সহকারী শিক্ষক
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:৩৩ অপরাহ্ণ
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্যে পরিবেশপাঠ
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর মাদারীপুর জেলার কালকিনি থানার মাইজপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন (বর্তমান এটি বাংলাদেশের অন্তর্গত)। কবির জন্ম বাংলাদেশে হলেও তিনি বড় হয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। তিনি বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে দুই বাংলায় সমান জনপ্রিয় একজন প্রথিতযশা বাঙালি সাহিত্যিক। এই ভারতীয় সাহিত্যিক একাধারে সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক, কবি, ছোটগল্পকার, সম্পাদক ও কলামিস্ট। বাংলা সাহিত্যকে তিনি দু’হাত ভরে দিয়েছেন। কবির সাহিত্যিক ছদ্মনাম নীললোহিত। ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁর তুমুল খ্যাতি হলেও কবির শুরুটা হয়েছিল কবিতা দিয়েই। তিনি মজা মজা করতে কবিতা লেখা শুরু করেন। কবি মুষ্টিমেয় পাঠকদের জন্য কবিতা লেখেননি। তাঁর কবিতা ছিল সর্বজনের চলার পথের সঙ্গী। তাই পাঠকমন হঠাৎ-ই বলে ওঠে- ‘কেউ কথা রাখেনি, - - -’। কবি প্রকৃতি প্রেমে মুগ্ধ হয়েছেন। প্রকৃতি দারুণভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে তাঁর কবিতায়।
কবি সবসময় লিখতে চেয়েছেন পাহাড়, অরণ্য আর সমুদ্র নিয়ে। কবি ‘পাহাড় চূড়ায়’ কবিতায় লিখেছেন- ‘অনেকদিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার শখ|/কিন্তু পাহাড় কে বিক্রি করে তা জানি না।. . .।’ ‘স্থির সত্য’ কবিতায় কবি প্রকৃতি ও প্রেমকে একাকার করে ফেলেছেন। তিনি নদীর কিনারায় হাঁটতে চেয়েছেন। জোৎস্নায় ভেসে বেড়াতে চেয়েছেন। কবির ভাষায়: ‘বহুদিন আকাশ ভাসানো জ্যোৎস্নায়/হেঁটে যাইনি/নদীর কিনারায়/একটি ঘাসফুল ছিঁড়ে নিয়ে ছুঁড়ে দেইনি স্রোতে/. . . ঘাসফুলটি হাওয়ায় দুলছে প্রতীক্ষায়।’ কবি প্রকৃতিকে দেখার আহ্বান করেছেন। ‘দেখা’ কবিতায় কবি প্রকৃতিতে দেখেছেন এভাবে: ‘ভালো আছো?/- দেখো মেঘ বৃষ্টি আসবে| . . ./-তুমি প্রকৃতিকে দেখো|/-তুমি প্রকৃতি আড়াল করে দাঁড়িয়ে রয়েছো।’ এক জীবনে কবি অনেক কিছু হতে চেয়েছেন। শামুকের মতো ঘরবাড়ি পিঠে নিয়ে ঘুরতে চেয়েছেন| বৃক্ষের মাঝে আশ্রয় খুঁজেছেন। ‘এক জীবনে’ কবিতায় কবি বলতে চেয়েছেন-
‘শামুকের মতো আমি ঘরবাড়ি পিঠে নিয়ে ঘুরি/এই দুনিয়ায় আমি পেয়ে গেছি অনন্ত আশ্রয়/এই রৌদ্র বৃষ্টি, এই শতদল বৃক্ষের সংসার/ . . .।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্যে প্রকৃতি-চেতনা এসেছে ভিন্ন আঙ্গিকে। আধুনিক অর্থে পরিবেশ-রক্ষা বা দূষণ-সচেতনতার মতো কোনো দর্শন তাঁর লেখায় কমই পাওয়া যায়| তাঁর প্রকৃতি-চেতনা জন্ম নিয়েছে আবেগ আর স্মৃতি থেকে| এর শিকড় লুকিয়ে আছে তাঁর নিজের জীবনে। জন্ম মাদারীপুরের আমগ্রামে, পদ্মার কাছাকাছি এক গ্রামে। কিন্তু মাত্র চার বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। বাকি জীবন কাটে সেই শহরেই। তাই গ্রাম আর নদীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘ সম্পর্কের নয়। এটা বরং একরকম ভুলে-যাওয়া, নস্টালজিক টান। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার চেয়ে হারানোর বোধ থেকেই এটা বেশি ˆতরি হয়েছে। এই হারানোর বোধ তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে। ‘মনে পড়ে যায়’ কবিতায় লেখার সারমর্ম বেশ চমকপ্রদ। একসময়ের নদী শুকিয়ে গেছে, মরে গিয়ে ভূত হয়ে গেছে। আগাছাভরা মাঠও হারিয়ে গেছে জনারণ্যের ভিড়ে। এখানে প্রকৃতি শুধু প্রেমের রূপক নয়। এটা সরাসরি একটা শোক-চিত্র-শহর যেভাবে গ্রামকে গিলে খেয়েছে, তারই ছবি। এর উৎস তাঁর নিজের ছেলেবেলার হারানো গ্রাম, পদ্মাপাড়ের স্মৃতি| নীরা-বিষয়ক কবিতাগুলোতেও নদী, মেঘ, বৃষ্টি বারবার আসে। কিন্তু সেখানে প্রকৃতি মানুষের প্রেম আর বিষাদের ভাষা হয়ে ওঠে। প্রকৃতি সেখানে স্বতন্ত্র বিষয় নয়!
কবির গদ্যে পরিবেশ চেতনা আরো স্পষ্ট রূপ পায় অপূর্ব মহিমায়। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ উপন্যাসে চার শহুরে তরুণ জঙ্গলে যায়। এটা আসলে সভ্যতা আর প্রকৃতির মুখোমুখি দাঁড় করানো| বনের নির্জনতার সামনে শহরের কৃত্রিমতা আর ভণ্ডামি ফিকে হয়ে যায়। এখানেই তাঁর প্রকৃতি-চেতনার আসল লক্ষ্য বোঝা যায়। প্রকৃতি এখানে মানুষকে নিজের সত্যের মুখোমুখি করার একটা আয়না| ‘সেই সময়’, ‘প্রথম আলো’র মতো ঐতিহাসিক উপন্যাসেও বাংলার নদী, গ্রাম, ঋতু এসেছে। কিন্তু সেখানেও এগুলো পটভূমি, ইতিহাসকে জীবন্ত করার একটা উপায়। সব মিলিয়ে বলা যায়, সুনীলের প্রকৃতি-চেতনা ছিল নান্দনিক আর স্মৃতিতাড়িত| এটা মানুষকেন্দ্রিক এক চেতনা, সরাসরি পরিবেশ বাঁচানোর ডাক নয়! নিজের হারানো শিকড়ের বেদনা থেকে জন্ম নিয়ে এটা হয়ে উঠেছে নাগরিক জীবনের বিপরীতে দাঁড় করানো একটা আয়না।
কবি ‘ঘর’ কবিতায় প্রকৃতির সান্নিধ্যে সবসময় থাকতে চেয়েছেন| স্বপ্ন দেখেছেন প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়ার। কবির ভাষায়- ‘পাহাড় সমুদ্র আর অরণ্যের স্তব লিখে লিখে/ক্লান্ত এক কবি আজ ঘুমিয়েছে একলা ছোট ঘরে, . . . ।’ কবির বহু কবিতায় এসেছে নীরার কথা। নীরা, প্রকৃতি ও প্রেম যেন এক সূতোয় গেঁথেছেন। কবির একটি বিখ্যাত কবিতা ‘গহন অরণ্যে’। এ কবিতায় কবি গহন অরণ্যে একা যেতে চাননি। কবির ভাষায়- ‘গহন অরণ্যে আর বারবার একা যেতে সাধ হয় না-/ শুকনো পাতার ভাঙা নিঃশ্বাসের মতো শব্দ/ তরুলতা, বাঁশের ছায়া, শালের বল্লরী।’ কবির সম্পদনা করা- ‘মেঘ বৃষ্টি আলো’, ‘ময়ূর পাহাড়’, ‘প্রবাসী পাখি’, ‘সমুদ্রতীরে’, ‘জোছনাকুমারী’, ‘বসন্ত দিনের খেলা’, ‘দুই বসন্ত’, ‘সমুদ্রের সামনে’, ‘একটি মেয়ে অনেক পাখি’, ‘নদীর পাড়ে খেলা’, ‘বসন্ত দিনের ডাক’সহ বহু লেখায় ঘুরেফিরে এসেছে প্রকৃতি ও প্রেমের প্রসঙ্গ। ২৩ অক্টোবর ২০১২ সালে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা কবি মৃত্যুবরণ করেন। জন্মদিনে কবির প্রতি রহলো শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।
১৪
২১ মন্তব্য