সহকারী অধ্যাপক
০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:৩৩ পূর্বাহ্ণ
পানি—আল্লাহর অমূল্য নিয়ামত ও আমাদের দায়িত্ব (সূরা আল-মুলক : ৩০-এর আলোকে) - মোঃ মুজিবুর রহমান
পানি—আল্লাহর অমূল্য নিয়ামত ও আমাদের দায়িত্ব
(সূরা আল-মুলক : ৩০-এর আলোকে)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
পানি পৃথিবীর জীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। মানুষ, পশু-পাখি, উদ্ভিদ—প্রাণের অস্তিত্বই পানির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। মানুষের খাদ্য, কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা, শিল্প, পরিবেশ—জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পানির প্রয়োজন রয়েছে। আমরা প্রতিদিন পানি ব্যবহার করি, কিন্তু এর প্রকৃত মূল্য ও গুরুত্ব অনেক সময় উপলব্ধি করি না।
পবিত্র কুরআন মানুষকে প্রকৃতির বিভিন্ন নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান করেছে। পানিও আল্লাহর এমন একটি মহান নিদর্শন, যার মাধ্যমে মানুষের সামনে তাঁর অসীম ক্ষমতা, প্রজ্ঞা ও দয়ার পরিচয় প্রকাশ পায়। সূরা আল-মুলকের শেষ আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষকে পানির ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তা করতে বলেছেন—
قُلۡ اَرَءَیۡتُمۡ اِنۡ اَصۡبَحَ مَآؤُكُمۡ غَوۡرًا فَمَنۡ یَّاۡتِیۡكُمۡ بِمَآءٍ مَّعِیۡنٍ
অর্থ: “বল, তোমরা ভেবে দেখেছ কি, যদি তোমাদের পানি ভূগর্ভে চলে যায়, তাহলে কে তোমাদের প্রবহমান পানি এনে দেবে?”
এই ছোট অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ আয়াত মানুষের চিন্তার দুয়ার খুলে দেয়। এটি শুধু পানির গুরুত্বের কথা বলে না; বরং মানুষকে তার অসহায়ত্ব উপলব্ধি করায় এবং স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সব নিয়ামতের প্রকৃত মালিক ও দাতা আল্লাহ তাআলা।
পানির পরিচয় ও গুরুত্ব
পানি আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর অন্যতম মহান নিয়ামত। পৃথিবীর নদী, সাগর, পুকুর, খাল, ঝরনা, বৃষ্টি ও ভূগর্ভস্থ পানির মাধ্যমে জীবজগৎ টিকে আছে। মানুষের শরীরেও পানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম, খাদ্য হজম, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও বর্জ্য অপসারণসহ নানা কাজে পানি অপরিহার্য।
একজন তৃষ্ণার্ত মানুষের কাছে এক পেয়ালা পানির মূল্য অনেক সময় বিপুল সম্পদের চেয়েও বেশি। মরুভূমিতে পথ হারানো একজন মানুষের কাছে পানি জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে। অথচ আমরা অনেক সময় সহজলভ্য বলে পানির মূল্য ভুলে যাই।
কুরআন আমাদের সেই ভুল ভাঙাতে চায়। আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি নিয়ামতের প্রতি সচেতন হওয়া এবং তার দাতাকে স্মরণ করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
সূরা আল-মুলক : ৩০-এর গভীর শিক্ষা
সূরা আল-মুলকের ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা একটি প্রশ্ন করেছেন। তিনি মানুষকে বলেন—যদি তাদের পানি ভূগর্ভে গভীরভাবে চলে যায়, তাহলে কে তাদের জন্য প্রবহমান পানি এনে দেবে?
এখানে প্রশ্নের মধ্যেই রয়েছে গভীর শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা মানুষকে নিজের শক্তির সীমাবদ্ধতা বুঝতে শেখাচ্ছেন। মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্যে অনেক কিছু করতে পারে। কূপ খনন করতে পারে, পানি উত্তোলনের যন্ত্র তৈরি করতে পারে, নদীর পানি সংরক্ষণ করতে পারে এবং বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে পানির ব্যবহার সহজ করতে পারে। কিন্তু পানির মূল সৃষ্টি, বৃষ্টি, জলচক্র এবং পৃথিবীতে এর প্রাপ্যতার ওপর মানুষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই।
মানুষ উপায় অবলম্বন করতে পারে; কিন্তু উপায়ের কার্যকারিতা এবং ফলাফল আল্লাহর ইচ্ছার অধীন। তাই নিজের সামর্থ্য নিয়ে অহংকার না করে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত।
‘গাওর’ শব্দের তাৎপর্য
আয়াতে ব্যবহৃত غَوْرًا (গাওরান) শব্দটি গভীরে চলে যাওয়া বা এমনভাবে নিচে নেমে যাওয়ার অর্থ প্রকাশ করে, যেখান থেকে পানি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন বা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অর্থাৎ, যদি আল্লাহ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন যে পানির উৎস মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন মানুষ তার শক্তি ও প্রযুক্তি দিয়ে যতই চেষ্টা করুক, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া সেই পানি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
এটি মানুষের জন্য একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা। আমরা যে পানিকে স্বাভাবিক ও নিশ্চিত বলে মনে করি, সেটিও আসলে আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। তাই নিয়ামত পাওয়ার সময় তার মূল্য বুঝতে হবে এবং তার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে।
পানির প্রকৃত মালিক কে?
পৃথিবীর কোনো মানুষই পানির প্রকৃত মালিক নয়। মানুষ পানি ব্যবহার করে, সংরক্ষণ করে এবং বিভিন্ন কাজে কাজে লাগায়; কিন্তু পানি সৃষ্টি করার ক্ষমতা তার নেই।
বৃষ্টি কে নামান?
মেঘকে কে পরিচালনা করেন?
মাটির গভীরে পানি কে সংরক্ষণ করেন?
নদী-নালা ও ঝরনায় প্রবাহ কে দেন?
শুষ্ক মাটিতে প্রাণ কে ফিরিয়ে দেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের আল্লাহর কুদরত ও রবুবিয়্যাতের দিকে নিয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও প্রকৃত মালিক। তাঁর অনুমতি ছাড়া কোনো নিয়ামত স্থায়ী নয়। তাই পানি ব্যবহার করার সময় একজন মুমিনের হৃদয়ে কৃতজ্ঞতার অনুভূতি থাকা উচিত।
পানির মাধ্যমে আল্লাহর কুদরত উপলব্ধি
পানির স্বাভাবিক প্রবাহের দিকে তাকালেও আল্লাহর অসীম কুদরত উপলব্ধি করা যায়। সূর্যের তাপে পানি বাষ্প হয়ে আকাশে উঠে, মেঘ সৃষ্টি হয়, পরে বৃষ্টি হয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে। বৃষ্টির পানি মাটিকে সিক্ত করে, নদী-নালা পূর্ণ করে, ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে এবং জীবজগতকে জীবন দেয়।
একটি ছোট বীজ মাটির নিচে থাকে। পানি পেয়ে সেটি অঙ্কুরিত হয়। ধীরে ধীরে গাছ জন্মায়, পাতা আসে, ফুল ফোটে, ফল ধরে। এই বিস্ময়কর প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছে আল্লাহর নির্ধারিত ব্যবস্থা।
অতএব পানি শুধু তৃষ্ণা নিবারণের উপকরণ নয়; এটি আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শনের একটি।
পানি ও জীবনের সম্পর্ক
জীবনের সঙ্গে পানির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। মানুষ পানি ছাড়া বাঁচতে পারে না। পশু-পাখিরও পানির প্রয়োজন। গাছপালা পানি ছাড়া বেড়ে উঠতে পারে না। কৃষিকাজ পানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
বৃষ্টি না হলে কৃষকের জমি শুকিয়ে যায়। নদী শুকিয়ে গেলে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে গেলে মানুষের দৈনন্দিন জীবন কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কারণে পানির গুরুত্ব কেবল ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি, কৃষি ও পরিবেশ—সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত।
পানির অপচয় কেন বর্জনীয়?
আল্লাহর দেওয়া কোনো নিয়ামতই অপচয় করা উচিত নয়। ইসলামী জীবনব্যবস্থা পরিমিতিবোধ ও সংযমের শিক্ষা দেয়।
অপ্রয়োজনীয়ভাবে কল খুলে রাখা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা, পানির উৎস দূষিত করা কিংবা এমনভাবে পানি ব্যবহার করা যাতে অন্যরা বঞ্চিত হয়—এসব আচরণ একজন সচেতন মানুষের জন্য অনুচিত।
বিশেষ করে পানি অপচয়ের ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই পানি ব্যবহারে সচেতনতা গড়ে তোলা প্রত্যেকের দায়িত্ব।
অজু ও পানির সংযত ব্যবহার
ইসলামে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। অজু ও গোসলের মাধ্যমে মুসলমান দৈহিক পরিচ্ছন্নতা অর্জন করে এবং ইবাদতের জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু পবিত্রতা অর্জনের অর্থ এই নয় যে পানি অপচয় করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ অজু ও গোসলের ক্ষেত্রেও পরিমিত পানি ব্যবহারের শিক্ষা দিয়েছেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইসলামে পরিচ্ছন্নতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অপচয় থেকে বেঁচে থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।
অতএব অজুর সময় কল সম্পূর্ণ খুলে না রেখে প্রয়োজনমতো পানি ব্যবহার করা, গোসলের সময় অতিরিক্ত পানি নষ্ট না করা এবং পানি ব্যবহারে সচেতন থাকা ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পানি সংরক্ষণ আমাদের সামাজিক দায়িত্ব
পানি শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। একটি নদী, খাল, পুকুর বা জলাশয় অসংখ্য মানুষ ও প্রাণীর জীবনধারণে ভূমিকা রাখে।
তাই জলাশয় ভরাট করা, নদী দূষণ করা, শিল্পবর্জ্য পানিতে ফেলা এবং পানির উৎস নষ্ট করা সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
পানি সংরক্ষণের জন্য আমাদের কিছু অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে—
১. অপ্রয়োজনীয় পানি অপচয় না করা।
২. পানির কল ও পাইপের লিকেজ দ্রুত মেরামত করা।
৩. নদী, খাল, পুকুর ও জলাশয় দূষণ না করা।
৪. বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৫. কৃষিকাজে পানির সাশ্রয়ী পদ্ধতি ব্যবহার করা।
৬. শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পানির মূল্য শেখানো।
৭. অন্যের পানির অধিকার নষ্ট না করা।
৮. পানির উৎস রক্ষায় সামাজিকভাবে সচেতন হওয়া।
তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো
ইসলাম মানুষের প্রতি দয়া, সহমর্মিতা ও কল্যাণের শিক্ষা দেয়। তৃষ্ণার্ত মানুষকে পানি পান করানো একটি মহৎ মানবিক কাজ। একইভাবে পশু-পাখির প্রতি দয়া করাও প্রশংসনীয়।
একজন তৃষ্ণার্ত মানুষের হাতে এক পেয়ালা পানি তুলে দেওয়া হয়তো আমাদের কাছে ছোট একটি কাজ মনে হতে পারে; কিন্তু তার কাছে এটি হতে পারে বিরাট উপকার।
তাই যেখানে কারও পানি প্রয়োজন, সেখানে সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। এতে মানবিকতা প্রকাশ পায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশা করা যায়।
পানি ও পরিবেশের ভারসাম্য
পানি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নদী, হাওর, বিল, পুকুর ও জলাভূমি অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল। এসব জলাশয় ধ্বংস হলে পরিবেশের ভারসাম্যও নষ্ট হয়।
পানি দূষণের ফলে মানুষ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি মাছ, পাখি, জলজ উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একজন মুসলমান পৃথিবীকে আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে সম্মান করবে। সে নিজের প্রয়োজন পূরণ করবে, কিন্তু অন্যের ক্ষতি করে নয়। তাই পরিবেশ রক্ষা এবং পানির উৎস সংরক্ষণ নৈতিক দায়িত্বের অংশ।
বিজ্ঞান ও ইসলামের দৃষ্টিতে পানি
বিজ্ঞান পানির বৈশিষ্ট্য, জলচক্র, বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ পানি ও জলসম্পদ নিয়ে গবেষণা করে। এসব জ্ঞান মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হতে পারে।
ইসলাম জ্ঞানার্জন ও চিন্তাশীলতার বিরোধী নয়। বরং আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করা মানুষের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
তবে একজন মুমিনের বিশ্বাস হলো—বিজ্ঞান প্রকৃতির নিয়ম ব্যাখ্যা করতে পারে; কিন্তু সেই নিয়মের স্রষ্টা আল্লাহ। প্রযুক্তি পানি উত্তোলনের উপায় তৈরি করতে পারে; কিন্তু পানির সৃষ্টি ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থার চূড়ান্ত মালিক আল্লাহ তাআলা।
সুতরাং বিজ্ঞান ও ঈমানকে পরস্পরের বিরোধী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। প্রকৃতির নিয়ম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন মানুষের জন্য উপকারী, আর সেই নিয়মের স্রষ্টাকে চিনে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া ঈমানের শিক্ষা।
পানির নিয়ামতের প্রতি শুকরিয়া
আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া শুধু মুখে “আলহামদুলিল্লাহ” বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত শুকরিয়া হলো—নিয়ামতকে স্বীকার করা, দাতাকে স্মরণ করা এবং নিয়ামতকে সঠিক কাজে ব্যবহার করা।
আমরা যদি পানি পাই এবং তা অপচয় করি, তবে শুধু মুখে শুকরিয়া প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। পানির সঠিক ব্যবহারও শুকরিয়ার অংশ।
পানি দিয়ে পরিচ্ছন্নতা অর্জন করব, তৃষ্ণা নিবারণ করব, অন্যকে সাহায্য করব, কৃষি ও জীবনের প্রয়োজন পূরণ করব; কিন্তু অহেতুক অপচয় করব না।
মানুষের শক্তির সীমাবদ্ধতা
আধুনিক যুগে মানুষ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে। গভীর নলকূপ, পানি শোধনাগার, সেচব্যবস্থা, পাইপলাইন, বাঁধ ও নানা প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ পানির ব্যবহার সহজ করেছে।
কিন্তু এসব সাফল্য মানুষকে আত্মভোলা বা অহংকারী করে তুলতে পারে না। কারণ মানুষের শক্তি সীমিত। একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দীর্ঘ খরা, ভূগর্ভস্থ পানির সংকট বা কোনো বড় পরিবেশগত পরিবর্তন মানুষের সব পরিকল্পনাকে কঠিন করে দিতে পারে।
সূরা আল-মুলকের এই আয়াত তাই মানুষের সামনে তার সীমাবদ্ধতার বাস্তবতা তুলে ধরে।
মানুষ চেষ্টা করবে—এটি তার কর্তব্য। কিন্তু নিজের ক্ষমতাকে সর্বশক্তিমান মনে করবে না। বরং উপায় অবলম্বনের পাশাপাশি আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে।
তাওয়াক্কুল ও দায়িত্ববোধ
আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়। বরং ইসলামের শিক্ষা হলো—সাধ্যমতো বৈধ উপায় অবলম্বন করা এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।
পানি সংরক্ষণে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সরকার, প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও ব্যক্তি—সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে।
আমরা যদি বলি, “আল্লাহ পানি দেবেন”—এই অজুহাতে পানি অপচয় করি, তবে তা সঠিক তাওয়াক্কুল নয়। বরং আল্লাহর দেওয়া বুদ্ধি ও সামর্থ্য ব্যবহার করে পানির অপচয় রোধ করা এবং পরিবেশ রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য।
এই আয়াত আমাদের কী শেখায়?
সূরা আল-মুলকের ৩০ নম্বর আয়াত থেকে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করতে পারি—
প্রথমত, পানি আল্লাহর মহান নিয়ামত।
দ্বিতীয়ত, মানুষ পানির প্রকৃত স্রষ্টা বা মালিক নয়।
তৃতীয়ত, আল্লাহ তাআলা সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।
চতুর্থত, মানুষের শক্তি সীমিত এবং সে আল্লাহর মুখাপেক্ষী।
পঞ্চমত, নিয়ামত পাওয়ার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিত।
ষষ্ঠত, পানির অপচয় ও অপব্যবহার থেকে বিরত থাকা দরকার।
সপ্তমত, পানির উৎস রক্ষা করা সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
অষ্টমত, আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করলে ঈমান ও কৃতজ্ঞতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
নবমত, মানুষকে অহংকার ত্যাগ করে বিনয়ী হতে হবে।
দশমত, আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি যথাযথ উপায় অবলম্বন করতে হবে।
আমাদের করণীয়
পানির এই মহান নিয়ামতের যথাযথ মর্যাদা দিতে হলে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে কিছু বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।
আমরা অপ্রয়োজনীয়ভাবে পানি ব্যবহার করব না। অজু, গোসল, রান্না ও দৈনন্দিন কাজে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই ব্যবহার করব। পানির কল খোলা রেখে দেব না। পাইপ বা কলের ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত মেরামত করব।
পুকুর, নদী, খাল ও অন্যান্য জলাশয়ে ময়লা-আবর্জনা ফেলব না। শিল্প ও গৃহস্থালির বর্জ্য যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার ব্যাপারে সচেতন হব।
শিশুদের পানির গুরুত্ব বোঝাব। বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, পরিবার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে পানি সংরক্ষণের শিক্ষা ছড়িয়ে দেব।
কারও পানির প্রয়োজন হলে যথাসম্ভব সহযোগিতা করব। মানুষের পাশাপাশি পশু-পাখির জন্যও পানির ব্যবস্থা করার সুযোগ থাকলে তা করব।
সবশেষে মনে রাখব—পানি রক্ষা মানে শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা নয়; বরং আল্লাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামতের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া।
উপসংহার
সূরা আল-মুলকের ৩০ নম্বর আয়াতটি ছোট হলেও এর শিক্ষা অত্যন্ত গভীর ও ব্যাপক। আল্লাহ তাআলা মানুষকে প্রশ্ন করেছেন—যদি তার পানি ভূগর্ভে হারিয়ে যায়, তাহলে কে তাকে প্রবহমান পানি এনে দেবে?
এই প্রশ্ন মানুষের অহংকার ভেঙে দেয় এবং তাকে তার প্রকৃত অবস্থান স্মরণ করিয়ে দেয়। মানুষ যতই জ্ঞানী, শক্তিশালী ও প্রযুক্তিনির্ভর হোক না কেন, সে আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের মুখাপেক্ষী।
পানি আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ। তাই পানির প্রতিটি ফোঁটার মূল্য বুঝতে হবে। আল্লাহর এই নিয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করতে হবে, অপচয় থেকে বাঁচতে হবে, পানির উৎস রক্ষা করতে হবে এবং অন্যের পানির অধিকারকে সম্মান করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, পানির নিয়ামতের মাধ্যমে আমাদের হৃদয়ে তাওহিদের উপলব্ধি জাগ্রত হওয়া উচিত। আমরা বুঝব—সৃষ্টি আল্লাহর, নিয়ামত আল্লাহর, প্রকৃত মালিকানা আল্লাহর এবং সবকিছু তাঁর ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধীন।
তাই পানির প্রতিটি ফোঁটা যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
এ পানি আমার শক্তিতে সৃষ্টি হয়নি,
এ পানি আমার ক্ষমতায় পৃথিবীতে আসেনি;
এটি আমার রবের দান।
অতএব আসুন, আমরা আল্লাহর এই মহান নিয়ামতের মর্যাদা দিই, পানি অপচয় না করি, পানির উৎস রক্ষা করি, তৃষ্ণার্তকে পানি পান করাই এবং আল্লাহর শুকরিয়ায় জীবন সাজাই।
কারণ—
পানি আছে বলেই প্রাণ আছে,
পানি আছে বলেই সবুজ পৃথিবী আছে;
আর পানি যে আমাদের হাতে পৌঁছেছে—
এটি মহান আল্লাহর অশেষ রহমত ও নিয়ামত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের তাঁর নিয়ামত চিনে কৃতজ্ঞ হওয়ার, অপচয় ও অবহেলা থেকে বেঁচে থাকার এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথে জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
১
১ মন্তব্য