একদিকে ভাইয়ের মরদেহ ফিরিয়ে আনতে হাজার মাইলের পথ পাড়ি—অন্যদিকে জীবিত বাবার সম্পত্তি কুক্ষিগত করার মহোৎসব!
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ছবিটি যেন আমাদের পারিবারিক ও নৈতিক মূল্যবোধের ক্রমাবনতির মুখে এক নির্মম চপেটাঘাত।
একজন অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা হাসপাতালের শয্যায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। তাঁর প্রয়োজন চিকিৎসা, সেবা, একটু মমতা, সন্তানের স্নেহময় হাত। অথচ সেই সংকটময় মুহূর্তেও কোনো সন্তানের ব্যস্ততা—বাবার চিকিৎসা নয়; জমি-জমার দলিলে বাবার স্বাক্ষর কিংবা টিপসই নেওয়া!
যে বাবা সারাজীবন সন্তানকে মানুষ করতে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই বাবার কাছে সন্তানের সবচেয়ে বড় চিন্তা হয়ে দাঁড়ায়—“দলিলে স্বাক্ষরটা করিয়ে নেওয়া গেল তো..?”
বাবা ঠিকমতো নিশ্বাস নিতে পারছেন কি না, তাঁর শরীর কতটা যন্ত্রণায় কাতর—এসব যেন আর কোনো বিষয়ই নয়। আশঙ্কা শুধু একটাই—বাবা যদি স্বাক্ষর করার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান!
এ দৃশ্য শুধু একটি পরিবারের করুণ চিত্র নয়; বরং আমাদের সমাজের বিবেকের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া এক কঠিন প্রশ্ন—
আমরা কি সত্যিই মানুষ হচ্ছি, নাকি সম্পদের মোহে ধীরে ধীরে মানবিকতাকেই হারিয়ে ফেলছি..?
অন্যদিকে আফগানিস্তানের সেই ভাইয়ের কথা মনে পড়ে—যিনি দীর্ঘ ১৪০ দিন পরও মৃত ভাইয়ের মরদেহ নিজের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা হারাননি। প্রয়োজনে মাটি খুঁড়েও প্রিয় ভাইয়ের দেহ ফিরিয়ে আনার জন্য জীবন বাজি রেখেছেন।
একদিকে মৃত ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসার এমন গভীর টান, অন্যদিকে জীবিত বাবার প্রতি সম্পদের জন্য এমন নির্মম উদাসীনতা!
সম্পর্ক তো এমন হওয়ার কথা ছিল না।
ভাই মানে বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানো।
বাবা মানে জীবনের শেষ আশ্রয়।
সন্তান মানে বাবা-মায়ের বার্ধক্যের অবলম্বন—তাদের অসহায়ত্বের সুযোগসন্ধানী নয়।
সম্পদ মানুষের জন্য; মানুষ সম্পদের জন্য নয়।
আজ যে বাবার কাছ থেকে সম্পত্তির কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য এত ব্যস্ততা, একদিন সেই বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে হয়তো অঝোরে কাঁদতে হবে। কিন্তু তখন আর তাঁর কাঁপা হাতে হাত রাখার সুযোগ থাকবে না, আর থাকবে না সেই মুখটি—যে মুখটি সারাজীবন সন্তানের জন্য দো‘আ করেছে।
বাবা-মায়ের জীবদ্দশায় তাঁদের হক আদায় করার সুযোগটাই আসল সম্পদ। তাঁদের মৃত্যুর পর অগাধ সম্পত্তির মালিক হয়েও যদি তাঁদের ভালোবাসা ও দো‘আ থেকে বঞ্চিত হতে হয়, তবে সেই সম্পদ নিঃসন্দেহে এক গভীর শূন্যতার নাম।
আসুন, সম্পদের মোহে সম্পর্ককে বিসর্জন না দিই।
বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অসহায়ত্বকে সুযোগ হিসেবে নয়, সেবা ও নেক আমলের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখি।
একদিন সম্পত্তির কাগজ থাকবে, ঘরবাড়ী থাকবে, জমি থাকবে; কিন্তু বাবা-মা হয়তো আর থাকবেন না।
সেদিন আফসোস করে লাভ হবে না।
আজই সময়—বাবার হাতটি ধরে বলার, “আপনি চিন্তা করবেন না, আমি আছি।”
১
১ মন্তব্য