Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৮:১৯ পূর্বাহ্ণ

মা ছেলে জিপিএ ৫......

ছেলের সঙ্গে পরীক্ষা দিয়েছেন মা। দুজনেই একসাথে প্রস্তুতি নিয়েছেন। ছেলে পড়েছে এবং মা-ও পড়েছেন। সংসারের দায়িত্ব সামলে বই-খাতা নিয়ে রাত জেগেছেন। অবশেষে ফল ঘোষণার দিন এল। মা পেয়েছেন জিপিএ-৫। ছেলে পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫।  


সোমবার (১০ আগস্ট) বিকেলে রাজশাহী নগরের রাজপাড়া থানার বসিলা এলাকায় তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ফল প্রকাশের পর স্বজন ও পরিচিতজনেরা তাদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন।  


পরিবারের একজন সদস্য জানান, সাদিয়া বেগমের স্বামী তোফাজ্জল হোসেন সরকারি কর্মকর্ত। সংসার, সন্তান লালন-পালনসহ নানা দায়িত্বের মধ্যেও সাদিয়া তার পড়াশোনার স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দেননি। একসময় বিয়ের পর থেমে যাওয়া পড়াশোনাটি দীর্ঘ বিরতির পর আবার শুরু করেন। বয়সের পার্থক্য তাকে থামতে দেয়নি। সংসারের ব্যস্ততাও পারেনি। ছেলের পড়াশোনার খবর নেওয়ার পাশাপাশি নিজের বইও খুলেছেন। যখন ছেলে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তিনিও তার প্রস্তুতি নিয়েছেন। একই বছরে একই পরীক্ষায় বসেছেন মা ও ছেলে।  


১৯ বছর আগে বিয়ের পর সাদিয়া বেগমের পড়াশোনা থেমে গিয়েছিল। সংসার ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে বই-খাতা ছেড়ে দিতে হয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পড়াশোনার বাইরে ছিলেন তিনি। তবে পড়াশোনার প্রতি তার আকর্ষণ রয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আবার বই হাতে নেন সাদিয়া। তিনি নতুন করে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। সংসার সামলান। সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ রাখেন এবং নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে যান। প্রায় দুই বছর আগে তিনি একটি বড় সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ছেলের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা দেবেন। পরিবারের সম্মতিতে শুরু হয় প্রস্তুতি। সংসারের কাজের ফাঁকে পড়াশোনা করেছেন। সন্তানের পড়াশোনার দেখভালের পাশাপাশি নিজের পড়াশোনার জন্যও সময় বের করেছেন।  


চলতি বছরের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সাদিয়া বেগম তার পরিশ্রমের ফল পেয়েছেন। তিনি জিপিএ-৫ পেয়েছেন। রাজপাড়া আদর্শ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। একই সময়ে তার ছেলে তানভীর আহমেদও এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষায় অংশ নেয় সে। তানভীর পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫। মানে একই বছরে একই সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে মা ও ছেলে দুজনেই পেয়েছেন জিপিএ-৫।  


নিজের সাফল্যের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সাদিয়া বেগম বলেন, ‘পড়াশোনার প্রতি আকর্ষণ ছিল। কিন্তু বিয়ের পর নানা কারণে লেখাপড়া করতে পারিনি। তবে আমি হাল ছাড়িনি।’  


তিনি বলেন, ‘বছর দুয়েক আগে সিদ্ধান্ত নিলাম; ছেলের সঙ্গে পরীক্ষা দেব। পরিবারের সম্মতিতে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সেই সিদ্ধান্ত থেকেই চলতি বছর ছেলে আর আমি এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিই।’  


নিজের সাফল্যের পাশাপাশি ছেলের ফলাফল নিয়ে সাদিয়া বললেন, ‘সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে, সংসার সামলিয়ে ও দুই ছেলের পড়ালেখার খোঁজ নেয়ার পাশাপাশি নিজে পড়াশোনা করে জিপিএ-৫ পেয়েছি। সঙ্গে ছেলের গোল্ডেন জিপিএ-৫। মা-ছেলের এই সাফল্যে আমার পুরো পরিবার আনন্দিত।’  


মায়ের সঙ্গে একই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তানভীর আহমেদের কাছে বিষয়টি ছিল ভিন্ন অভিজ্ঞতা। তানভীর বলেন, “মায়ের সঙ্গে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুজনই জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছি। মায়ের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার সৌভাগ্য কজনের হয়? আমি সেই সৌভাগ্যবান।”  


মায়ের পড়াশোনা এবং নিজের পড়াশোনার কথা তুলে ধরে তানভীর বললেন, “মা সার্বক্ষণিক আমার পড়ালেখার খোঁজখবর রাখতেন। সঙ্গে নিজেও পড়তেন। রাত জেগে আমার পাশে বসে থাকতেন। আমি পড়ালেখা করতাম।”  


নিজের এই সাফল্য বাবা-মাকে উৎসর্গ করে তানভীর বলেন, “আমার এই কৃতিত্ব আমার বাবা-মাকে উৎসর্গ করছি। বড় হয়ে আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। এজন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই।”  


মা-ছেলের এই সাফল্যে আনন্দিত তাদের গৃহশিক্ষক আরিফুল ইসলাম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাছ থেকে তাদের পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গৃহশিক্ষক বলেন, “আমি চার বছর ধরে তানভীরকে ইংরেজি পড়াই। সঙ্গে তার মাকেও সহযোগিতা করি। দুজনের এমন সাফল্যে আমি অনেক খুশি। এমন ঘটনার সাক্ষী হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি।”

মন্তব্য করুন