Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:১৯ অপরাহ্ণ

নক্ষত্রমালায় রবের মহিমা (সূরা আল-মুলক : ৫-এর আলোকে) - মোঃ মুজিবুর রহমান

                                                                    নক্ষত্রমালায় রবের মহিমা

(সূরা আল-মুলক : -এর আলোকে)

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক

মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর

নিশীথ রাতে নীল আকাশে, জ্বলে কত যে তারা,
নীরব বুকে আলোর মেলাঅপরূপ সে ধারা।
অন্ধকারে প্রদীপ জ্বেলে, হাসে নক্ষত্রমালা,
স্রষ্টার কুদরত ঘোষণা করেমহিমাময় জ্বালা।

নিকট আকাশ সাজিয়ে দিলেন, প্রদীপমালার আলো,
রবের সৃষ্টি কত যে সুন্দর, কত অপরূপ ভালো!
কে সাজাল এই নীল গগন, কে দিল তার জ্যোতি?
কে রাখিল শৃঙ্খলায় সবকে মহান সে জ্যোতি?

আল্লাহ তিনিসৃষ্টির রব, বিশ্বজগতের মালিক,
তাঁরই হুকুমে চলে ধরিত্রী, আকাশ, গ্রহ-নক্ষত্র সবই।
তাঁর ইশারায় রাত নামে, তাঁর ইশারায় ভোর,
তাঁরই কুদরতে বিশ্বজুড়ে সৃষ্টি অপরিসীম ঘোর।

ওয়ালাকাদ যায়্যন্নাস-সামাআদ্দুনিয়া বিমাসাবীহা”—
নিকট আকাশ সাজিয়েছেন প্রদীপমালার শোভা।
সুবহানাল্লাহ! কী অপূর্ব রবের সৃষ্টির মেলা,
তারার মাঝে লেখা যেন তাঁর কুদরতের খেলা।

আকাশ যেন বিশাল ক্যানভাস, তারা যেন দীপ,
নীরব রাতে জ্বলে তারা, আলো করে ক্ষীণ-দীপ্ত।
চাঁদের পাশে তারার হাসি, মুগ্ধ করে প্রাণ,
দেখে মুমিন বলে ওঠে—“মহান আমার রহমান!

সৃষ্টির মাঝে সৌন্দর্য যত, সবই তাঁরই দান,
তাঁর কুদরত চিনতে শেখায় আকাশের এই গান।
ফুলের ঘ্রাণ, নদীর কলতান, সাগরেরই ঢেউ,
সবকিছুতে রবের নিদর্শনতাঁর সমতুল্য কেউ?

মানুষ যত জ্ঞানী হোক না, যতই বাড়ুক জ্ঞান,
রবের সৃষ্টির সামনে তার জ্ঞান বড়ই সামান্য জ্ঞান।
মহাকাশের সীমা মাপতে যতই করুক সাধ,
স্রষ্টার জ্ঞানের সামনে মানুষ ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্রবাদ।

তাই তো কুরআন দৃষ্টি মেলে আকাশ দেখতে বলে,
চিন্তা করতে বলে মানুষ সৃষ্টির গভীর তলে।
আকাশ-পৃথিবী, রাত-দিবসসবই তাঁর নিদর্শন,
যে হৃদয়ে ঈমান জাগে, তারই হয় দর্শন।

নক্ষত্র শুধু সৌন্দর্যের অলংকার নয়,
রবের হুকুমে মানুষের পথের দিশাও হয়।
অন্ধকারে পথিক যখন হারায় দিকের জ্ঞান,
তারার আলো পথ দেখাতে করে সহায় দান।

স্থলভাগে আর সাগরপথে পথিক দিক নির্ণয় করে,
রবের দেওয়া নিদর্শন ধরে গন্তব্যের দিকে চলে।
যে নক্ষত্র দেখে মানুষ বলে—“কী অপূর্ব আলো!
সেই নক্ষত্র স্রষ্টার কুদরত স্মরণ করায় ভালো।

তবে মুমিন নক্ষত্র দেখে ভাগ্য গণনা করে না,
তারকার কাছে মঙ্গল চেয়ে মাথা কখনো নোয়ায় না।
ভবিষ্যতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই অধীন,
তাঁরই হাতে গায়েবের জ্ঞানতিনি পরম আমীন।

তারার মাঝে ভাগ্য খোঁজা মুমিনের কাজ নয়,
গণক-জ্যোতিষীর কথায় ঈমান কখনো ক্ষয় নয়।
রবের ওপর ভরসা রেখে চলবে সোজা পথে,
তাওয়াক্কুলের দীপ জ্বলবে অন্তরেরই রথে।

আকাশ যেমন শোভিত হলো আলোর মধুর মালায়,
তেমনি হে মুমিন, জীবন সাজাও ঈমানেরই আলোয়।
বাহিরে যদি তারার জ্যোতি রাতকে করে ভোর,
অন্তরে কুরআনের আলো দূর করুক আঁধার ঘোর।

আয়াতটির আরেক শিক্ষা গভীর, ভয়ংকর সত্য
শয়তানেরা চায় শুনতে গোপন খবরের তথ্য।
আসমানি ব্যবস্থায় আছে প্রহরী কঠোর পাহারা,
আল্লাহর হুকুমে চলে সেই নিরাপত্তার ধারা।

ওয়া জাআলনাহা রুজূমাল্লিশ-শায়াতীন”—
শয়তানদের তাড়ানোর ব্যবস্থা করেছেন আমীন।
আল্লাহ যাকে যেভাবে চান, সেভাবেই দেন রক্ষা,
তাঁর হুকুমের বাইরে কারও নেই কোনো ক্ষমতা।

শয়তান মানুষের শত্রুকুরআন দিল ঘোষণা,
তার কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচাই মুমিনের সাধনা।
পাপকে সে সুন্দর করে, সত্যকে করে দূর,
মনের মাঝে ঢেলে দেয় সে সন্দেহেরই সুর।

কখনো বলে—“পরে তওবা, এখন করো পাপ,”
কখনো বলে—“ছোট তো এটাই, কী হবে এতে শাস্তি-তাপ?”
কখনো বলে—“নামাজ পরে, আগে দুনিয়ার কাজ,”
এভাবেই সে ধীরে ধীরে ভাঙে ঈমানের সাজ।

কখনো রাগে আগুন জ্বালে, কখনো দেয় অহংকার,
কখনো হিংসা, কখনো লোভবাড়ায় অন্তর-ভার।
কখনো মানুষে মানুষে সৃষ্টি করে বিভেদ,
কখনো মিথ্যা কথা বলে বাড়িয়ে দেয় বিবাদ-ভেদ।

তাই শয়তানকে চিনে নাও, তার পথ থেকে ফেরো,
আল্লাহরই আশ্রয় নিয়ে ঈমান শক্ত করে ধরো।
যিকির দিয়ে অন্তর জাগাও, কুরআন দিয়ে প্রাণ,
সালাত দিয়ে রবের কাছে চাও নিরাপদ স্থান।

তাকওয়ার ঢাল হাতে নিয়ে চলবে সোজা পথে,
তাওবার পানি ঢেলে দেবে পাপের কালো ক্ষতে।
ইস্তিগফারের অশ্রু ঝরুক নির্জন রাতের কোলে,
রবের রহমত হৃদয় ভরুক দোয়ার মধুর বলে।

যখন শয়তান কুমন্ত্রণা দেয়, রবকে স্মরণ করো,
ভুলের পথে পা বাড়ালে সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এসো।
যে হৃদয়ে আল্লাহর স্মরণ, সে হৃদয় জাগ্রত থাকে,
শয়তানের কুমন্ত্রণা এলে সত্যপথ চিনে রাখে।

শয়তানের শক্তি সীমিতরবের বান্দা ভয় পেও না,
আল্লাহর অনুমতি ছাড়া সে কোনো ক্ষতি করতে পারে না।
তবে তার ফাঁদকে হালকা ভেবে অবহেলা কোরো না,
নিজের নফসের দুর্বলতাকেও কখনো ভুলে যেয়ো না।

কুরআনের পথে দৃঢ় থেকো, সুন্নাহ আঁকড়ে ধরো,
হালাল-হারাম বুঝে নিয়ে জীবনটাকে গড়ো।
সত্য কথা বলো সর্বদা, আমানত রেখো ঠিক,
অন্যায় থেকে দূরে থেকোতবেই জীবন হবে দীপ্ত।

শুধু আকাশ দেখলেই হবে না, শিক্ষা নিতে হবে,
রবের সৃষ্টি দেখে বান্দা রবের পথে রবে।
তারার আলো চোখে পড়ে, ঈমান জ্বালো বুকে,
স্রষ্টার স্মরণ রাখো সদা দুনিয়ার সব সুখে।

এই আয়াতের শেষে আছে সতর্কতার বাণী,
অবাধ্যতার পরিণতি যে কত ভয়ংকর জানি।
ওয়া তাদনা লাহুম আযাবাস্-সাঈর”—
জ্বলন্ত আগুন প্রস্তুত আছে অবাধ্যদের তরে।

শয়তানের জন্য রয়েছে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি,
অবাধ্যতার পথের শেষে নেই কোনো সত্যিকারের শান্তি।
তাই মানুষ! শয়তানের পথে পা বাড়িও না আর,
দুনিয়ার ক্ষণিক সুখের জন্য হারিয়ো না আখিরাতের পার।

জীবন তো ক্ষণিকের সফর, মৃত্যু অনিবার্য,
আজ যে শক্তিমান মানুষ, কাল সে হবে নশ্বর।
ধন-সম্পদ, মান-মর্যাদা থাকবে না চিরকাল,
সঙ্গে যাবে ঈমান-আমলসেটাই হবে সম্বল।

আজকে যদি পাপের পথে হৃদয় যায় ভেসে,
আগামীকাল ফিরবে কি নাকে জানে অবশেষে?
তাই এখনই তওবা করো, এখনই হও সতর্ক,
রবের দিকে ফিরে এসো, অন্তর করো পবিত্র।

আল্লাহর রহমত সীমাহীনহতাশ হয়ো না,
পাপ করেছি বলে তাঁর দয়া থেকে দূরে যেয়ো না।
সত্য তওবা করলে বান্দা রবের রহমত পায়,
আল্লাহর দিকে ফিরে এলে পথের আলো জ্বলে যায়।

যে আকাশে তারার মেলা, সে আকাশও ক্ষণস্থায়ী,
চিরস্থায়ী একমাত্র আল্লাহতিনি অবিনশ্বর, অক্ষয়ী।
দুনিয়ার সব সৌন্দর্য একদিন যাবে মুছে,
আখিরাতের চিরজীবন অপেক্ষা করে পিছুপিছু।

তাই হে মানুষ, নীল আকাশে তাকিয়ে একবার ভাবো,
কে দিয়েছেন আলো? তাঁকেই হৃদয়ের মাঝে চাও।
কে সাজিয়েছেন নক্ষত্রমালা? তাঁকেই করো স্মরণ,
তাঁরই নামে জীবন সাজাও, তাঁরই পথে চলন।

নক্ষত্র বলে—“রব মহান, রাত বলে—“তিনি আছেন,
সৃষ্টির প্রতিটি নিদর্শন তাঁর কুদরত প্রকাশে হাসে।
বাতাস বলে তাঁর হুকুমে, সাগর বলে তাঁর নাম,
পাহাড়, নদী, বন-বনানীসবই তাঁরই দান।

কী অপূর্ব এই সৃষ্টি, কী মহিমাময় রব!
তাঁরই দয়া, তাঁরই হুকুমে সৃষ্টি পায় সব।
তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই এই জগতে,
তাঁরই ইবাদত হবে শুধু অন্তরের সত্য পথে।

না কোনো নক্ষত্র উপাস্য, না কোনো গ্রহ-তারা,
না কোনো মানুষ, না কোনো শক্তিরবের সমকক্ষ ধারা।
সিজদা শুধু আল্লাহর জন্য, দোয়াও তাঁরই কাছে,
তাওহিদের এই নির্মল আলো মুমিনের হৃদয়ে নাচে।

রাতের আকাশ দেখলে যেন বাড়ে ঈমান-নূর,
শয়তানের সব কুমন্ত্রণা হোক অন্তর থেকে দূর।
কুরআনের আলো হাতে নিয়ে চলি সত্যপথে,
রবের ভয়ে, রবের প্রেমে, রবেরই আনুগত্যে।

হে আল্লাহ! নক্ষত্রমালায় যে মহিমা দেখিয়েছ,
সেই মহিমার শিক্ষা নিয়ে জীবন সাজাতে দাও।
শয়তানের সব প্ররোচনা থেকে আমাদের রাখো দূরে,
ঈমানের আলো জ্বেলে দাও হৃদয়ের অন্তঃপুরে।

হে রব! আমাদের চোখে দাও সৃষ্টির গভীর জ্ঞান,
সৃষ্টির মাঝে যেন দেখি তোমার কুদরত মহান।
জ্ঞান যেন অহংকার না হয়, হোক ঈমানের আলো,
তোমার ভয়ে সৎ হই, তোমার ভালোবাসায় ভালো।

হে রব! আমাদের জবান রাখো সত্যের কথায়,
হৃদয় রাখো তোমার স্মরণে, হাত রাখো সৎ কাজে।
শয়তানের পথ ছেড়ে দাও হেদায়াতের আলো,
দুনিয়া আখিরাতে করো আমাদের জীবন ভালো।

নক্ষত্রমালা সাক্ষী হোকরবের কুদরত মহান,
আকাশজুড়ে লেখা থাক তাঁরই মহিমাগান।
যে হৃদয়ে তাওহিদ জাগে, সে হৃদয় হোক নূর,
আল্লাহর আনুগত্যে কাটুক জীবনপাপ হোক দূর।

দুনিয়ার এই ক্ষণিক জীবন শেষ হবে একদিন,
রবের কাছে ফিরতে হবে সত্য চিরদিন।
তাই আজই আমল গড়ি, আজই করি তওবা,
রবের পথে ফিরে এসে চাই তাঁরই রেজা।

আকাশভরা তারার মেলা ক্ষণিকেরই সাজ,
আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়াই জীবনের আসল কাজ।
নক্ষত্রমালা রাত সাজায়, কুরআন সাজায় প্রাণ,
তাওহিদের আলোয় গড়ি আমাদের জীবন মহান।

নিকট আকাশ প্রদীপমালারবের কুদরতের গান,
শয়তানের ফাঁদ থেকে বাঁচিধরি কুরআন-ঈমান।
জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে চাই পরিত্রাণ,
আল্লাহর পথে জীবন কাটুকএই হোক অঙ্গীকার মহান।

সুবহানাল্লাহ! রব মহানসৃষ্টিতে তাঁর নিদর্শন,
তাঁরই নামে জাগুক হৃদয়, তাঁরই পথে হোক জীবন।
নক্ষত্রমালা দেখিয়ে যেন হৃদয় বলে বারবার
আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তিনিই রব, তিনিই অধিকার!

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ