Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:৩০ পূর্বাহ্ণ

পানি যদি হারিয়ে যায় (—সূরা আল-মুলক : ৩০-এর আলোকে) -মোঃ মুজিবুর রহমান

                                                                            পানি যদি হারিয়ে যায়

(—সূরা আল-মুলক : ৩০-এর আলোকে)

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক

মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর

পানি যদি হারিয়ে যায় ভূগর্ভের তলে,
তৃষ্ণার্ত এই পৃথিবী তখন কাঁদবে অবহেলে।
কূপ যদি যায় শুকিয়ে, থেমে যায় নদীর ধারা,
কে দেবে জল? কে মেটাবে তৃষ্ণার ব্যথা সারা?

হে মানুষ, একটু থেমে ভেবে দেখো আজ,
জীবনজুড়ে পানির দানকত মহান কাজ!
পানি ছাড়া প্রাণের অস্তিত্ব কোথায় বলো আর?
পানি দিয়েই সজীব থাকে পৃথিবীর সংসার।

আকাশজুড়ে মেঘের ভেলা, বৃষ্টি নামে ঝরে,
শুষ্ক মাটি হাসতে থাকে বৃষ্টিধারা পেয়ে।
বীজের মাঝে প্রাণ জাগে, সবুজ হয় মাঠ,
পানির দানে ভরে ওঠে প্রকৃতিরই হাট।

নদী বয়ে যায় আপন বেগে, সাগর থাকে ভরা,
ঝরনা গায় পাহাড় বেয়ে সুরের মধুর ধারা।
পুকুর, খাল আর কূপের জলে প্রাণের কত টান,
সবই রবের দয়া পেয়ে পায় যে জীবন-প্রাণ।

যে পানি তুমি পান করো প্রতিদিনের ক্ষণে,
কত বড় নিয়ামত আছে তারই অন্তরালে!
এক পেয়ালা স্বচ্ছ পানি তৃষ্ণা মেটায় প্রাণ,
এই সামান্য দানের মাঝেই রবের মহাদান।

তাই আল্লাহ প্রশ্ন করেনভেবে দেখো মন,
কোথা থেকে আসে পানি, কোথায় তারই জীবন?
যদি পানি চলে যায় গভীর মাটির তলে,
কে আনবে তা তোমাদের জন্য প্রবহমান জলে?

غَوْرًا যদি পানি নামে নাগালেরও নিচে,
মানুষের সব শক্তি তখন যাবে যেন মুছে।
যন্ত্র দিয়ে খুঁজবে মানুষ, করবে কত সাধন,
রবের হুকুম না থাকলে বিফল হবে যত যতন।

ধন থাকলেও জল না থাকলে কী হবে সেই ধন?
প্রাসাদ থাকলেও তৃষ্ণায় জ্বলবে যদি মন!
ক্ষমতা, জ্ঞান, প্রযুক্তিসবই সীমাবদ্ধ,
রবের হুকুম ছাড়া মানুষ সত্যিই দুর্বল, অক্ষম।

মানুষ শুধু চেষ্টা করে, ফলের মালিক কে?
বুদ্ধি দেয় কে, শক্তি দেয় কে, জীবন রাখে কে?
সূর্য ওঠে, মেঘ জমে, বৃষ্টি নামে নেমে
সবই ঘটে আল্লাহরই নির্ধারিত নিয়মে।

তিনি আকাশে মেঘ পাঠান, বৃষ্টি দেন ঝরিয়ে,
মৃত জমিন জাগিয়ে তোলেন সজীবতা ছড়িয়ে।
শস্য ফলে, ফুল ফোটে, হাসে বন-বাদাড়,
পানির দানে প্রাণ ফিরে পায় পৃথিবীর সংসার।

মানুষ যখন তৃষ্ণায় কাতর, বুঝতে পারে তখন,
এক ফোঁটা জল কত দামীকত অমূল্য জীবন!
মরুভূমির উত্তপ্ত বুকে পথিক যখন যায়,
একটু পানির আশায় তখন কত ব্যাকুল হয়!

তাই নিয়ামত পেয়ে যেন অহংকার না করি,
রবের দানকে নিজের বলে ভুল যেন না ধরি।
যে দান তিনি দিয়েছেন, তাঁরই শুকরিয়া,
কৃতজ্ঞ হৃদয় গড়ে তুলি ঈমান দিয়ে ভরিয়া।

পানি নিয়ে খেলব না আর, করব না অপচয়,
প্রয়োজন যতটুকু শুধু ততটুকুই হয়।
কল খুলে রেখে দিয়ে জল ফেলব না আর বৃথা,
নিয়ামতের অপচয় ডেকে আনে অন্তরে ব্যথা।

নিজে পানি বাঁচাব আমরা, অন্যকেও বলব,
পানির মূল্য বুঝে নিয়ে সচেতনতা গড়ব।
আজকের এই সামান্য জল আগামী দিনের প্রাণ,
সুরক্ষিত রাখাই হবে সবার দায়িত্ব-জ্ঞান।

নদী যেন দূষিত না হয়, জলাশয় থাকুক ভরা,
খাল-বিল যেন বেঁচে থাকে, স্বচ্ছ থাকুক ধারা।
পানির উৎ রক্ষা করা নৈতিক দায়িত্ব,
মানুষ, প্রাণী, বৃক্ষসবার জন্য সম্পদ।

একটি গাছও পানি পেয়ে মাথা তোলে ধীরে,
একটি পাখি জল পেলে গান গায় নীড়ে ফিরে।
একটি পশু তৃষ্ণা মিটিয়ে শান্ত হয় যে প্রাণে,
রহমতেরই ছায়া যেন ফুটে ওঠে তাতে।

মানুষ শুধু নিজের জন্য পৃথিবীতে নয়,
সৃষ্টিজগতের প্রতিও তার দায়িত্ব রয়।
পানি দিয়ে প্রাণ বাঁচানো মহৎ কাজ যে ভাই,
দয়ার কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যায়।

কিন্তু মনে রাখতে হবেদাতা একজনই,
তিনি ছাড়া সত্যিকার মালিক আর কেউই নন।
মানুষ শুধু মাধ্যমমাত্র, ক্ষমতা তাঁর দান,
তাঁর হুকুমেই টিকে থাকে পৃথিবীর প্রাণ।

তিনি চাইলে নদী শুকায়, চাইলে দেন ধারা,
তিনি চাইলে মেঘে ভরে আকাশেরই সারা।
তিনি চাইলে বৃষ্টি নামে মরুভূমির বুকে,
শুষ্ক মাটি প্রাণ ফিরে পায় তাঁরই দয়া পেয়ে।

তিনি চাইলে ঝরনা ফোটে পাথরেরই কোলে,
তিনি চাইলে জল প্রবাহিত হয় অনন্ত দোলে।
তিনি চাইলে কূপের পানি উঠে আসে তীরে,
তাঁরই দানে জীবন হাসে পৃথিবীজুড়ে ফিরে।

তাই তো কুরআনের বাণী হৃদয়ে রাখি ধরে,
নিয়ামতের মালিক যিনিতাঁরই শুকরিয়া করি।
তাওহিদের এই শিক্ষা হোক জীবনেরই গান,
আল্লাহ এক, তিনিই রব, তিনিই পরম মহান।

কেউ নয় তাঁর সমকক্ষ, কেউ নয় তাঁর সাথী,
তিনি একক, অদ্বিতীয়তিনি সকলেরই গতি।
তাঁরই হাতে জীবন-মরণ, রিজিক আর প্রাণ,
তাঁরই হুকুমে বিশ্বজগৎ পায় আপন বিধান।

পানি দেখে রবকে ভুলে গেলে ভুল হবে যে বড়,
নিয়ামত দেখে দাতাকে না চেনা অন্ধকার ঘোর।
জল শুধু জল নয়এতে নিদর্শন আছে,
স্রষ্টার অসীম কুদরত প্রকাশিত তার মাঝে।

এক ফোঁটাতে জীবন থাকে, সাগরে তার ঢেউ,
রবের কুদরত বুঝতে গেলে শেষ করা কি কেউ?
জলের চক্র, বৃষ্টি, নদীকী বিস্ময়ময়,
সবকিছুর পেছনে আছে স্রষ্টার মহাশক্তিময় পরিচয়।

সূর্যের তাপে জল উঠে যায় আকাশেরই পানে,
মেঘ হয়ে তা ফিরে আসে বৃষ্টিধারার গানে।
পৃথিবী পায় প্রাণের রস, সবুজ হয় বন,
এই নিয়মে প্রকাশ পায় রবেরই নিদর্শন।

তাই জ্ঞানী সে-, যে দেখে জগতের প্রতিটি দান,
দান দেখে দাতাকে স্মরণ করে তার প্রাণ।
নিয়ামত পেয়ে যে বান্দা শুকরিয়া করে,
তার হৃদয়ে কৃতজ্ঞতার আলো নূরের মতো ঝরে।

পানি পেলে বলোআলহামদুলিল্লাহ,
রবের দানে জীবন পেলামআলহামদুলিল্লাহ।
তৃষ্ণা মিটে শান্তি এলে স্মরণ করো তাঁকে,
যিনি দান করেন পানি, জীবন দেন যাকে।

পানির দানে শিশুর হাসি, মায়ের মুখে হাসি,
কৃষকের ঘামে ফসল ফলে, ভরে ঘরের বাঁশি।
পানির দানে পশু বাঁচে, পাখি ফিরে নীড়ে,
পানির দানে প্রাণের মেলা পৃথিবীজুড়ে ঘিরে।

তাই পানি নিয়ে করব না কখনো অবহেলা,
নিয়ামতের মর্যাদা দেবএই হোক জীবনের মেলা।
যেখানে পানি কম, সেখানে দয়া নিয়ে যাই,
তৃষ্ণার্তের হাতে পানি দিয়ে মানবতা দেখাই।

একটু পানি দান করা ছোট কাজ নয়,
তৃষ্ণার্ত প্রাণের কাছে তা বিরাট উপকার হয়।
মানুষের দুঃখ বুঝে যে এগিয়ে দেয় হাত,
তার মাঝে ফুটে ওঠে দয়া, মমতা আর প্রভাত।

তৃষ্ণার্ত পথিক যদি চায় এক পেয়ালা জল,
দিতে পারলে ফিরিয়ে দিও না তাকে অবহেলায় বল।
প্রাণের কষ্ট বুঝে যদি বাড়িয়ে দাও হাত,
সদাচরণের সেই আলোয় উজ্জ্বল হবে রাত।

তবে সব কাজের আগে রাখো রবের সন্তুষ্টি,
লোক দেখানো নয়চাই তাঁরই নৈকট্য তুষ্টি।
দান, দয়া, সেবাসবই হোক তাঁর তরে,
তবেই সে আমল মূল্য পাবে আখিরাতের ঘরে।

হে মানুষ, মনে রেখোদুনিয়া ক্ষণিকের,
নিয়ামতও পরীক্ষা সত্য চিরদিনের।
কে শুকরিয়া করে, কে করে অবহেলা,
কর্মের হিসাব হবে একদিনথামবে না সে মেলা।

আজ যে পানি হাতে আছে, কাল নাও থাকতে পারে,
আজ যে নদী বয়ে চলে, কাল শুকাতে পারে।
আজ যে কূপে জল রয়েছে, কাল হতে পারে শূন্য,
তাই রবের দানকে মনে করো না কখনো তুচ্ছ।

পানি যদি একদিন সত্যিই যায় হারিয়ে,
মানুষ তখন কাঁদবে শুধু তৃষ্ণায় বুক ভারিয়ে।
কত বিজ্ঞান, কত যন্ত্র, কত শক্তি-জ্ঞান
রবের অনুমতি ছাড়া সবই হবে ব্যর্থপ্রমাণ।

তখন কে দেবে পানি? কে আনবে জল?
কে ফিরিয়ে দেবে নদীর হারানো সেই কলকল?
কে ভরাবে শুকনো কূপ? কে জাগাবে ধারা?
আল্লাহ ছাড়া কেউ কি পারে?—নেই তো কেউ সারা!

এই প্রশ্নে কুরআন জাগায় ঘুমন্ত মানবমন,
ভেঙে দেয় অহংকারের মিথ্যা আবরণ।
শেখায়নিজ শক্তি নিয়ে করো না অহংকার,
তোমার প্রতিটি শ্বাসই রবের দয়া অপার।

তাই কাজ করো, চেষ্টা করো, উপায় অবলম্বন,
কিন্তু ফলের জন্য রাখো আল্লাহর ওপর মন।
উপায় গ্রহণ মুমিনের পথ, তাওয়াক্কুল তার প্রাণ,
চেষ্টা শেষে রবের ওপর রাখো পূর্ণ বিশ্বাস-জ্ঞান।

বৃষ্টি চাইলে রবের কাছে করো মোনাজাত,
শুকরিয়াতে ভরে উঠুক তোমার দিন-রাত।
পাপ থেকে ফিরে এসে তাওবা করো প্রাণে,
রহমতের দরজা খোলা আছে আল্লাহর দানে।

নিয়ামত পেলে শুকরিয়া, বিপদ এলে সবর,
রবের প্রতি আস্থা রাখোএই তো মুমিনের ঘর।
আনুগত্যে জীবন সাজাও, সত্য পথে চলো,
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হৃদয়খানি গড়ো।

পানির মতো স্বচ্ছ হোক আমাদের অন্তর,
সত্য কথায় সুন্দর হোক মুখের প্রতিটি স্বর।
হিংসা, অহংকার, বিদ্বেষ দূরে যাক সব,
হৃদয়ের গভীর প্রান্তে জাগুক আল্লাহর ভয়।

পানি যেমন নিচের দিকে বয়ে চলে নীরবে,
মুমিন তেমনি বিনয়ী হোক মানুষেরই ভিড়ে।
নিজেকে বড় ভাববে না, করবে না অহংকার,
বিনয়ী হৃদয়েই ফুটে ঈমানেরই বাহার।

পানি যেমন জীবন দেয়, তেমনি হও উপকারী,
দুঃখীর পাশে দাঁড়াও, হও মানুষের সহকারী।
কারও চোখে অশ্রু এলে মুছে দিও তা,
মানবসেবার পথেই খুঁজে নাও সওয়াবের দিশা।

পৃথিবী শুধু মানুষের নয়সৃষ্টির সবার ঘর,
রক্ষা করো জল-জমিন, নদী, পাহাড়, বনভূমি।
দূষণ করে নষ্ট কোরো না রবের এই দান,
পরিবেশ রক্ষা করাও দায়িত্বেরই অংশ মহান।

হে আল্লাহ, পানি তুমি দিয়েছ দয়ায়,
জীবন রেখেছ তারই স্নিগ্ধ মায়ায়।
তোমার দান চিনতে দাও, দাও শুকরিয়া,
নিয়ামতের অপচয় থেকে রাখো আমাদের বাঁচিয়ে।

যদি কখনো শুকিয়ে যায় নদীর বুকের ধারা,
যদি কখনো কূপে না থাকে এক বিন্দু পানি সারা,
তখন যেন বুঝি আমরাকত অসহায়,
তোমার রহমত ছাড়া বান্দার কোনো উপায় নাই।

তাই আজই তোমার দানকে করি সম্মান,
পানি বাঁচাই, রক্ষা করি জীবনেরই প্রাণ।
অপচয় ছেড়ে দিই, দূষণ করি দূর,
নিয়ামতের শুকরিয়াতে হোক হৃদয় ভরপুর।

হে মানব, আয়াতটি শুধু পড়ার জন্য নয়,
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার শিক্ষা প্রয়োগ হয়।
পানির মাঝে শিক্ষা আছেকৃতজ্ঞ হও প্রাণে,
স্রষ্টাকে চিনে নাও তাঁর দেওয়া প্রতিটি দানে।

যে পানি তোমার তৃষ্ণা মেটায় প্রতিদিন,
সেই পানির মালিক রব সত্য রেখো ঋণ।
তাঁরই দানে সবুজ পৃথিবী, তাঁরই দানে প্রাণ,
তাঁরই দয়া ছাড়া শূন্য মানুষের সব জ্ঞান।

তোমাদের পানি যদি গভীরে হারিয়ে যায়,
কে তবে তোমাদের জন্য প্রবহমান পানি আনবে?”—হায়!
এই প্রশ্ন যেন জাগিয়ে দেয় অন্তরের ঘুম,
অহংকার ভেঙে দিক, দূর করুক মিথ্যা গুমরাহি ভ্রম।

পানি যদি হারিয়ে যায়ভেবে দেখো ভাই,
আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার আশ্রয় আর কোথায়?
তাঁরই দানে জীবনধারা, তাঁরই দানে প্রাণ,
তাঁরই রহমতে ভরে থাকে পৃথিবীর বিধান।

তাই বলিআলহামদুলিল্লাহ, রবের অশেষ দান,
পানির মতো অমূল্য তাঁর অসংখ্য নিয়ামত মহান।
শুকরিয়াতে ভরে উঠুক আমাদের প্রতিটি প্রাণ,
তাওহিদের আলোয় গড়ি সুন্দর জীবন-বিধান।

পানি বাঁচুক, প্রাণ বাঁচুক, বাঁচুক ধরার প্রাণ,
রবের দানে সজীব হোক পৃথিবীর প্রতিটি স্থান।
নিয়ামতের মর্যাদা দিয়ে চলি সঠিক পথে,
আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই দুনিয়া আখিরাতে।

শেষে শুধু এই শিক্ষা থাক হৃদয়েরই ঘরে
নিয়ামতের দাতা আল্লাহ, স্মরণ করি তাঁকে ভোরে।
পানি যদি ভূগর্ভে যায়, কে দেবে তার সন্ধান?
আল্লাহ ছাড়া কেউ নয়তিনিই পরম দয়াবান।

তাই শুকরিয়া, তাই তাওহিদ, তাই রবেরই স্মরণ,
তাঁর বিধানের পথে হোক আমাদের জীবন।
পানি যেন শেখায় আমায় বিনয়, দয়া, জ্ঞান
আল্লাহর দানে বেঁচে আছিআল্লাহই পরম মহান।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ