Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:৫৩ অপরাহ্ণ

শিশুদের শিষ্টারের শিক্ষা


শিশুদের শিষ্টাচারের শিক্ষা

একটি শিশুর জীবনের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো তার পরিবার। আর দ্বিতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো বিদ্যালয়। শিশুর জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি তার চরিত্র, আচরণ, মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলি গড়ে ওঠে পরিবার ও বিদ্যালয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। একটি শিশু কতটা ভদ্র, বিনয়ী, দায়িত্বশীল ও মানবিক হবে—তার অনেকটাই নির্ভর করে সে পরিবার ও বিদ্যালয় থেকে কী ধরনের শিক্ষা পাচ্ছে তার ওপর।

শিশুরা শিষ্টাচারের শিক্ষা পায় মূলত পরিবার ও স্কুল থেকে। পরিবারে বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং অন্যান্য সদস্যদের আচরণ শিশুর মনে গভীর প্রভাব ফেলে। একটি শিশু ছোটবেলা থেকেই দেখে—বাবা কীভাবে মায়ের সঙ্গে কথা বলছেন, মা কীভাবে পরিবারের অন্য সদস্যদের সম্মান করছেন, বড়দের কীভাবে সালাম বা শুভেচ্ছা জানানো হচ্ছে, অতিথি এলে কীভাবে তাদের অভ্যর্থনা করা হচ্ছে। এসব দৃশ্য শিশুর মনে অজান্তেই একটি আচরণগত শিক্ষা তৈরি করে।

তাই শিশুকে শুধু বলা—‘ভদ্র হও’, ‘বড়দের সম্মান করো’, ‘মিথ্যা বলবে না’, ‘কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে না’—এতেই শিষ্টাচারের শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। শিশুকে শেখাতে হলে বড়দের নিজেদের আচরণেও তার বাস্তব উদাহরণ তৈরি করতে হবে। কারণ শিশুরা অনেক সময় আমাদের কথা থেকে যতটা শেখে, তার চেয়ে বেশি শেখে আমাদের কাজ দেখে।

একটি শিশু যখন বাবা-মাকে পরস্পরের সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলতে দেখে, তখন সে বুঝতে শেখে সুন্দর ভাষায় কথা বলার গুরুত্ব। যখন সে দেখে পরিবারের সবাই বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করছে, তখন তার মধ্যেও সম্মানবোধ তৈরি হয়। যখন সে দেখে কেউ ভুল করলে তাকে অপমান না করে সুন্দরভাবে বোঝানো হচ্ছে, তখন সে সহনশীলতা ও ক্ষমাশীলতা শিখে।

বিদ্যালয়ও শিশুর শিষ্টাচার শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। বিদ্যালয়ে একজন শিশু শুধু বাংলা, ইংরেজি, গণিত কিংবা বিজ্ঞান শেখে না; সে শেখে কীভাবে মানুষের সঙ্গে চলতে হয়। সহপাঠীর সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, শিক্ষককে কীভাবে সম্মান করতে হয়, বন্ধুর বিপদে কীভাবে পাশে দাঁড়াতে হয়, নিজের দায়িত্ব কীভাবে পালন করতে হয়—এসব শিক্ষাও বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন, তখন শিক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা জানানো, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা, অনুমতি নিয়ে কথা বলা, অন্যের কথা বলার সময় বাধা না দেওয়া—এসব ছোট ছোট অভ্যাসই ধীরে ধীরে শিশুর চরিত্রের অংশ হয়ে যায়।

একজন শিশু যদি বন্ধুর কাছ থেকে কলম নেয়, তাহলে তাকে ‘ধন্যবাদ’ বলতে শেখানো দরকার। কারও জিনিস ভুল করে নষ্ট করলে ‘দুঃখিত’ বলতে শেখানো দরকার। কেউ পড়ে গেলে তাকে নিয়ে হাসাহাসি না করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে শেখানো দরকার। লাইনে দাঁড়ানোর সময় অন্যকে ধাক্কা না দিয়ে নিজের পালার জন্য অপেক্ষা করতে শেখানো দরকার। শ্রেণিকক্ষে ময়লা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে শেখানো দরকার।

এসব হয়তো খুব ছোট ছোট বিষয়। কিন্তু একটি শিশুর ভবিষ্যৎ চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে এসব ছোট অভ্যাসের গুরুত্ব অনেক বড়।

শিষ্টাচার মানে শুধু বড়দের সালাম দেওয়া বা ভদ্রভাবে কথা বলা নয়। শিষ্টাচার হলো অন্য মানুষের প্রতি সম্মান, সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ ও মানবিক আচরণ। একজন শিশু যদি দুর্বল সহপাঠীকে নিয়ে হাসাহাসি না করে, বরং তাকে সাহায্য করে—সেটিও শিষ্টাচার। কেউ ভুল করলে তাকে অপমান না করে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেওয়া—সেটিও শিষ্টাচার। নিজের খাবার অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া—সেটিও শিষ্টাচার। নিজের ব্যবহৃত জিনিস গুছিয়ে রাখা এবং বিদ্যালয়ের সম্পদ নষ্ট না করা—সেটিও শিষ্টাচারের অংশ।

বর্তমান সময়ে শিশুদের হাতে মোবাইল, ইন্টারনেট ও বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল মাধ্যম খুব সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে পরিবার ও বিদ্যালয়ের পাশাপাশি শিশুর আচরণ গঠনে এসব মাধ্যমেরও প্রভাব পড়ছে। তাই অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। শিশু কী দেখছে, কী শুনছে, কী ধরনের ভাষা ব্যবহার করছে—এসব বিষয়ে খেয়াল রাখা প্রয়োজন।

শিশুকে বকাঝকা করে সব সময় ভালো আচরণ শেখানো যায় না। ভালো আচরণ শেখাতে প্রয়োজন ভালোবাসা, ধৈর্য ও নিয়মিত অনুশীলন। কোনো শিশু ভুল করলে তাকে সবার সামনে অপমান না করে আলাদা করে বুঝিয়ে বলা উচিত। কারণ অপমান শিশুকে ভালো করে তোলে না; বরং অনেক সময় তার আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেয়।

অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে, শিশু কোনো কথা একবার বললেই সব সময় মনে রাখবে—এমন নয়। একই বিষয় বারবার সুন্দরভাবে বোঝাতে হবে। আজ সে ভুল করবে, কাল আবার ভুল করতে পারে। কিন্তু ধৈর্য ধরে তাকে শেখাতে হবে। ছোট একটি ভালো আচরণের জন্যও তাকে প্রশংসা করতে হবে। এতে শিশুর মধ্যে ভালো কাজ করার আগ্রহ তৈরি হবে।

একইভাবে শিক্ষকদেরও শিশুর আচরণগত পরিবর্তনের দিকে নজর রাখতে হবে। শুধু পরীক্ষার ফল ভালো হলেই একজন শিক্ষার্থী ভালো শিক্ষার্থী হয়ে যায় না। একজন শিক্ষার্থী যদি ভালো ফল করার পাশাপাশি সহপাঠীকে সম্মান করে, শিক্ষকের কথা শোনে, বিদ্যালয়ের নিয়ম মেনে চলে, দুর্বল বন্ধুকে সাহায্য করে এবং সত্য কথা বলে—তাহলেই তার শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য প্রকাশ পায়।

আমরা অনেক সময় শিশুর পরীক্ষার নম্বর নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করি। সে কত পেয়েছে, কততম হয়েছে, কোন বিষয়ে কম পেয়েছে—এসব নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু সে কেমন ব্যবহার করছে, কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করছে কি না, বড়দের সম্মান করছে কি না, নিজের দায়িত্ব পালন করছে কি না—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

কারণ একটি শিশু একদিন বড় হবে। সে কোনো পেশায় যাবে, সমাজে দায়িত্ব পালন করবে, একটি পরিবার গড়ে তুলবে। আজকের শিশুই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, কৃষক, সাংবাদিক কিংবা সমাজের নেতৃত্বদানকারী মানুষ। তাই তার হাতে শুধু বই তুলে দিলেই হবে না; তার হাতে তুলে দিতে হবে মানবিকতার শিক্ষা।

শিশুকে শেখাতে হবে—

‘তুমি বড় হবে, কিন্তু কাউকে ছোট করবে না।’

‘তুমি সফল হবে, কিন্তু অন্যের অধিকার কেড়ে নেবে না।’

‘তুমি জ্ঞানী হবে, কিন্তু অহংকারী হবে না।’

‘তুমি নিজের জন্য বাঁচবে, পাশাপাশি অন্যের জন্যও ভাববে।’

পরিবার শিশুর প্রথম বিদ্যালয়, আর বিদ্যালয় তার দ্বিতীয় পরিবার। তাই পরিবার ও বিদ্যালয়ের মধ্যে সুন্দর সমন্বয় থাকা অত্যন্ত জরুরি। অভিভাবক ও শিক্ষক যদি একই মূল্যবোধ নিয়ে শিশুকে গড়ে তোলেন, তাহলে শিশুর আচরণে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বেই।

শিশুদের শিষ্টাচার শেখানো কোনো এক দিনের কাজ নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস, ছোট ছোট কথা এবং ছোট ছোট আচরণের মধ্য দিয়েই একটি শিশুর চরিত্র তৈরি হয়।

তাই আসুন, আমরা শুধু শিশুকে শিষ্টাচারের কথা না বলি—নিজেদের আচরণ দিয়েও তাকে শিষ্টাচার শেখাই। কারণ শিশুরা আমাদের কথা ভুলে যেতে পারে, কিন্তু আমাদের আচরণের দৃষ্টান্ত তারা অনেক দিন মনে রাখে।

আজকের শিশুকে যদি আমরা ভদ্রতা, সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার শিক্ষা দিতে পারি, তাহলে আগামী দিনের সমাজ হবে আরও সুন্দর, নিরাপদ ও মানবিক।


মন্তব্য করুন