Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:১৫ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের সংবিধান, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
বাংলাদেশের সংবিধান, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক মোড় পরিবর্তনের ইতিহাসে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। বাংলাদেশের ষষ্ঠ প্রধান বিচারপতি হওয়ার পাশাপাশি দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব সামলানো এই আইনবিদ কেবল আইনি কাঠামোর ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
সাহাবুদ্দীন আহমেদের জন্ম ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার পেমই গ্রামে। পিতা তালুকদার রেসাত আহমেদ ভূঁইয়া ছিলেন স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিত এক সমাজসেবী। শৈশবে নান্দাইলে বোনের বাড়িতে বেড়ে ওঠার সময় পরিবার থেকে পাওয়া সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ তাঁর পরবর্তী জীবনের নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
পড়াশোনায় তাঁর মেধার ছাপ দেখা যায় শুরু থেকেই। ১৯৪৫ সালে নান্দাইলের চন্ডীপাশা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৪৮ সালে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫১ সালে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) এবং ১৯৫২ সালে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৪ সালে তৎকালীন সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (সিএসপি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে লাহোর সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেন, এবং পরবর্তীতে জনপ্রশাসনে উচ্চতর শিক্ষা নিতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যান।
সরকারি জীবনের শুরুটা তাঁর হয়েছিল প্রশাসন ক্যাডারে। গোপালগঞ্জ ও নাটোরের মহকুমা কর্মকর্তা (এসডিও) এবং সহকারী জেলা প্রশাসক হিসেবে কাজ করার পর ১৯৬০ সালে তিনি বিচার বিভাগে স্থানান্তরিত হন। এই সিদ্ধান্তই মূলত তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়।
ঢাকা ও বরিশালে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং পরবর্তীতে কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে বিচারিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ১৯৬৭ সালে তাঁকে ঢাকা হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা উচ্চতর বিচার বিভাগে তাঁর অবস্থানের সূচনা ঘটায়।
স্বাধীনতার পর, ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি সাহাবুদ্দীন আহমেদ হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক পদে নিযুক্ত হন। ১৯৭৩-৭৪ মেয়াদে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান পদেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এরপর ১৯৮০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হন।
আইনবিদ হিসেবে তাঁর দেওয়া বেশ কিছু রায় বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসে দূরদর্শী হিসেবে গণ্য হয়। বিশেষ করে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী মামলায় তাঁর ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ শাসনতান্ত্রিক বিবর্তনে বড় ধাক্কা দিয়েছিল। সেখানে তিনি নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় অসংগত হস্তক্ষেপ এবং তৃতীয় বিশ্বের স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন।
এছাড়া ১৯৮৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রহত্যার ঘটনায় তদন্ত কমিশনের প্রধান হলেও সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়নি। আবার ১৯৮৪ সালে জাতীয় বেতন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি যে সুপারিশমালা জমা দেন, তার ভিত্তিতেই নতুন বেতন কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল।
১৯৯০ সালের ১৪ জানুয়ারি দেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন সাহাবুদ্দীন আহমেদ। কিন্তু একই বছরের শেষভাগে রাজনৈতিক চিত্র দ্রুত বদলাতে থাকে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটলে এমন একজন নিরপেক্ষ মানুষের প্রয়োজন দেখা দেয়, যিনি দেশের প্রথম অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারেন।
প্রধান বিরোধী দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক গভীর রাজনৈতিক অনাস্থা থাকা সত্ত্বেও সাহাবুদ্দীন আহমেদের নামেই শেষ পর্যন্ত দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছায়। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেন।
১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁরই অধীনে দেশ পায় এক গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন। এই সংক্ষিপ্ত মেয়াদে তিনি বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ বেশ কিছু কালো আইন সংশোধন করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছিলেন। নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর, ১৯৯১ সালের ১০ অক্টোবর তিনি আবার তাঁর মূল পদ অর্থাৎ প্রধান বিচারপতির আসনে ফিরে যান এবং ১৯৯৫ সালে অবসর নেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২৩ জুলাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাহাবুদ্দীন আহমেদ দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ৯ অক্টোবর শপথ নেন। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও, তাঁর অবস্থান ছিল আপসহীন ও নীতিভিত্তিক।
আইন ও সংবিধানকে অক্ষুণ্ন রেখে কাজ করতে গিয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সাথে একাধিক ক্ষেত্রে তাঁর মতপার্থক্য তৈরি হয়। বিতর্কিত 'জননিরাপত্তা আইন'-এ স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানানো ছিল এমনই এক সাহসী উদাহরণ। সরকারি প্রভাবের বাইরে অবস্থান নিয়ে নিরপেক্ষতা রক্ষা করতে গিয়ে রাজনৈতিক মহলের অসন্তোষের মুখেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে। ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর তিনি তাঁর মেয়াদ শেষ করেন।
রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিদায় নেওয়ার পর তিনি দীর্ঘ সময় গুলশানের বাসায় একদম নির্জন জীবন কাটিয়েছেন। গণমাধ্যমের আলো থেকে দূরে থাকা সাহাবুদ্দীন আহমেদ কোভিড মহামারী চলাকালে আরও অন্তরালে চলে যান।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি পাঁচ সন্তানের জনক ছিলেন। ২০১৮ সালে তাঁর সহধর্মিণী বেগম আনোয়ারা সাহাবুদ্দীন মারা যান। এর আগে ২০০৫ সালে তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা অধ্যাপক ড. সিতারা পারভীন যুক্তরাষ্ট্রে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।
২০২২ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯২ বছর বয়সে এই প্রবীণ বিচারক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বনানী কবরস্থানে স্ত্রীর কবরের পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদের অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য এক নজির হয়ে আছে।
মন্তব্য করুন

ব্লগ