Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:৪৯ পূর্বাহ্ণ

শ্রীহট্টের তৃতীয় শাসনকর্তা(কানুনগো)


ফৌজদার নবাব ইউসুফ খাঁন

(জন্মঃ ১৪৯৮ সন - মৃত‍্যুঃ ১৫৪১ সন)


শ্রীহট্টের বীরশ্রী-মাইডিহি-বর্তমান সিলেট বড়শালা অঞ্চলটিসহ শহরের সদর গড়দোয়ার মজুমদার বাড়ী তথা বৃহত্তর মজুমদারী শ্রীহট্টের অংশ ছিল।

বাংলার বারো-ভুঁইয়াদের অন্যতম শ্রীহট্টের প্রথম শাসনকর্তা রাজা সর্বানন্দা দত্ত চৌধুরী

(সনাতনী হিন্দু নাম) ওরফে 

ফৌজদার নবাব সারওয়ার খাঁন (মুসলিম নাম) তাঁর একমাত্র মুসলিম পূত্র শ্রীহট্টের দ্বিতীয় শাসনকর্তা ফৌজদার নবাব মীর খাঁন ১৫২৫ সনের মাঝামাঝিতে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় অচল হয়ে গেলে তাঁর জ‍্যৈষ্ঠ‍্য পূত্র ইউসুফ খাঁন পিতার আসনে আসীন হন। 

ইউসুফ খাঁন ২৩ জুন, ১৪৯৮ সনে পিতা 

ফৌজদার নবাব মীর খাঁনের শ্রীহট্ট শহরের রাজবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন।

পারিবারিক প্রথা অনুসারে ইউসুফ খাঁনকে গৃহশিক্ষকের কাছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাগ্রহণ শেষ হলে তাঁকে সামরিক প্রশিক্ষণের জন‍্য বাংলার সুলতানের প্রশিক্ষণ শিক্ষাকেন্দ্র একটি দূর্গে প্রেরণ করা হয়। 

কঠোর অনুশীলন, অধ্যবসায় ও সামরিক প্রশিক্ষণের দক্ষতা অর্জন করে ইউসুফ খাঁন শ্রীহট্টে ফিরে আসেন। 

সামরিক প্রশিক্ষণ শিক্ষাকেন্দ্রে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণকালে 

ইউসুফ খাঁনের সহপাঠী ছিলেন 

বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (শাসনকাল ১৪৯৩-১৫১৯ সন) এর জ্যেষ্ঠ শাহজাদা নাসিরুদ্দিন নুসরত শাহ। দীর্ঘ প্রশিক্ষণকালে তাঁদের মধ্যে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের বন্ধন গড়ে উঠেছিল।  

ফৌজদার নবাব ইউসুফ খাঁন তাঁর শাসনামলে (১৫২৫-১৫৪১ সন) যখন তিনি শ্রীহট্টের শাসনকর্তার আসনে আসীন তখন বাংলার মসনদে আসীন সুলতান নাসিরুদ্দিন নুসরত শাহ (শাসনকাল ১৫১৯-১৫৩৩ সন) 

সেই অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের সুবাদে ফৌজদার নবাব ইউসুফ খাঁন শ্রীহট্টের সার্বিক উন্নয়নে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করতে পেরেছিলেন। 

বাংলার সুলতান নাসিরুদ্দিন নুসরত শাহের শাসনকালের শেষ আমলে এবং সুলতানের আন্তরিক বদ‍ান‍্যতায় ১৫৩২ সনে ফৌজদার নবাব ইউসুফ খাঁন তাঁর নিজবাড়ীর সম্মুখে একটি নান্দনিক সুরম্য মসজিদ নির্মাণ করেন।


শ্রীহট্টের তৃতীয় ফৌজদার নবাব 

ইউসুফ খাঁন ১৫২৫ সন থেকে ১৫৪১ সন পর্যন্ত একনাগাড়ে দীর্ঘ প্রায় ষোল বছর অতি সুচারুরূপে শ্রীহট্টের শাসনকর্তা হিসেবে শাসনকার্য পরিচালনা করতে পেরেছিলেন। 


দিল্লীর সুলতান শের শাহ সূরী কর্তৃক

(শাসনকাল ১৫৩৯-১৫৪৫ সন) 

ইউসুফ খাঁনকে নবাব উপাধী দিয়ে শ্রীহট্টের শাসনকর্তা তথা ফৌজদার হিসাবে পুনরায় নিয়োগ দেন যা পূর্ববর্তী শাসনকর্তা বা কানুনগো পদের আধুনিকায়ন মাত্র। 

‘ফৌজদার’ পদটি প্রথম মুঘল 

সম্রাট বাবরের সৃষ্ট একটি পদ।

ফৌজদার পদটি একটি সামরিক পদ হলেও প্রয়োজনবোধে সামরিক ফৌজদারদের বিভিন্ন বেসামরিক প্রশাসনিক যেকোনো শাখায় যেকোন সময় শাসনকর্তা বা কানুনগো নিযুক্ত করা হতো। দিল্লীর সুলতান শের শাহ ভারতবর্ষে ব‍্যাপকভাবে এই পদগুলি প্রচলন করেছিলেন।

ভারতবর্ষের বাংলায়ও দিল্লীর সুলতান কর্তৃক একই ধারা প্রচলিত হয়। 

পরবর্তীকালে মুঘল সম্রাটগণও ধারাবাহিকভাবে একই পদ্ধতি চালু রাখেন। মোটকথা, গণ-প্রশাসনিক প্রতিটি শাখায় ফৌজদাররাই শাসনকর্তা বা কানুনগোরাই প্রশাসনিক অঞ্চলের সর্বেসর্বা বা প্রধান নিযুক্ত হতেন।


ভারতবর্ষের মসনদ থেকে আফগান পাঠানদের বিচ‍্যুতি ও বহিরাগত মুঘলদের মসনদলাভে দেশপ্রেমিক বিহারের শাসনকর্তা পাঠান বীরযুদ্ধা শের খান সূরীর প্রচন্ড মনঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। 

দিল্লী মসনদের বহিরাগত প্রথম মুঘল সম্রাট বাবরের মৃত্যুর পর দিল্লীর দ্বিতীয় মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের দূর্বল রাজত্বকালে প্রথমবার ১৫৩৯ সনে চৌসার যুদ্ধে এবং দ্বিতীয়বার ১৫৪০ সনে কনৌজের বিলগ্রামের সফল যুদ্ধে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করে বিহারের শাসনকর্তা পাঠান বীর শের খান সূরী মুঘল সাম্রাজ্যের মসনদ দখল করেন এবং সম্রাট হুমায়ুনকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিতে বাধ‍্য করেন।

সেইসঙ্গে নিজেকে শের খান সূরী থেকে শের শাহ সূরী উপাধিতে ভূষিত করে নিজে ভারতবর্ষের দিল্লীর সুলতান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে দিল্লী সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়ে দিল্লীতে সূরী বংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দিল্লীর মসনদে আসীন হন।

সূরী বংশের প্রতিষ্ঠাতা শের খান সূরী থেকে তিনি দিল্লীর সুলতান শের শাহ সূরী নামে ইতিহাসে পরিচিত হন।

ভারতবর্ষের ইতিহাসে মহান এই সুলতানের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে কারণ ছয় বছর শাসনকালে এত কমসময়ে ভারতবর্ষের সার্বিক উন্নয়নে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল।


দিল্লীর সুলতান শের শাহ সূরী ১৫৩৯ সনে খিজির খান সূরী নামে তাঁরই বংশের 

এক পাঠান সর্দারকে বাংলার প্রাদেশিক শাসকর্তা হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন।

পাঠান সর্দার খিজির খান বছরতিনেক বাংলার শাসনকার্য পরিচালনা করার পর ক্ষমতালোভী হয়ে উঠেছিলেন এবং পরাজিত মুঘলদের সাথে ষড়যন্ত্র করে ১৫৪১ সনে দিল্লির সুলতান শের শাহ সূরীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নিজেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান হিসাবে ঘোষণা করেন। 

এই বিশ্বাসঘাতকতার জবাবে দিল্লীর সুলতান শের শাহ সূরীর অধীনস্থ শ্রীহট্টের ফৌজদার নবাব ইউসুফ খাঁন আঞ্চলিক প্রশাসকদের নিয়ে পাঠান সর্দার খিজির খানে বিরুদ্ধে ১৭ই এপ্রিল, ১৫৪১ সনে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। সেই যুদ্ধে পাঠান সর্দার খিজির খান প্রথমদিকে নাজেহাল হয়ে যান এবং দীর্ঘ তিনদিন বিরতিহীন যুদ্ধের পর ২০শে এপ্রিল আপস-মিমাংসার নামে ছলনার আশ্রয় নিয়ে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন। এই যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ফৌজদার নবাব ইউসুফ খাঁন সরল বিশ্বাসে সেই প্রস্তাবে সম্মত হয়ে যুদ্ধবিরতি মেনে নেন। 

এই সুযোগে ২১শে এপ্রিল, ১৫৪১ সনে বাংলার স্বঘোষিত সুলতান খিজির খান সমরনীতি ভঙ্গ করে হঠাৎ করে গভীর রাতে আক্রমণ চালিয়ে কাপুরুষের মতো পিছন থেকে তীর ছুঁড়ে শ্রীহট্টের তৃতীয় ফৌজদার নবাব ইউসুফ খাঁনকে হত্যা করেন।

এই অনাকাঙ্ক্ষিত অনৈতিক যুদ্ধকাণ্ডে ফৌজদার নবাব ইউসুফ খাঁনের কনিষ্ঠ ভ্রাতা লোদী খাঁন হতবিহ্বল হয়ে ভ্রাতৃহত‍্যার প্রতিশোধ নিতে যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করে দিল্লীর সুলতান শের শাহ সূরীর নিকট গমন করেন এবং অনৈতিক এই যুদ্ধের বিস্তারিত পরিস্থিতি বর্ণনা করেন।

লোদী খাঁনের নিকট এই অনৈতিক যুদ্ধকাণ্ডের বর্ণনা শ্রবণ করে দিল্লীর সুলতান শের শাহ সূরী তাঁর একই বংশীয় বিশ্বাসঘাতক খিজির খান সূরীর উপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে অনতিবিলম্বে দিল্লীর মসনদে কাজী ফজিলত হোসেন নামক এক বুজুর্গ আলেমকে মনোনীত করে তিনি নিজেই লোদী খাঁনসহ 

এক বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করে বাংলা ও বিহার রাজ্যের সীমান্তবর্তী এক দুর্গে অবস্থান নেন।

তারপর লোদী খাঁনকে সেনাপতি নিয়োগ করে একটি সেনাদলকে বাংলা অভিমুখে প্রেরণ করেন। 

লোদী খাঁন ৩রা অগাস্ট, গঙ্গার তীরবর্তী ঐতিহাসিক লক্ষণাবতী বা লখনৌতির বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ জেলার একটি  অঞ্চলে বিশ্বাসঘাতক খিজির খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। মাত্র তিনদিন লোদী খাঁন অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে 

৬ই অগাস্ট, ১৫৪১ সনে বিশ্বাসঘাতক খিজির খানকে পরাজিত করেন এবং তাঁর শিরোচ্ছেদ ঘটিয়ে চরমভাবে ভ্রাতৃহত‍্যার তীব্র প্রতিশোধ নেন।

বিশ্বাসঘাতক খিজির খানের মৃতদেহ বাংলা ও বিহারের সীমান্তবর্তী 

দুর্গে যেখানে দিল্লীর সুলতান শের শাহ সূরী আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন

সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়।


এখানে উল্লেখ্য যে, কোনো কোনো স্বঘোষিত ইতিহাস পন্ডিত গবেষকদের  মতে লোদী খাঁন কর্তৃক দিল্লীর সুলতান শের শাহ সূরীর নিকট বিশ্বাসঘাতক খিজির খানকে জীবিত অবস্থায় বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কিন্তু 

প্রকৃত সত্য এই, লোদী খাঁন ভ্রাতৃহত‍্যার তীব্র জিঘাংসায় এতই উন্মত্ত ছিলেন যে, বিশ্বাসঘাতক খিজির খানকে হাতের কাছে পেয়ে প্রথম সুযোগেই লোদী খাঁন তাঁর তরবারী দিয়ে বিশ্বাসঘাতকের শিরোচ্ছেদ করেন। 

লোদী খাঁন জানতেন চতুর খিজির খান প্রাণে বেঁচে গেলে পালিয়ে যাবে নয়তোবা জীবিত রাখলে সুলতান তাঁর একই বংশীয় পাঠানকে ক্ষমাও করে দিতে পারেন।

বিশ্বাসঘাতক খিজির খানের মৃতদেহ দেখে দিল্লীর সুলতান বরং লোদী খাঁনের উপর অতিশয় প্রীত হন এবং সুলতান সন্তুষ্ট হয়ে লোদী খাঁনকে শ্রীহট্টের চতুর্থ ফৌজদার নবাব হিসেবে শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন এবং উপহার স্বরূপ শ্রীহট্টের বেশ কয়েকটি অতিরিক্ত জায়গীর তাঁকে উপহার দিয়ে সম্মানিত করেন এবং এই যুদ্ধের জন্যে আনা সবগুলো তোপ বা কামান দিল্লীতে ফেরত না নিয়ে প্রতিটি কামান লোদী খাঁনকে উপহার দিয়ে যান।

ফৌজদার নবাব লোদী খাঁনের বড়ভ্রাতা ফৌজদার নবাব ইউসুফ খাঁনের পূত্র 

শামসুদ্দিন খাঁনকেও উত্তর-পূর্ব শ্রীহট্টের ফৌজদার বা সীমান্তরক্ষক নিযুক্ত করেন।


এখানে আরো উল্লেখ্য যে, ফৌজদার নবাব ইউসুফ খানের মৃতদেহকে ২২শে এপ্রিল, ১৫৪১ সনে তাঁর বংশধররা শ্রীহট্টের মাইজডিহি রাজপরিবারের পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

মন্তব্য করুন