সহকারী অধ্যাপক
০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:৪০ পূর্বাহ্ণ
মেহমানের সম্মান—ঈমানের পরিচয় - মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
মেহমানের সম্মান—ঈমানের পরিচয়
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
আল্লাহ ও পরকালে যার অটুট বিশ্বাস,
মেহমানের সম্মানে তার ফুটে ভালোবাস।
রাসুলের বাণী শোনো—হৃদয়ে রেখো তাই,
মেহমান এলে সম্মান দাও, অবহেলা যেন নাই।
“যে আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে,
সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।”
বুখারীর বাণী—শিক্ষা অতি মহান,
মেহমানের সেবায় ফুটে ঈমানেরই প্রাণ।
মেহমান যখন আসে ঘরে,
খুশি জাগে অন্তরে,
হাসিমুখে বলি তাকে—
“এসো, বসো আপন করে।”
নেই যদি ঘরে দামী খাবার,
নেই যদি বাহারি আয়োজন,
সাধ্য যতটুকু, দিই ততটুকু—
তাতেই থাকুক আন্তরিক মন।
ধন-সম্পদে বড় নয় মানুষ,
বড় হয় তার ব্যবহার;
সুন্দর কথা, মধুর হাসি
জয় করে মানুষের অন্তর।
মেহমান কোনো বোঝা নয়,
সে তো সম্মানেরই জন;
তার আগমনে ঘরে নামে
ভালোবাসার শুভক্ষণ।
কেউ আসে দূর পথ পেরিয়ে,
ক্লান্ত দেহ আর শ্রান্ত প্রাণে,
একটু স্নেহ, একটু হাসি
চায় সে আপনজনের টানে।
তাকে বসাও সম্মানের স্থানে,
দাও পানীয়, দাও আহার;
কথায় কথায় দিও না কষ্ট,
রাখো না তার মনে ভার।
মেহমান যদি দরিদ্র হয়,
তবু সে সম্মানের যোগ্য;
ধনী হলে বেশি আদর—
এ আচরণ নয় সঙ্গত।
ইসলামের শিক্ষা সবার জন্য,
ধনী-গরিবে ভেদ নয়;
মেহমানের মর্যাদা রক্ষা
মুমিন হৃদয়ের পরিচয়।
আত্মীয় হলে আপন করে,
অপর হলে দূরে নয়;
আল্লাহর বান্দা—এই পরিচয়েই
তার সম্মান কমে না কভু।
মেহমান এলে ব্যস্ত হয়ে
কপালে দিও না ভাঁজ;
“কেন এলে?”—এমন কথা
করো না কখনো আজ।
হয়তো তার হৃদয় ভাঙা,
হয়তো তার জীবন ক্লান্ত;
তোমার একটি মধুর কথায়
হতে পারে সে শান্ত।
একটি হাসি, একটি সালাম,
একটি আন্তরিক সম্ভাষণ,
কখনো কখনো মানুষের মনে
জাগায় নতুন আশার কিরণ।
মেহমানের সামনে বসে
করো না নিজের বড়াই;
অতিরিক্ত ব্যয়ের গর্ব দেখিয়ে
ভালোবাসা পাওয়া যায় নাই।
সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে
ঋণ করে দিও না ভোজ;
ইসলাম চায় মধ্যপন্থা,
অপচয় নয় কোনো রোজ।
যতটুকু আছে, ততটুকু দাও,
মনটা রাখো উদার;
অল্প খাবার ভালোবাসায়
হয় অনেক উপহার।
ইবরাহিম (আ.)-এর ঘরে এসেছিল
অতিথি একদল মহান;
তিনি তাদের আপ্যায়নে
দেখিয়েছেন উত্তম দৃষ্টান্ত।
অতিথির আগমনে তিনি
করেননি কোনো বিরক্তি প্রকাশ,
বরং দ্রুত আহারের ব্যবস্থা—
এটাই আতিথেয়তার সুবাস।
মেহমানের প্রতি সম্মান
নবীজির সুন্নাহর শিক্ষা;
এ শিক্ষাতে পরিবার গড়ে,
মুছে যায় হৃদয়ের দীক্ষাহীনতা।
মেহমান এলে সালাম দাও,
ভালো কথা বলো হেসে;
তার প্রয়োজন বুঝে নিয়ে
দাঁড়াও পাশে ভালোবেসে।
তার বিশ্রামের প্রয়োজন হলে
দাও তাকে বিশ্রামের স্থান;
তার নিরাপত্তা, স্বস্তি, মর্যাদা—
রাখো সদা নিজের জ্ঞান।
মেহমানের গোপন কথা
অন্যের কাছে বলো না;
তার দুর্বলতা নিয়ে পরে
হাসাহাসি কোরো না।
কেউ যদি ভুল করে বসে,
ক্ষমার চোখে তাকাও তারে;
মানুষ মাত্রই ভুল করে—
রহমত রাখো ব্যবহারে।
মেহমানের সন্তান এলে ঘরে,
স্নেহে তাদের কাছে টানো;
শিশুরাও যেন মনে করে—
“এই ঘরটিও আপন জানো।”
মেহমান বিদায় নিলে শেষে
দাও আন্তরিক দোয়া;
“আবার এসো”—এই কথাটি
হোক ভালোবাসায় ছোঁয়া।
মেহমান চলে গেলে যেন
থাকে তার ভালো স্মৃতি;
তোমার ঘরের সুন্দর আচরণ
হোক তার হৃদয়ের গীতি।
হে মুমিন, মনে রেখো তুমি—
দুনিয়া ক্ষণিকের ঘর;
আজ যে অতিথি তোমার ঘরে,
কাল তুমি তারই অতিথি পর।
আজ তুমি যদি কাউকে দাও
সম্মান, সেবা, ভালোবাসা,
আল্লাহ চাইলে কাল তোমারও
জুটবে অনুগ্রহের আশা।
জীবন যেন শুধু নিজের
সুখের পেছনে না ছুটে;
অন্যের সুখে হাসতে শেখো,
মানবতা যেন ওঠে ফুটে।
মেহমানের সেবা মানে
শুধু খাবার দেওয়া নয়;
তার হৃদয়ের মূল্য বোঝা,
তার সম্মান ক্ষুণ্ন না হয়।
কথার মাঝে নম্রতা রাখো,
চোখে রাখো মমতার আলো;
আতিথেয়তার সৌন্দর্য তখন
হয়ে উঠবে সত্যিই ভালো।
ঘরের শিশু দেখুক তোমায়,
কীভাবে অতিথি মান;
আজকের সেই শিক্ষা পেয়ে
গড়বে আগামী দিনের প্রাণ।
পিতা-মাতা শেখান সন্তানকে—
“মেহমান এলে হাসবে;
নিজে একটু কম নিয়ে হলেও
অতিথিকে আগে দেবে।”
এই শিক্ষাতে পরিবারে
জন্ম নেয় উদার মন;
ভালোবাসায় পূর্ণ হয়ে
সুন্দর হয় প্রতিটি ক্ষণ।
প্রতিবেশী যদি আসে কাছে,
তাকেও দিও মর্যাদা;
আত্মীয়, বন্ধু, পথিক—সবার
প্রাপ্য হোক সৌজন্য-সেবা।
দরজায় এসে দাঁড়ালে কেউ,
ফিরিয়ে দিও না তুচ্ছ করে;
সম্ভব হলে সাধ্যমতো
সহায় হও ভালো করে।
তবে যদি তোমার ঘরে
না থাকে কোনো আয়োজন,
লজ্জা পেও না, সত্য বলো—
সরলতাই সুন্দর গুণ।
ইসলাম চায় না লোকদেখানো
অতিরিক্ত আয়োজন;
ইসলাম চায় বিশুদ্ধ নিয়ত,
সততা আর সুন্দর মন।
মেহমানকে খুশি করতে গিয়ে
করো না হারাম কোনো কাজ;
আল্লাহর বিধান অমান্য করে
নয় আতিথেয়তার সাজ।
হালাল পথে উপার্জন করে
হালাল খাদ্য দাও;
আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায়
মেহমানকে আপন ঠাও।
নিয়ত যদি হয় আল্লাহর জন্য,
সেবা যদি হয় তাঁর তরে,
সাধারণ কাজও ইবাদত হয়—
নিষ্ঠা থাকলে অন্তরে।
মেহমানের সম্মান তাই
সুন্নাহরই এক দিশা;
এতে আছে হৃদয় জয়ের
অমূল্য এক শিক্ষা।
অহংকারের প্রাসাদ ভেঙে
নম্রতার ঘর গড়ো;
মানুষকে মানুষ হিসেবে
ভালোবাসতে শেখো।
মুখের ভাষা কোমল করো,
রূঢ়তা সব ছাড়ো;
অতিথির হৃদয় ভাঙে—
এমন কথা কভু না বলো।
কারও পোশাক, কারও ভাষা,
কারও অবস্থান দেখে
সম্মান যেন কমে না যায়—
এ শিক্ষা রাখো বুকে।
আল্লাহ দেখেন অন্তর তোমার,
দেখেন কাজের মান;
লোক দেখানো সম্মান নয়,
চাই আন্তরিক সম্মান।
আজ যে অতিথি দরজায় তোমার,
সে হয়তো এক পরীক্ষা;
তুমি কেমন আচরণ করো—
তাতেই ফুটে ঈমানের রেখা।
পরকালের সেই মহাদিনে
সব হিসাব হবে শেষ;
ধন-দৌলত থাকবে পড়ে,
সঙ্গী হবে কর্মবিশেষ।
তাই মেহমান এলে ঘরে
করো না বিরক্তি প্রকাশ;
হয়তো এই সেবার বদৌলতে
আল্লাহ দেবেন নাজাতের আশ্বাস।
ঈমান শুধু মুখের কথা নয়,
ঈমান কর্মে ফুটে;
মেহমানের সম্মান দিলে
সেই সত্য হৃদয়ে উঠে।
আল্লাহ ও আখিরাতের
যার রয়েছে বিশ্বাস,
তার ব্যবহারে ফুটে উঠুক
সুন্নাহর মধুর সুবাস।
ঘরে ঘরে এমন আদব হোক,
হাসুক প্রতিটি প্রাণ;
মেহমান পেয়ে আনন্দিত হোক
বাংলার প্রতিটি ঘর-আঙিনায়।
আতিথেয়তার এই সংস্কৃতি
হোক আমাদের পরিচয়;
সৌজন্য, মায়া, মানবপ্রেমে
দূর হোক সব ক্ষয়।
পরিবারে শান্তি, সমাজে মায়া,
মানুষে মানুষে টান;
মেহমানের সম্মান রক্ষা
হোক মুমিনের সম্মান।
হে আল্লাহ, দাও আমাদের
সুন্দর চরিত্রের দান;
মেহমানকে সম্মান করার
দাও তাওফিক, দাও ঈমান।
দাও আমাদের উদার হৃদয়,
দাও নম্র ব্যবহার;
তোমার সন্তুষ্টির আশায় যেন
সেবা করি বারবার।
মুখে থাকুক মধুর বাণী,
হৃদয়ে থাকুক নূর;
মেহমানের প্রতি ভালোবাসায়
হোক অন্তর ভরপুর।
যে ঘরে অতিথি সম্মান পায়,
সে ঘরে বরকত নামুক;
সুন্নাহর আলো, ঈমানের জ্যোতি
প্রতিটি প্রাণে জাগুক।
আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস
হোক জীবনের মূল;
মেহমানের সম্মান-যত্নে
ফুটুক ঈমানের ফুল।
মেহমান এলে হাসিমুখে বলি—
“এসো, আপন করে নিই”;
সুন্নাহর পথে ভালোবাসা
জীবনভরে ছড়িয়ে দিই।
মেহমানের সম্মান হোক
ঈমানেরই পরিচয়;
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে
এই হোক আমাদের মহৎ প্রয়াসময়।
১
১ মন্তব্য