Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৫:৪২ অপরাহ্ণ

তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বদলে যাচ্ছে হিমালয়ের ভূপ্রকৃতি

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ২। ভূমিকম্পের থেকে কোনো অংশে কম নয়! তবে প্রাকৃতিক ভূমিকম্পের কারণে এই ভূমিধস নয়। বরং ধসের কারণে ভূমির কম্পন অনুভূত হয়েছে। প্রলংয়কারী এই আকস্মিক বন্যায় নেপালজুড়ে অকল্পনীয় প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। ৭ শতাধিক মানুষের মৃত্যু, ২ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ, বিদেশি পর্যটকদের খোঁজ না পাওয়া, সড়ক ও সেতু ব্যবস্থা ভেঙে পড়া, লাখ লাখ বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষ, বিপর্যস্ত পর্যটন কেন্দ্র- এসব চিত্র শুধু নেপালকে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। তাই হিমালয়ের ভূপ্রাকৃতিক গঠন ও এর ভবিষ্যৎ বার্তা বিষয়ে এখনই সতর্ক না হলে অদূর ভবিষ্যতে নেপাল-ভারত-বাংলাদেশ ও পুরো হিমালয় অঞ্চলের কোটি কোটি নদী অববাহিকাবেষ্টিত মানুষের আকস্মিক বন্যার সম্মুখীন হতে হবে!বিশেষজ্ঞদের অভিমত, হিমবাহ ধসের মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন ও পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি। তীব্র গরমে হিমাবাহের উপরিভাগ গলে পানি বরফের ফাটল দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। ফলে অনেক বড় হিমবাহ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। নেপালের আকস্মিক বন্যা মূলত হিমালয়ের হিমবাহ গলে সৃষ্ট দুর্যোগ। নেপালের ভূতাত্বিক গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হিমালয়ের ফল্টলাইনের ওপর নেপাল অবস্থিত? ভূমিকম্প, ভূমিধস ও বর্ষা মৌসুমে নদনদীর পানি বৃদ্ধি বারবার নেপালকে বিপর্যস্ত করেছে। ২০১৫ বিধ্বংসী ভূমিকম্পে সবচেয়ে খারাপভাবে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় নেপাল। সেখান থেকে ঘুরে না দাঁড়াতেই আবারও এই সংকট। আকস্মিক ধেয়ে আসা বরফগলা পানি আর পাথরের মিশ্রণ নদীর গতিপথ কিছু সময়ের জন্য আটকে দেয়। অতঃপর সেই আটকে থাকা পানি প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ আকস্মিক পাহাড়ি সুনামি তৈরি করে। গবেষণা বলছে, হিন্দুকুশ হিমালয়ের তাপমাত্রা দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে হিমবাহের আস্তরণ ও পর্বতের ঢাল তার নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। মেরু অঞ্চলের বাইরে সবচেয়ে বেশি বরফ ও তুষার জমা আছে হিমালয় পর্বতমালায়। তথ্য বলছে, ৬৩ হাজারের বেশি হিমবাহ রয়েছে এই পর্বতমালায়, যা এশিয়ার প্রধান ১০টি নদী ও বহু শাখা-উপনদী সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। এসব নদনদী মূলত নদী অববাহিকার কোটি কোটি মানুষের খাদ্য, পানি, জলবিদ্যুৎ ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখছে। বলা হচ্ছে, হিমালয়ের বুকেই লুকিয়ে আছে বিপদ! গবেষণায় শুধু হিমাচলেই ৬৭টি ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ-হ্রদ চিহ্নিত করা হয়েছে। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, হিমালয় পর্বতমালায় ৫ থেকে ৬ হাজার উঁচুতে প্রায় ৭৮ শতাংশ হিমবাহ উষ্ণায়নের ঝুঁকিতে। দ্বিগুণ গতিতে গলতে শুরু করেছে হিমালয়ের কিছু কিছু হিমবাহ। নিকট অতীতে ২০২৪ সাল ছিল পৃথিবীর উষ্ণতম বছর। ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে হিমালয়ের হিমবাহ থেকে বছরে প্রায় ২৬০ গিগাটনের বেশি বরফ গলছে। বিজ্ঞানীদের সতর্ক বার্তা জানান দিচ্ছে, চলতি শতাব্দীতে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা যদি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখা সম্ভবও হয়, তবুও এই সময়ের মধ্যে আ্যান্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ড বাদে অন্যান্য অংশে জমে থাকা হিমবাহ ও তুষারকণার ৫০ শতাংশের বিলুপ্ত ঘটতে পারে। কার্বন নির্গমণ ও অন্যান্য গ্রীনহাউস গ্যাসের হারের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের চেয়ে প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে! এসব বার্তা আগামী দিনগুলোতে হিমালয়ের অগণিত হিমবাহ গলে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করে-এতে কোনো সন্দেহ নেই। হিমালয়ের আশপাশের অনেক জনবসতিপূর্ণ এলাকা ইতিমধ্যে বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। নেপালের এই আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় আশপাশে নদী অববাহিকাপূর্ণ জনবসতির জন্য বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার হিমালয়সৃষ্ট নদী বসতি ও জীবন-জীবিকার জন্য জরুরি সতর্ক বার্তা। আরও বেশি সতর্ক হওয়া উচিত হিমালয়ের কাছের জনগণ ও সরকারগুলোর। নেপালের এই ঘটনা হয়তো মানবিক দিক দিয়ে কাম্য হতে পারে না; কিন্তু একটু একটু করে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হিসাব করলে দেখা যাবে এমন ঘটনা মোটেও অস্বাভাবিক নয়! আগামীতে পরিস্থিতি হয়তো আরও খারাপ হতে পারে! 

হিমবাহের বিপর্যয়ের পর নতুন বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে ভূমিধসের কারণে তৈরি হওয়া হ্রদের পানি বৃদ্ধি। ভূমিধসে নেমে আসা পাথর, কাদা, বরফ ও ধ্বংসাবশেষ জমে নদীর প্রবাহ আটকে যাওয়ায় এই হ্রদ তৈরি হয়েছে। জমতে থাকা পানি বৃদ্ধি পেয়ে পানি উপচে বাঁধের মতো অংশ ভেঙে আবার বিপুল পরিমাণ পানি নেমে আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। নেপালের এই আকস্মিক বন্যা পার্শ্ববর্তী ভারতেও ঝুঁকি তৈরি করেছে। গঙ্গা হয়ে ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে পদ্মায়ও এই বরফগলা পানি যে প্রবেশ করবে না- এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না! ভাঁটির দেশ বাংলাদেশও ভূপ্রাকৃতিক কারণে নানা দিক দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

নেপালের পর্যটন খাত যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যা পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে আবার ধস নামিয়ে দিল! নেপালের পর্যটন খাতের তথ্য অনুযায়ী, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) পর্যটন খাতের অবদান প্রায় ৭ শতাংশ। পর্যটন খাত নেপালের প্রান্তিক ও পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। হিমালয় অঞ্চলে ছোটবড় বহু হ্রদ রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত কারণে হ্রদ উপচে আকস্মিক বন্যার শঙ্কা আগামী দিনগুলোতে বৃদ্ধি পাবে! বিশেষজ্ঞদের তথ্য বলছে, দ্রুত বরফ গলার কারণে নেপালের বিভিন্ন অংশে ৪০টির বেশি ছোটবড় হ্রদ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব হ্রদের বেশিরভাগই এভারেস্ট অঞ্চলে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বরফগলা পানি হ্রদে জমা হচ্ছে। একসময় এসব হ্রদের আকার বড় হয়ে দুর্বল বাঁধ ভেঙে আবারও আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে! বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণে নেপালের অবদান শূন্য দশমিক ১ শতাংশের কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের দিক দিয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। নেপালের এই হিমবাহ ধসের ঘটনা আমাদের এটা মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়। প্রকৃতির শক্তি মুহূর্তের মধ্যে সাজানো পৃথিবী এলোমেলো করে দিতে পারে। হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর নীতিনির্ধারকদের নতুন করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করার নেটওয়ার্ক তৈরির সময় এসেছে। হিমবাহ হ্রদের ঝুঁকি হ্রাসে সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি এবং সেটি হতে হবে আসন্ন বিপর্যয় আসার আগেই।

মন্তব্য করুন

ব্লগ