সহকারী অধ্যাপক
০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৫:১৩ পূর্বাহ্ণ
মানবসেবা ও সহমর্মিতা : ইসলামের মহান শিক্ষা মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
মানবসেবা ও সহমর্মিতা : ইসলামের মহান শিক্ষা
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
মানুষ সামাজিক জীব। একে অপরের সহযোগিতা, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সেবার মাধ্যমে সমাজ সুন্দর ও শান্তিময় হয়ে ওঠে। পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই, যার জীবনে কখনো দুঃখ, কষ্ট, অসুস্থতা, অভাব বা বিপদ আসে না। আজ যে ব্যক্তি অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন অনুভব করছে, আগামীকাল হয়তো তারই সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। তাই মানুষের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থের সেবা করা, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, অসহায়কে সহযোগিতা করা এবং বিপদগ্রস্তের প্রতি সহানুভূতি দেখানো মানবিকতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচয়।
ইসলাম শুধু ইবাদতের ধর্ম নয়; ইসলাম মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ, ন্যায়, দয়া, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতারও পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। কুরআন ও সুন্নাহ মানুষের কল্যাণে কাজ করতে এবং অন্যের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করতে উৎসাহিত করেছে। একজন প্রকৃত মুমিন নিজের কল্যাণের পাশাপাশি অন্যের কল্যাণ নিয়েও চিন্তা করে। সে মানুষের কষ্টে আনন্দিত হয় না; বরং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ায় এবং তার জন্য কল্যাণের দোয়া করে।
মানবসেবার ইসলামী গুরুত্ব
মানবসেবা হলো মানুষের কল্যাণে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করা। অর্থ দিয়ে সাহায্য করা যেমন মানবসেবা, তেমনি অসুস্থের সেবা করা, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, অসহায়কে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা, বিপদগ্রস্তকে সাহস দেওয়া, দুঃখী মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়া এবং পথহারা মানুষকে সঠিক পথ দেখানোও মানবসেবার অন্তর্ভুক্ত।
ইসলাম মানুষের প্রতি দয়া ও সহানুভূতিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের কল্যাণকর কাজে উৎসাহিত করেছেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে মানুষের সেবা করেছেন এবং সাহাবায়ে কিরামকে মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসতে শিক্ষা দিয়েছেন।
তাই মানবসেবা কোনো সাধারণ সামাজিক কাজমাত্র নয়; একজন মুসলিমের জন্য এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে—যদি তা সঠিক নিয়ত ও শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে করা হয়।
রোগীর সেবা করা
অসুস্থতা মানুষের জীবনের একটি কঠিন সময়। রোগী তখন শারীরিক দুর্বলতার পাশাপাশি মানসিকভাবেও ভেঙে পড়তে পারে। সে সময় তার পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সহযোগিতা করা, ওষুধ এনে দেওয়া, তার প্রয়োজনের কথা শোনা এবং তাকে সাহস দেওয়া অত্যন্ত মহৎ কাজ।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“রোগীর সেবা করো এবং ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও।”
—সহিহ বুখারি
এই হাদিসে অসুস্থ মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা রয়েছে। একজন রোগীর পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা নয়; বরং তার প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি ও আন্তরিকতা প্রকাশ করাও এর অন্তর্ভুক্ত।
কোনো রোগীকে অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে পরিবারের অসুস্থ সদস্য, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিত কেউ অসুস্থ হলে তার খোঁজ নেওয়া উচিত। সম্ভব হলে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ে সহযোগিতা করা উচিত। সামর্থ্য না থাকলে অন্তত তার পাশে বসে সান্ত্বনা দেওয়া এবং তার জন্য দোয়া করা উচিত।
একটি আন্তরিক কথা কখনো কখনো রোগীর মনে যে সাহস সৃষ্টি করতে পারে, তা অনেক বড় সাহায্যের সমতুল্য হতে পারে।
ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া
ক্ষুধা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে খাবারের চেয়ে মূল্যবান বস্তু খুব কমই আছে। তাই ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া মানবতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশ।
ইসলাম ক্ষুধার্ত মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শিক্ষা দিয়েছে। আমাদের সমাজে অনেক মানুষ অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, দুর্যোগ কিংবা বিভিন্ন সমস্যার কারণে পর্যাপ্ত খাবার পায় না। এমন মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।
আমরা যদি সামর্থ্যবান হই, তাহলে নিজের খাবার থেকে অংশ দিয়ে ক্ষুধার্তকে খাওয়াতে পারি। মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা, হাসপাতাল কিংবা দরিদ্র মানুষের এলাকায় খাবার বিতরণ করতে পারি। তবে সাহায্য করার সময় মানুষের সম্মান ও মর্যাদার প্রতি অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।
দান করে কাউকে অপমান করা ইসলামসম্মত আচরণ নয়। বরং সম্মানের সঙ্গে সাহায্য করাই উত্তম।
সৃষ্টির প্রতি দয়া ও সহানুভূতি
ইসলামের অন্যতম সুন্দর শিক্ষা হলো—সৃষ্টির প্রতি দয়া করা। মানুষের প্রতি যেমন দয়া করতে হবে, তেমনি আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্টির প্রতিও অকারণে নিষ্ঠুর হওয়া যাবে না।
দয়া মানুষের হৃদয়কে কোমল করে। আর নিষ্ঠুরতা মানুষের হৃদয়কে কঠিন করে তোলে। যে ব্যক্তি দুর্বল মানুষের প্রতি দয়া করে, অসহায়কে সাহায্য করে এবং জীবজন্তুর প্রতিও অকারণে কষ্ট দেয় না, তার চরিত্রে মানবিকতার সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।
তাই পথের অসহায় মানুষকে অবহেলা না করা, প্রাণীর প্রতি অযথা নির্যাতন না করা, পরিবেশের ক্ষতি না করা এবং সমাজের দুর্বল মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া ইসলামী মূল্যবোধের অংশ।
বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো
মানুষের জীবনে বিপদ হঠাৎ এসে উপস্থিত হতে পারে। দুর্ঘটনা, অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আর্থিক সংকট, পারিবারিক সমস্যা কিংবা অন্য কোনো কারণে মানুষ অসহায় হয়ে পড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে তাকে একা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তার পাশে দাঁড়ানো উচিত।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“আল্লাহ ততক্ষণ বান্দার সাহায্য করেন, যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্য করে।”
—সহিহ মুসলিম
এই হাদিস আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। মানুষ যখন অন্য মানুষের বিপদে এগিয়ে আসে, তখন সে আল্লাহর সাহায্য ও সন্তুষ্টির প্রত্যাশী হয়।
তাই কারও বিপদ দেখলে শুধু দর্শকের ভূমিকা পালন না করে সম্ভব হলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। অর্থ দিয়ে পারলে অর্থ দিয়ে, শ্রম দিয়ে পারলে শ্রম দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে পারলে পরামর্শ দিয়ে এবং অন্তত সান্ত্বনা ও দোয়ার মাধ্যমে হলেও পাশে দাঁড়াতে হবে।
অন্যের প্রয়োজন পূরণের মহৎ শিক্ষা
মানুষের জীবনে নানা ধরনের প্রয়োজন দেখা দেয়। কারও চিকিৎসার প্রয়োজন, কারও খাদ্যের প্রয়োজন, কারও শিক্ষার প্রয়োজন, আবার কারও সাময়িক আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে।
ইসলাম মানুষের প্রয়োজন পূরণে উৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে সহযোগিতা করে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণে সাহায্য করেন।
এ শিক্ষা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি করে। যদি সমাজের সামর্থ্যবান মানুষগুলো অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে সমাজে দারিদ্র্য ও কষ্ট অনেকটাই কমে আসতে পারে।
অন্যের বিপদে আনন্দ প্রকাশ করা নিষিদ্ধ
মানুষের একটি নিন্দনীয় প্রবণতা হলো—অন্যের ব্যর্থতা বা বিপদ দেখে আনন্দ পাওয়া। কেউ আমাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার না করলেও তার বিপদে আনন্দ প্রকাশ করা একজন মুমিনের চরিত্র হতে পারে না।
রাসুলুল্লাহ ﷺ শিক্ষা দিয়েছেন—
“তোমার ভাইয়ের বিপদে আনন্দ প্রকাশ করো না।”
—তিরমিযী
এই শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আজ যে মানুষটি বিপদে পড়েছে, আগামীকাল আমরা নিজেরাও একই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারি। মানুষের দুর্বলতা নিয়ে উপহাস করা, তার বিপদে হাসাহাসি করা কিংবা সামাজিকভাবে তাকে অপমান করা নৈতিকভাবে অত্যন্ত নিন্দনীয়।
বরং কেউ বিপদে পড়লে তার জন্য দোয়া করা উচিত—
“আল্লাহ তার বিপদ দূর করুন, তাকে কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরও এমন বিপদ থেকে রক্ষা করুন।”
এটাই একজন মুমিনের সুন্দর মানসিকতা।
ঈর্ষা নয়, কল্যাণ কামনা
অন্যের সুখ ও সাফল্য দেখে ঈর্ষান্বিত হওয়া মানুষের অন্তরের একটি মারাত্মক ব্যাধি। কেউ ভালো ফলাফল করলে, ভালো চাকরি পেলে, ব্যবসায় সফল হলে, সম্পদ অর্জন করলে কিংবা সম্মান লাভ করলে তার প্রতি হিংসা না করে তার জন্য কল্যাণ কামনা করা উচিত।
অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হতে শেখা একটি উন্নত চরিত্রের পরিচয়। কারণ রিজিক, সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আসে। আল্লাহ যাকে যা দিয়েছেন, তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং অন্যের জন্য কল্যাণ কামনা করা মুমিনের সুন্দর গুণ।
একজন সত্যিকারের মুমিন মনে করে—অন্যের কল্যাণে আমার ক্ষতি নেই। বরং সমাজের একজন মানুষের উন্নতি পুরো সমাজের জন্যই কল্যাণকর হতে পারে।
প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব
মানবসেবার প্রথম ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো প্রতিবেশী। একজন মানুষের আশপাশে যারা বসবাস করে, তাদের প্রতি তার দায়িত্ব রয়েছে।
প্রতিবেশী অসুস্থ হলে তার খোঁজ নেওয়া, বিপদে পড়লে সাহায্য করা, অভাবগ্রস্ত হলে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা এবং তার কষ্টের কারণ না হওয়া ইসলামী আদর্শের অংশ।
নিজে ভালো খাবার খেয়ে পাশের ঘরের মানুষটি না খেয়ে আছে কি না—এ ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন থাকা একজন মুমিনের আদর্শ আচরণ নয়। সমাজে পারস্পরিক খোঁজখবর ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে মানুষের মধ্যে ভালোবাসা বাড়ে এবং সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী হয়।
অসহায়, এতিম ও দরিদ্রের প্রতি দায়িত্ব
সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা নিজের প্রয়োজন নিজেরা পূরণ করতে পারে না। এতিম শিশু, অসহায় বৃদ্ধ, দরিদ্র পরিবার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, রোগাক্রান্ত মানুষ কিংবা বিপদগ্রস্ত পরিবার—তাদের জন্য সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের দায়িত্ব রয়েছে।
তাদের প্রতি করুণা দেখিয়ে শুধু কথা বলাই যথেষ্ট নয়; বরং বাস্তব সহযোগিতা প্রয়োজন।
কোনো এতিম শিশুকে শিক্ষার সুযোগ দেওয়া, দরিদ্র ছাত্রকে বই কিনে দেওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসায় সাহায্য করা, অসহায় বৃদ্ধের প্রয়োজন মেটানো—এসব কাজ সমাজকে মানবিক ও সুন্দর করে।
মানবসেবায় নিয়তের গুরুত্ব
ইসলামে কোনো কাজের মূল্যায়নে নিয়তের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাই মানবসেবা করার সময় মানুষের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্য না রেখে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করা উচিত।
কারও ছবি তুলে প্রচার করা, সাহায্য নিয়ে অহংকার করা কিংবা অসহায় মানুষকে অপমান করা মানবসেবার সৌন্দর্য নষ্ট করে দিতে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে—আমরা যখন কাউকে সাহায্য করি, প্রকৃত অর্থে আল্লাহ আমাদেরকে সাহায্য করার সুযোগ দিয়েছেন। তাই সাহায্য করার পর অহংকার না করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিত।
মানবসেবা ও সুন্দর সমাজ
একটি সুন্দর সমাজ কেবল বড় বড় ভবন, রাস্তা বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না। একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে মানুষের সুন্দর চরিত্র, ন্যায়বোধ, দয়া, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে।
যে সমাজে রোগীর পাশে মানুষ দাঁড়ায়, ক্ষুধার্ত মানুষ খাবার পায়, অসহায় মানুষ সহযোগিতা পায়, বিপদগ্রস্ত মানুষ একা থাকে না এবং অন্যের বিপদে কেউ আনন্দিত হয় না—সে সমাজ নিঃসন্দেহে একটি মানবিক সমাজ।
অন্যদিকে যে সমাজে মানুষ শুধু নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেখানে অর্থনৈতিক উন্নতি থাকলেও প্রকৃত শান্তি ও মানবিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
পরিবার থেকেই মানবসেবার শিক্ষা
মানবসেবার শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হওয়া উচিত। বাবা-মা যদি অসুস্থ আত্মীয়ের সেবা করেন, দরিদ্রকে সাহায্য করেন এবং অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ান, তাহলে শিশুরাও তা দেখে শেখে।
শিশুকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে—
ক্ষুধার্তকে খাবার দিতে হয়,
অসুস্থের খোঁজ নিতে হয়,
বৃদ্ধকে সম্মান করতে হয়,
দুর্বলকে সাহায্য করতে হয়,
অন্যের বিপদে হাসতে নেই,
এবং কারও কষ্টকে উপহাস করা যায় না।
এভাবে পরিবার থেকে মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা ছড়িয়ে পড়লে তা সমাজ ও রাষ্ট্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু বইয়ের জ্ঞান দেয় না; শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক গুণাবলিও গড়ে তোলে। তাই বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদরাসায় মানবসেবার শিক্ষা গুরুত্বের সঙ্গে দেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের নিয়ে দরিদ্রদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ, অসুস্থ ও অসহায় মানুষের সহযোগিতা, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, বৃক্ষরোপণ এবং সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা যেতে পারে।
এতে শিক্ষার্থীরা শুধু মানবসেবার কথা পড়বে না; বরং বাস্তব জীবনেও তা প্রয়োগ করতে শিখবে।
সামাজিক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব
মানবসেবা মানুষের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি করে। একজন মানুষ যখন অন্য মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ায়, তখন তাদের মধ্যে বিশ্বাস ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়।
সমাজে যদি মানুষ একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়, তাহলে হিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ ও সংঘাত কমে আসবে। মানুষ বুঝতে পারবে—আমরা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নই; বরং ন্যায় ও কল্যাণের পথে একে অপরের সহযোগী।
ইসলামের ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা এই সামাজিক ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করে।
মানবসেবার ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা
মানবসেবা করতে গিয়ে কিছু বিষয় মনে রাখা জরুরি।
প্রথমত, সাহায্য করতে হবে হালাল ও বৈধ উপায়ে।
দ্বিতীয়ত, সাহায্যপ্রাপ্ত মানুষকে অপমান করা যাবে না।
তৃতীয়ত, লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান করা উচিত নয়।
চতুর্থত, সাহায্যের নামে অন্যায় বা পাপের কাজে সহযোগিতা করা যাবে না।
পঞ্চমত, নিজের পরিবার ও দায়িত্বের প্রতি অবহেলা করে মানবসেবা করা উচিত নয়।
ষষ্ঠত, কারও ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা অভাবকে প্রচারের উপকরণ বানানো উচিত নয়।
সত্যিকারের মানবসেবা মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত হয়।
বর্তমান সমাজে মানবসেবার প্রয়োজনীয়তা
বর্তমান পৃথিবীতে প্রযুক্তি ও অর্থনীতির ব্যাপক উন্নতি হলেও মানুষের মধ্যে একাকিত্ব, প্রতিযোগিতা, স্বার্থপরতা ও পারস্পরিক দূরত্বও বেড়েছে। অনেক মানুষ মানুষের ভিড়ের মধ্যেও নিজেকে একা মনে করে।
এই পরিস্থিতিতে ইসলামের দয়া, সহমর্মিতা ও মানবসেবার শিক্ষা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
আমরা যদি প্রত্যেকে নিজের পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজের মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হই, তাহলে অনেক মানুষের জীবন সহজ হয়ে উঠতে পারে।
সবাইকে বড় কোনো কাজ করতে হবে—এমন নয়। একজন বৃদ্ধের রাস্তা পার হতে সাহায্য করা, একজন অসুস্থের খোঁজ নেওয়া, একজন ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, একজন দরিদ্র ছাত্রকে বই দেওয়া, একজন হতাশ মানুষকে সাহস দেওয়া—এসব ছোট কাজও মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
উপসংহার
মানবসেবা ইসলামের একটি মহৎ শিক্ষা এবং সুন্দর চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। রোগীর সেবা করা, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজনগ্রস্তের প্রয়োজন পূরণে সহযোগিতা করা, সৃষ্টির প্রতি দয়া করা এবং অন্যের বিপদে আনন্দ না করা—এসব গুণ একজন মুমিনের চরিত্রকে সুন্দর ও পরিপূর্ণ করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। আজ আমরা যদি কারও বিপদে পাশে দাঁড়াই, আগামীকাল আল্লাহ তাআলা আমাদের বিপদে সাহায্যের ব্যবস্থা করতে পারেন। তাই মানুষের প্রতি দয়া করি, সহমর্মিতা দেখাই এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সেবার হাত বাড়িয়ে দিই।
রোগীর সেবা করি, ক্ষুধার্তকে অন্ন দিই;
অসহায়ের পাশে দাঁড়াই, দুঃখীর চোখের জল মুছি।
ভাইয়ের বিপদে হাসি নয়, করি তার জন্য দোয়া;
মানুষের কল্যাণে জীবন হোক আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলা।
দয়া হোক আমাদের হৃদয়ের ভাষা,
সেবা হোক জীবনের মহান ব্রত;
মানবতার কল্যাণে নিবেদিত জীবনই
হোক মুমিনের সুন্দর পরিচয় ও মহৎ পথ।
১
১ মন্তব্য