সহকারী শিক্ষক
০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৮:২৫ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
মায়ের প্রাপ্য পেনশনের টাকা তুলতেও যখন ঘুষ দিতে হয়, তখন ১৭ বছরের এক কিশোর কী করতে পারে?সে প্রতিবাদে রাস্তায় নামেনি। কাউকে গা'লিও দেয়নি।
সে বসে গেল কম্পিউটারের সামনে।
মাত্র ২ ঘণ্টায় বানিয়ে ফেলল একটি ওয়েবসাইট!
নাম দিল ‘ঘুষ ডট সাইট’।
যেখানে মানুষ নিজের পরিচয় গোপন রেখে জানাতে পারছে, কোথায় কত ঘুষ চাওয়া হয়েছে।
গল্পটা ময়মনসিংহের ১৭ বছর বয়সী শাহেদ শরীফ আহমেদের।
শাহেদের মা আমিনা খাতুন ছিলেন একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা।
১৩ বছর চাকরি করার পর ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর তিনি মা*রা যান। মায়ের মৃ/ত্যুর পর পরিবারের পাওনা ছিল প্রায় ৭ লাখ টাকা প্রভিডেন্ট ফান্ড।
কিন্তু সেই টাকা তুলতে গিয়ে পরিবারের অভিযোগ, একের পর এক দপ্তরে ঘুরতে হয়েছে এবং দিতে হয়েছে মোট ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ।
ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার।
জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার।
একবার ভাবুন...
একজন মানুষ সারাজীবন সরকারি চাকরি করলেন।
মাসে মাসে নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালন করলেন।
তার মৃ/ত্যুর পর পরিবারের যে টাকা আইনগতভাবে পাওয়ার কথা, সেটাও পেতে যদি ঘুষ দিতে হয়।
তাহলে একটা সন্তানের মনে ক্ষোভ তৈরি হওয়ার জন্য এর চেয়ে বড় কারণ আর কী হতে পারে?
শাহেদের নিজের অভিজ্ঞতাও ছিল।
দেড় বছর আগে ও লেভেল পরীক্ষার জন্য পাসপোর্ট করতে গিয়ে তার অভিযোগ, ফাইল আটকে রেখে তার কাছ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছিল। আর টাকা দেওয়ার মাত্র ৩ ঘণ্টার মধ্যেই কাজ হয়ে যায়!
তখন থেকেই হয়তো প্রশ্নটা মাথায় ঘুরছিল। “মানুষকে তার ন্যায্য সেবা পেতে টাকা দিতে হবে কেন?” শাহেদ কোডিং শিখছিল।
ওয়েবসাইট বানানোর প্রতি আগ্রহ ছিল।
একদিন একটি বিদেশি ওয়েবসাইট দেখে তার মাথায় আসে নতুন আইডিয়া। মানুষ যদি নিজের পরিচয় প্রকাশ না করেও ঘুষের অভিজ্ঞতা জানাতে পারে, তাহলে দেশের কোথায় কী ধরনের দুর্নীতি হচ্ছে, তার একটা চিত্র তৈরি করা সম্ভব।
তারপর? মাত্র দুই ঘণ্টার কোডিং!
তৈরি হলো ‘ঘুষ ডট সাইট’-এর প্রাথমিক কাঠামো।
পরে বন্ধু ও সহপ্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবিরের সহযোগিতায় সাইটটি আরও এগিয়ে যায়।
২১ আগস্ট সাইটটি লাইভ হওয়ার পর যা ঘটল, সেটা হয়তো শাহেদ নিজেও ভাবেনি।
মাত্র ৯ দিনের মধ্যে জমা পড়ে প্রায় ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ!
অভিযোগগুলোতে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ আনুমানিক ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একজন ১৭ বছরের কিশোরের তৈরি একটি প্ল্যাটফর্মে মাত্র কয়েক দিনে এত অভিযোগ!
সংখ্যাটা শুধু অবাক করার মতো নয়,
এটা আমাদের সমাজের একটা ভয়ংকর বাস্তবতাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
তবে অভিযোগ মানেই সত্য প্রমাণিত নয়।
তাই শাহেদদের প্ল্যাটফর্মে সব অভিযোগ সরাসরি প্রকাশ করা হচ্ছে না। অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য একটি পর্যালোচনা দল কাজ করছে এবং যাচাইয়ের পর তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে।
অভিযোগকারীর পরিচয়ও গোপন রাখা হচ্ছে। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে যেন কেউ আবার নতুন বিপদে না পড়েন।
শাহেদের স্বপ্নটাও ছোট নয়। সে চায় এমন একটা ব্যবস্থা তৈরি করতে, যেখানে মানুষ বুঝতে পারবে কোথায় কী ধরনের হয়রানি হচ্ছে, কোথায় অনিয়মের অভিযোগ উঠছে এবং সরকারি সেবার ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
আর তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন?
ঘুষের পরিমাণ শূন্যে নামিয়ে আনা।
ভাবুন তো...
কোনো বড় অফিস নেই।
কোনো বিশাল বাজেট নেই।
কোনো সরকারি ক্ষমতা নেই।
আছে শুধু একটা কম্পিউটার, কিছু কোডিং জ্ঞান আর নিজের জীবনে দেখা অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটা প্রশ্ন।
“আমার অধিকার পেতে আমাকে ঘুষ দিতে হবে কেন?”
এই প্রশ্নটাই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ পরিবর্তন সবসময় বড় পদ, বড় প্রতিষ্ঠান কিংবা কোটি টাকার বাজেট থেকে আসে না।
কখনো কখনো একটা অন্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় একটা আইডিয়া।
কখনো একটা আইডিয়া হয়ে যায় একটা প্ল্যাটফর্ম। আর কখনো মাত্র ১৭ বছরের একজন কিশোরের দুই ঘণ্টার কোডিং হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে দাঁড়ায়।
শাহেদের এই উদ্যোগের সফলতা কামনা করি।
তবে সবচেয়ে বেশি চাই, একদিন যেন ‘ঘুষ ডট সাইট’-এর প্রয়োজনই না থাকে।
সেদিনই সত্যিকারের জয় হবে।
সংগৃহীত
১৪
২১ মন্তব্য