প্রভাষক
০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০২:৪২ অপরাহ্ণ
পদ্মবিলে শরতের অমল আমন্ত্রণ
বর্ষার প্রচ্ছদ পেরিয়ে যখন রূপসী বাংলার আকাশে শরতের অমল ধবল মেঘের খেয়া ভেসে বেড়ায়, তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উত্তর-পূব সীমান্তের এক অখ্যাত জলাশয় রূপ নেয় কোনো এক অলৌকিক চিত্রপটে। চোখের সীমানা ছাড়িয়ে যেখানেই দৃষ্টি যায়, শুধুই সবুজের সমারোহ আর তার বুক চিরে উঁকি দেওয়া অজস্র অমলিন পদ্ম। প্রভাত ও গৌধুলীর স্নিগ্ধ রোদ যখন কালচে জলের বুকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন হাজার হাজার গোলাপি ও শ্বেতপদ্ম শিশিরবিন্দু ধারণ করে যেন প্রকৃতির এক অনুপম রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করে।
আখাউড়ার সীমানা ঘেঁষা ঘাঘুটিয়া ও মিনারকুটের এই জলাভূমি এখন আর কেবল জলের আধার নয়, রূপসী বাংলার এক প্রাণবন্ত কাব্যগ্রন্থ।
প্রতি শরতেই প্রাকৃতিকভাবেই এই বিলে ফুটে ওঠে শত শত পদ্ম। সাম্প্রতিককালে রূপপিপাসু পথিক ও আলোকচিত্রীদের কল্যাণে এ যেন এক জনাকীর্ণ স্বর্গে পরিণত হয়েছে। ভোর হতে না হতেই বিলের শান্ত জলরাশি জেগে ওঠে গুঞ্জন আর মুগ্ধতার গুঞ্জরণে। পলিমাটির সুবাস, জলজ উদ্ভিদের তীব্র আকুলতা আর পদ্মের মৌ মৌ গন্ধ মিলেমিশে বাতাসকে করে তোলে সুবাসিত। সুদূর দিগন্ত থেকে ভেসে আসা বালিহাঁস, পানকৌড়ি আর গাঙচিলের কিচিরমিচির সেই সৌন্দর্যকে দেয় এক অনন্য ছন্দ ও সুর।
ভোরের প্রথম আলো থেকে গৌধুলী লগ্ন পর্যন্ত ফুটতেই বিলের ঘাটে বাঁধা ডিঙ্গি নৌকাগুলো রূপসী কূলের পানে ছুটে চলে। মেহগনি বা সাল কাঠের নৌকায় বসে যখন কেউ বিলের বুক চিরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, তখন মনে হয় যেন তিনি ভেসে যাচ্ছেন সময়ের কোনো অচিন মায়াপুরে। জলের সমতলে মাথা তুলে থাকা এক একটি পদ্মফুল যেন এক একটি রহস্যময় রোমাঞ্চ। কোনোটি সবেমাত্র কলি মেলে হাসছে, কোনোটি আবার পূর্ণাঙ্গ পাপড়ি মেলে সূর্যের প্রথম রশ্মিকে আলিঙ্গন করছে। কাঁচের মতো স্বচ্ছ জলে তরুণ পদ্মের প্রতিবিম্ব দেখে মনে হয়, আকাশের মেঘ আর মাটির জল একাকার হয়ে গেছে এক অলৌকিক মায়াজালে।
শহরের যান্ত্রিক কোলাহল, ইট-কাঠের নির্জীব চার দেওয়াল আর ব্যস্ততার আত্মাহুতি থেকে মুক্তি পেতে হাজারো গৃহকাতর মানুষ ছুটে আসেন এই নিভৃত স্বর্গে। তারা জলের ছোঁয়া নেন, পদ্মের পাপড়ির কোমলতায় খুঁজে পান আত্মিক শান্তি। কেউবা নিঃশব্দে অনুভূতির ছবি আঁকেন মনের ক্যানভাসে, কেউবা ক্যামেরার লেন্সে বন্দী করেন ক্ষণিকের অমরত্ব। তরুণদের কোলাহল, প্রবীণদের মুগ্ধ নিঃশ্বাস আর শিশুদের কলকাকলিতে শান্ত জলধি হয়ে ওঠে মুখরিত।
ঢাকার গুলশান থেকে আসা মো. নুরুজ্জামান নামে একজন বলেন, এখানকার পরিবেশটি খুব কোমল। আমার পরিবারের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ঢাকায় বসবাস করি সেখানে এক ধরনের চিড়িয়াখানার মতো থাকি। এখানে এসে খুব ভালো লাগছে, পদ্মবিলে নৌকা নিয়ে গিয়েছি মনে শান্তি লাগছে।
ঢাকার বনস্রী থেকে আসা শাহিদা বেগম বলেন, এই পরিবেশে এত মুগ্ধ যা বলে বুঝানো যাবে না৷ তিনি আরও এই পদ্মবিলে জীবনে প্রথমবার আসলাম ঘুরে দেখলাম অনেক ভালো লেগেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা তাসমিয়া আক্তার বলেন, এখানে এত ভালো লেগেছে, বাড়িতে যাওয়ার মন মানছে না। পরিবেশটা মুগ্ধ ছড়িয়ে রেখেছে।
প্রকৃতির এই রূপবদল শুধু যে কাব্যিক তৃষ্ণা মেটায় তা নয়, স্থানীয় জনজীবনের ক্যানভাসেও এঁকে দেয় এক টুকরো সচ্ছলতার হাসি। যে মাঝিরা বর্ষার জল নেমে গেলে কর্মহীনতায় ভোগেন, এই পদ্ম-মৌসুমে তাদের হাতে ওঠে বৈঠা। মৃদু ঢেউয়ের তালে তালে দর্শনার্থীদের বিলের গহীনে নিয়ে গিয়ে তারা উপার্জন করেন দু-মুঠো অন্ন।
পদ্মবিলের মাঝি মো. শাহআলম মিয়া বলেন এই পদ্মবিলের কারণে আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো উপার্জন হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ আসে। আমি দৈণিক ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা উপার্জন করতে পারি।
আরেক মাঝি বিল্লাল হোসেন বলেন, পর্যটক এখন প্রতিদিন আসতেছে নৌকা নিয়ে তাদের পদ্ম ফুলের মাঝে নিয়ে যায় তারা অনেক আনন্দ করে। তাদের এই আনন্দ দেখে অনেক ভালো লাগে। তিনি আরও বলেন, এই পদ্মবিলের কারণে বর্ষার মৌসুমে আমরা বেকার অবস্থায় থাকতাম। এখন আর অবসর থাকতে হচ্ছে না এই বিলের কারণে।
তবে এই অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে এক আকুল মিনতি। মানুষের অবাধ পদচারণায় অহেতুক ফুল ছিঁড়ে ফেলার উন্মাদনা বিলের স্বকীয়তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। প্রকৃতির এই অবিনাশী সৌন্দর্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন দায়িত্বশীল আচরণ ও সচেতনতা।
পরিবেশ ও নদী সুরক্ষাবিষয়ক সংগঠন তরী বাংলাদেশের আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, শত শত বছর ধরে প্রকৃতি নিজের নিয়মে এই বিলকে সাজিয়েছে। অযথা ছবি তোলার জন্য বা সাময়িক আনন্দের বশে পদ্মফুল, পদ্মাকাঁট বা ফুলগাছ উপড়ে ফেলবেন না। আপনার ছেঁড়া একটি ফুল বিলের প্রজনন প্রক্রিয়া এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে ব্যাহত করে। তিনি আরও বলেন পদ্মবিল অসংখ্য দেশি ও অতিথি পাখির বিচরণক্ষেত্র। শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশ বজায় রাখুন।
স্থানীয় মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দীপক চৌধুরী এই পদ্মবিল কেন্দ্রিক সম্ভাবনা ও সার্বিক পরিবেশ রক্ষা নিয়ে বলেন আমাদের মনিয়ন্দ ইউনিয়নের এই সীমান্তঘেঁষা বিলটি প্রকৃতি এক অপূর্ব সাজে সাজিয়েছে। শত শত মানুষ প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে এখানে আসছেন, যা আমাদের পুরো এলাকার জন্য আনন্দের ও গর্বের বিষয়। আমরা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে এলাকার পরিবেশ রক্ষা ও দর্শনার্থীদের সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে নজর দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। দর্শনার্থীদের সুরক্ষায় এবং তারা যেন নির্বিঘ্নে এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন, সেজন্য স্থানীয়ভাবে আমরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছি।
আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তাপসী রাবেয়া বলেন, পদ্মবিলটি আখাউড়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এলাকাটিকে পরিবেশবান্ধব ও পর্যটনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও বিরল বাস্তুতন্ত্র যেন কোনোভাবেই বিনষ্ট না হয়, সেদিকে আমরা কঠোর নজরদারি রাখছি।
সবুজের বুকে গোলাপি পদ্মের এই রূপকথা শুধুই এক নৈসর্গিক দৃশ্য নয়, বরং প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক অস্তিত্বের এক মায়াবী সেতু। স্থানীয় প্রশাসনের সদিচ্ছা, পরিবেশপ্রেমীদের সচেতনতা আর দর্শনার্থীদের দায়িত্বশীল আচরণ যদি এক সুতোয় গাঁথা যায়, তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই পদ্মবিল কেবল শরতের ক্ষণস্থায়ী স্বর্গ হয়ে থাকবে না—হয়ে উঠবে প্রকৃতির এক চিরন্তন উদ্যান। গোধূলির আলোয় শান্ত জলের বুকে হেলে পড়া পদ্মগুলো যেন নিঃশব্দে বলে যায়, প্রকৃতিকে ভালোবেসে বাঁচিয়ে রাখলেই মানুষ খুঁজে পাবে তার কাঙ্ক্ষিত প্রশান্তি।
১
১ মন্তব্য