ সাধারণ সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে হিমশিম খায়।
শিক্ষার্থীর নিজস্ব কোনো মতামত বা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি যখন পরীক্ষার খাতায় "নমুনা উত্তরের" সাথে মেলে না, তখন অনেক সময় নম্বর কমে যাওয়ার ভয় থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি না নিয়ে ধরাবাঁধা ছকে চিন্তা করতে শেখে। এতে তাদের সৃজনশীলতা এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
নম্বরকে যখন সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি করা হয়, তখন কম নম্বর পাওয়া মানেই শিক্ষার্থীকে সমাজ ও পরিবারের চোখে "ব্যর্থ" হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এটি শিক্ষার্থীদের মনে চরম হতাশা, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি করে।
পড়াশোনাকে আনন্দদায়ক ভ্রমণের বদলে একটি ভীতিকর অভিজ্ঞতা মনে হতে থাকে।
একটি ভালো ফল বা উচ্চ নম্বর কখনো একজন মানুষের মূল্যবোধ, সততা, সহানুভূতি, দলগত কাজের মানসিকতা কিংবা নেতৃত্বের গুণাবলী প্রকাশ করতে পারে না। নম্বরকেন্দ্রিক শিক্ষায় আমরা হয়তো ভালো নম্বরধারী সনদপত্র তৈরি করছি, কিন্তু একজন সুনাগরিক বা দক্ষ মানবিক সত্তা গঠনে ব্যর্থ হচ্ছি।
নম্বরের এই দাসত্ব থেকে বের হয়ে এসে শেখার আসল আনন্দ ফিরিয়ে আনতে আমাদের কিছু মৌলিক পরিবর্তন দরকার:
মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন: লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি প্রজেক্ট, উপস্থাপনা, দলগত কাজ এবং বাস্তবভিত্তিক প্রয়োগকে মূল্যায়নের মূল ভিত্তি করা।
অভিভাবক ও সমাজের মানসিকতা: সন্তানকে জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় না নামিয়ে সে আজ নতুন কী শিখল এবং তার আগ্রহের জায়গা কোনটি—সেদিকে লক্ষ্য রাখা।
ফিডব্যাক কালচার চালু করা: শিক্ষার্থীকে শুধু একটি 'সংখ্যা' বা 'গ্রেড' না দিয়ে, তার কোথায় উন্নতি দরকার তা শিক্ষক কর্তৃক বুঝিয়ে দেওয়া।
নম্বর কেবল একটি সাময়িক সনদ দিতে পারে, কিন্তু প্রকৃত শিখন ও দক্ষতা জীবনভর সাথে থাকে। নম্বরের পেছনে দৌড়ানো বন্ধ করে যেদিন আমরা জানার আগ্রহ ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দেব, সেদিনই শিক্ষাব্যবস্থা তার আসল সার্থকতা খুঁজে পাবে।
১৪
২১ মন্তব্য