সহকারী শিক্ষক
০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:০২ পূর্বাহ্ণ
তেঞ্জিং-হিলারি বিমানবন্দর বা লুকলা বিমানবন্দর
নেপালের উঁচু পর্বতাঞ্চলে, প্রায় ২,৮৪৫ মিটার উচ্চতায় এমন একটি বিমানবন্দর রয়েছে যার রানওয়ে দেখে মনে হয় পৃথিবীর একবারে শেষ সীমান্তে গিয়ে শেষ হয়েছে।
এটি তেঞ্জিং-হিলারি বিমানবন্দর, যা সংক্ষেপে লুকলা বিমানবন্দর নামে বেশি পরিচিত। এটি ছোট একটি পাহাড়ি বিমানঘাঁটি, যা মাউন্ট এভারেস্টে যাওয়ার অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে।
১৯৬৪ সালে এর উদ্ভোদন হয়েছিল, যখন এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছানো নিশ্চিত হওয়া প্রথম পর্বতারোহীদের একজন, স্যার এডমন্ড হিলারি, 'হিমালয়ান ট্রাস্ট'-এর মাধ্যমে এই বিমানবন্দরটি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন। তাঁর মূল লক্ষ্য কেবল পর্যটকদের এভারেস্টে নিয়ে আসা ছিল না। দুর্গম খুম্বু অঞ্চলে গড়ে ওঠা বিদ্যালয় ও হাসপাতালগুলোতে খাবার, সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় ঔষধ পৌঁছানো সহজ করতেই এই বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। লুকলা বিমানবন্দর তৈরির আগে কাঠমান্ডু থেকে মালামাল ও রসদ নিয়ে পায়ে হেঁটে পৌঁছাতে তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় লাগত।
সেখানে একটি বিমানবন্দর তৈরি করা সাধারণ কোনো বিষয় ছিল না।
হিলারি সমতল কৃষিজমিতে রানওয়ে তৈরির আশা করেছিলেন, কিন্তু স্থানীয় কৃষকরা তাদের জমি দিতে রাজি হননি। অবশেষে, স্থানীয় শেরপাদের কাছ থেকে জমি কেনা হয় এবং বর্তমানে যেখানে বিমানবন্দরটি অবস্থিত, সেই পাহাড়ি জায়গায় নির্মাণকাজ স্থানান্তরিত হয়। সে সময়ে খুব সীমিত সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রানওয়েটি তৈরি করা হয়েছিল।
এর ফলে এমন একটি রানওয়ে তৈরি হলো যা অন্য যেকোনো বিমানবন্দরের চেয়ে আলাদা।
বর্তমানে এর অ্যাসফল্ট রানওয়েটি মাত্র ৫২৭ মিটার লম্বা এবং এর ঊর্ধ্বমুখী ঢাল প্রায় ১১.৭ শতাংশ। রানওয়ের এক প্রান্তে পাহাড় খাড়াভাবে উঠে গেছে, অন্যদিকে অন্য প্রান্তটি গড়িয়ে পড়েছে একটি গভীর উপত্যকার দিকে। সাধারণ নিয়মে বিমানে অবতরণ বা অবতরণের পর দীর্ঘ পথ গড়িয়ে থামার মতো কোনো জায়গা এখানে নেই বললেই চলে।
আবহাওয়া পরিস্থিতিকে আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তোলে।
লুকলা হিমালয়ের গভীরে অবস্থিত, যেখানে দ্রুত মেঘ জমতে পারে, দৃশ্যমানতা হুট করে বদলে যেতে পারে এবং তীব্র বাতাস ও বৃষ্টি বিমানের ফ্লাইট ব্যাহত করতে পারে। একই দিনে কাঠমান্ডুর আবহাওয়ার সাথে এখানকার অবস্থার সম্পূর্ণ পার্থক্য থাকতে পারে। তাই ফ্লাইটগুলো মূলত দিনের আলো এবং অনুকূল আবহাওয়াতেই পরিচালিত হয়।
বৈমানিকদের জন্য লুকলা আর দশটি সাধারণ বিমানবন্দরের মতো নয়। বিমানগুলোকে সাধারণত অল্প দূরত্বের মধ্যে উড্ডয়ন ও অবতরণে পারদর্শী হতে হয় এবং এখানকার চরম ভৌগোলিক অবস্থার কারণে সামান্য ভুল করারও কোনো সুযোগ থাকে না।
তা সত্ত্বেও প্রতিদিন ছোট উড়োজাহাজ এবং হেলিকপ্টারগুলো ট্রেকার, স্থানীয় বাসিন্দা, কর্মী, খাবার এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে খুম্বু অঞ্চলে যাতায়াত করে।
এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের দিকে যাওয়া হাজার হাজার মানুষের জন্য লুকলাই হলো সেই জায়গা, যেখান থেকে আসল যাত্রা শুরু হয়।
২০০১ সালে রানওয়েটি অবশেষে পাকা করা হয়।
২০০৮ সালে কিংবদন্তি এভারেস্ট বিজয়ী তেঞ্জিং নরগে শেরপা এবং স্যার এডমন্ড হিলারির সম্মানে বিমানবন্দরটির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবর্তন করে 'তেঞ্জিং-হিলারি বিমানবন্দর' রাখা হয়।
আজও লুকলা নেপালের অন্যতম ব্যস্ত পাহাড়ি বিমানবন্দর এবং হিমালয় অঞ্চলের অন্যতম সুপরিচিত এভিয়েশন ল্যান্ডমার্ক হিসেবে টিকে রয়েছে।
পাহাড় জয় করার জন্য এটি কখনো তৈরি করা হয়নি।
এটি তৈরি করা হয়েছিল পাহাড়কে মানুষের নাগালের মধ্যে আনার জন্য।
১
১ মন্তব্য