Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:৪৫ পূর্বাহ্ণ

"আমাদের পাঠ্যবইগুলো যেন শুধু তথ্যের বোঝা না হয়, বরং তা যেন শিক্ষার্থীর কৌতূহল ও চিন্তাশক্তিকে জাগিয়ে তোলে।" — আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ

"আমাদের পাঠ্যবইগুলো যেন শুধু তথ্যের বোঝা না হয়, বরং তা যেন শিক্ষার্থীর কৌতূহল ও চিন্তাশক্তিকে জাগিয়ে তোলে।"আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ


আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের এই উক্তিটি তাঁর শিক্ষা-দর্শনের কেন্দ্রীয় ভাবনা প্রতিফলিত করে। যদিও সঠিক শব্দে এই উক্তিটি তাঁর কোনো নির্দিষ্ট বই বা সাক্ষাৎকারে খুঁজে পাওয়া যায়নি, তবুও এটি তাঁর দীর্ঘদিনের চিন্তা ও কর্মের সারাংশ। তিনি সবসময় বলেছেন—পাঠ্যবই শুধু তথ্যের ভারে ভরা হলে শিক্ষার্থীর মন সঙ্কুচিত হয়ে যায়; বরং বই ও শিক্ষা এমন হওয়া উচিত যা কৌতূহল জাগায়, চিন্তাশক্তি বাড়ায় এবং মানুষকে “আলোকিত” করে তোলে।

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ কে?

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ (জন্ম: ২৫ জুলাই ১৯৩৯) বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, টিভি উপস্থাপক ও সমাজকর্মী। তিনি ঢাকা কলেজে বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। ১৯৭৮ সালে তিনি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ছিল পাঠ্যবইয়ের বাইরে সাহিত্য ও মানবিক বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, যাতে তরুণরা কৌতূহলী, চিন্তাশীল ও মানবিক হয়ে ওঠে।

তিনি ২০০৪ সালে র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেয়েছেন (সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সৃজনশীল যোগাযোগের জন্য), ২০০৫ সালে একুশে পদক এবং ২০১১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৫০-এর বেশি।

উক্তিটির অর্থ ও প্রেক্ষাপট

সায়ীদ স্যারের মতে:

  • পাঠ্যবই প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা যদি শুধু তথ্য মুখস্থ করানোর যন্ত্র হয়ে ওঠে, তবে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তি মরে যায়।
  • শিক্ষার আসল কাজ হলো শিক্ষার্থীর ভেতর কৌতূহল জাগানো এবং চিন্তাশক্তি বিকশিত করা।
  • তিনি প্রায়ই উপমা দিতেন: পৃথিবী শুধু শক্ত মাটি নয়—তার উপরে বিশাল ফাঁকা আকাশও আছে। আকাশটাকে মাটি দিয়ে ভরে দিলে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। তেমনি জীবনেও কল্পনা, সাহিত্য ও চিন্তার ফাঁকা জায়গা দরকার। না হলে প্রকৃত বিকাশ হয় না।

তিনি দেখেছেন, অনেক স্কুলে শুধু পাঠ্যবই পড়ানো হয় এবং বাইরের বইকে “পড়া নষ্ট” বলে উপেক্ষা করা হয়। এজন্য তিনি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মাধ্যমে স্কুল-কলেজে বইপড়া কর্মসূচি চালু করেন। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বছরে ১৬-২৫টি বাছাই করা সাহিত্য ও মানবিক বই পড়ানো হয়। পরে সরকারও এই ধারার পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচিতে সহযোগিতা করেছে।

তাঁর শিক্ষা-দর্শনের মূল বিষয়গুলো

  • আলোকিত মানুষ চাই: শুধু ডিগ্রিধারী নয়, এমন মানুষ চাই যারা বই পড়ে নিজেদের চিন্তা-চেতনা সমৃদ্ধ করে, অন্যের দুঃখ বোঝে এবং সমাজকে এগিয়ে নেয়।
  • বই হলো চিন্তানির্ভর মাধ্যম। যারা বই পড়ে, তারাই পৃথিবী পরিবর্তন করে—যত কম সংখ্যায়ই হোক।
  • পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস ও বিশ্বসাহিত্য পড়তে হবে। এতে কৌতূহল জাগে এবং সমালোচনামূলক চিন্তা গড়ে ওঠে।
  • তিনি বারবার বলেছেন—বইয়ের পেছনে বিনিয়োগ না করলে জাতির চিন্তায় স্বচ্ছতা আসবে না।

এই উক্তিটি তাই শুধু একটি সুন্দর বাক্য নয়—এটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যা (মুখস্থ-নির্ভরতা) ও তার সমাধানের পথনির্দেশ। সায়ীদ স্যারের পুরো জীবনই এই আদর্শ বাস্তবায়নের সংগ্রাম। তাঁর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র আজ লাখো শিক্ষার্থীর মধ্যে বইপড়ার অভ্যাস গড়ে তুলেছে এবং অনেককেই “আলোকিত” করেছে।

মন্তব্য করুন