সহকারী শিক্ষক
০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:২৫ অপরাহ্ণ
শিক্ষার্থীর গণিতভীতি: একজন গণিত শিক্ষকের ভাবনা
গণিত—শব্দটি শুনলেই অনেক শিক্ষার্থীর মনে এক ধরনের ভয় কাজ করে। কেউ কেউ খাতা খোলার আগেই বলে, “স্যার, গণিত আমার হবে না।” আবার কেউ অঙ্ক করতে গিয়ে একটু ভুল হলেই খাতা বন্ধ করে বসে থাকে। একজন গণিত শিক্ষক হিসেবে শ্রেণিকক্ষে প্রতিদিনই আমাকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
কিন্তু আমার কাছে প্রশ্ন হলো—শিক্ষার্থীরা আসলে গণিতকে ভয় পায় কেন?
আমার শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, বেশিরভাগ শিক্ষার্থী গণিতকে ভয় পায় গণিত খুব কঠিন বলে নয়; বরং শুরুতেই কয়েকবার ভুল করা বা না পারার কারণে তাদের মনে একটা ধারণা তৈরি হয়ে যায়—“আমি গণিতে দুর্বল।”
এই ধারণাটাই ধীরে ধীরে গণিতভীতিতে পরিণত হয়।
অনেক সময় আমরা শিক্ষকরা নিজের অজান্তেই এই ভয় আরও বাড়িয়ে দিই। কোনো শিক্ষার্থী একটি অঙ্ক করতে না পারলে তাকে সময় না দিয়ে আমরা নিজেরাই অঙ্কটি করে দিই। আবার কখনো ভুলের জন্য বকাঝকা করি। এতে শিক্ষার্থী অঙ্ক শেখার চেয়ে ভুল করার ভয় বেশি পেতে শুরু করে।
আমি মনে করি, একজন গণিত শিক্ষকের প্রথম কাজ হলো শিক্ষার্থীর মনে গণিত সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস তৈরি করা।
শ্রেণিকক্ষে কোনো শিক্ষার্থী অঙ্ক করতে না পারলে আমি চেষ্টা করি তাকে সরাসরি “তুমি পারো না” না বলে জিজ্ঞেস করতে—“কোথায় আটকে গেছ?”
অনেক সময় দেখা যায়, পুরো অঙ্কটি তার কাছে কঠিন নয়। শুধু একটি ধাপ বুঝতে পারেনি। সেই জায়গাটি বুঝিয়ে দিলে সে নিজেই পরের ধাপগুলো করতে পারে।
এখানেই একজন শিক্ষকের ধৈর্যের প্রয়োজন।
আমি শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করি, গণিতে ভুল করা কোনো অপরাধ নয়। বরং ভুলের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি কোথায় সমস্যা হচ্ছে। একটি অঙ্কের উত্তর ভুল হলেও শিক্ষার্থী যদি নিজে চেষ্টা করে থাকে, সেই চেষ্টাটাকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
গণিত শেখানোর সময় আমি বাস্তব জীবনের উদাহরণ ব্যবহার করার চেষ্টা করি। কারণ বইয়ের অঙ্ক অনেক সময় শিক্ষার্থীর কাছে কঠিন মনে হলেও বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দিলে বিষয়টি সহজ হয়ে যায়।
যেমন, শতকরা শেখানোর সময় শুধু বইয়ের প্রশ্ন না করে দোকানে পণ্যের ছাড়ের কথা বলা যায়। ৫০০ টাকার একটি পণ্যে ১০ শতাংশ ছাড় দিলে কত টাকা কমবে—এটা শিক্ষার্থীর কাছে অনেক বেশি পরিচিত একটি বিষয়।
একইভাবে লাভ-ক্ষতি শেখানোর সময় দোকানের কেনাবেচা, অনুপাত শেখানোর সময় রান্নার উপকরণ, সময় ও দূরত্ব শেখানোর সময় বাস বা গাড়িতে যাতায়াতের উদাহরণ দেওয়া যায়।
তখন শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে, গণিত শুধু পরীক্ষার খাতায় লেখার বিষয় নয়; আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গেও গণিত জড়িয়ে আছে।
আরেকটি বিষয় আমি বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছি—একজন শিক্ষার্থী যদি কোনো একটি মৌলিক বিষয় ভালোভাবে না বোঝে, পরবর্তী অধ্যায়ে গিয়ে তার সমস্যা আরও বাড়তে থাকে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভগ্নাংশের মৌলিক ধারণা পরিষ্কার না থাকলে পরবর্তীতে বীজগণিত বা সমীকরণ শেখার সময় সে সমস্যায় পড়বে। তাই নতুন কোনো অধ্যায় শুরু করার আগে আগের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো একটু ঝালিয়ে নেওয়া দরকার।
সব শিক্ষার্থী একই গতিতে শিখবে—এমনটা বাস্তবে হয় না। কেউ খুব দ্রুত বুঝে ফেলে, আবার কারও একটু বেশি সময় লাগে। একজন শিক্ষক হিসেবে আমাদের বিষয়টি বুঝতে হবে।
দুর্বল শিক্ষার্থীকে শুধু বেশি বেশি অঙ্ক দিয়ে দিলেই সে ভালো করবে—বিষয়টি এমন নয়। বরং কোথায় তার সমস্যা হচ্ছে সেটা খুঁজে বের করে ধীরে ধীরে তাকে এগিয়ে নিতে হয়।
আমার কাছে একজন গণিত শিক্ষকের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া নয়।
যে শিক্ষার্থী একসময় বলত, “স্যার, আমি গণিত পারি না”—সে যদি একদিন নিজে থেকে বলে, “স্যার, আরেকটা অঙ্ক দেন, আমি চেষ্টা করি,” তখন সেটাকেই আমি বড় অর্জন মনে করি।
কারণ গণিত শেখার জন্য শুধু মেধা নয়, আত্মবিশ্বাস এবং নিয়মিত চর্চাও প্রয়োজন।
আমরা যদি শিক্ষার্থীদের ভুল করার সুযোগ দিই, তাদের কথা শুনি, বাস্তব জীবনের সঙ্গে গণিতের সম্পর্ক দেখাই এবং তাদের ছোট ছোট সাফল্যকে উৎসাহ দিই, তাহলে ধীরে ধীরে গণিতভীতি কমানো সম্ভব।
একজন শিক্ষার্থীর একটি অঙ্ক ভুল হয়েছে—এটা বড় বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সে অঙ্কটি করার চেষ্টা করেছে কি না এবং ভুল থেকে পরেরবার কিছু শিখেছে কি না।
আমার মনে হয়, গণিত শেখানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এখানেই।
গণিত কঠিন নয়; অনেক সময় গণিতকে কঠিন মনে হওয়ার পেছনে কাজ করে ভয় এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব।
একজন শিক্ষক যদি সেই ভয়টা একটু কমিয়ে দিতে পারেন, তাহলে যে শিক্ষার্থী গতকালও বলেছিল “আমি গণিত পারি না”, সেই শিক্ষার্থীই হয়তো আগামীকাল বলবে—“স্যার, এবার আমি নিজে করে দেখব।”
একজন গণিত শিক্ষক হিসেবে আমার প্রতিদিনের চেষ্টা তাই শুধু শিক্ষার্থীদের অঙ্কের উত্তর শেখানো নয়। আমি চাই তারা একটি সমস্যা দেখে ভয় না পেয়ে ধাপে ধাপে সমাধানের পথ খুঁজতে শিখুক।
কারণ এই অভ্যাস শুধু গণিতের পরীক্ষায় নয়, জীবনের অনেক সমস্যার ক্ষেত্রেও কাজে লাগে।
১
১ মন্তব্য