Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:৫১ পূর্বাহ্ণ

সুলতান শামস উদ দ্বিন ইলিয়াস শাহ

ইতিহাসে তাকালে শুধুমাত্র একজন ব্যাক্তিকেই বাঙালি জাতির পিতা বলা যায়। যিনি শুধু বাঙালি জাতিকেই ঐক্যবদ্ধ করেন নি,  বাংলা ভাষাকেও রাজকিয় ভাষায় মর্যাদা দিয়েছিলেন। যেটা ঐ সময় কল্পনারও বাহিরে ছিলো এমনকি সেন আমলে স্থানীয় ভাষা নিশিদ্ধ ছিলো।  সুলতান শামস উদ দ্বিন ইলিয়াস শাহ বাঙালি জাতীয়তাবাদের উম্মেষ এবং একটি অভিন্ন বাঙালি জাতিসত্তা গঠনের সুদূরপ্রসারী প্রক্রিয়ার প্রথম এবং অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে তাঁকে গণ্য করা হয়। উনি জাতিতে বাঙালি না হলেও নিজেকে বাঙালি পরিচয় দিতেন, দেশের নামও বাংলা রেখেছেন এবং জাতির নামও বাঙালি দিয়েছেন


তাঁর ক্ষমতায় আরোহণের পূর্বে, বর্তমান বাংলা ভূখণ্ড একক রাজনৈতিক এককের অধীনে ছিল না। এই অঞ্চলের মানুষও নিজেদের বাঙালি বলতো না। এটি লাখোনৌতি, সপ্তগ্রাম এবং সোনারগাঁও নামক তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রধান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা এই ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বিভক্তির কারণে, তখনকার জনসাধারণের মধ্যে একটি অভিন্ন 'বাঙালি' পরিচয় গড়ে ওঠেনি। মানুষ তখন নিজেদের পরিচয় দিতে গিয়ে নিজেদের আঞ্চলিক পরিচয়, যেমন— রাঢ় বা গৌড়ের বাসিন্দা— হিসেবেই চিহ্নিত করত।


এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে যখন ইলিয়াস শাহ ১৩৫২ সালে সোনারগাঁও বিজয় করে সমগ্র বাংলাকে একক সার্বভৌম শাসনের অধীনে নিয়ে আসেন। । কেবল ভূখণ্ড বিজয় নয়, তিনি নিজেকে "শাহ-ই-বাঙ্গালাহ" (বাংলার রাজা) এবং "সুলতান-ই-বাঙ্গালাহ" (বাংলার সুলতান) হিসেবে ঘোষণা করে একটি নতুন রাজনৈতিক ধারণার প্রবর্তন করেন। তাঁর এই পদক্ষেপের গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায় সমসাময়িক দিল্লির ঐতিহাসিক শামস-ই-সিরাজ আফিফের লেখা থেকে। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "তারিখ-ই-ফিরোজশাহী"তে ইলিয়াস শাহের প্রজাদের প্রথমবারের মতো সম্মিলিতভাবে "বাঙালি" বলে সম্বোধন করেন। এর মাধ্যমে, আগে যে জনগণ বহুধাবিভক্ত ছিল, তারা প্রথমবারের মতো একটি নির্দিষ্ট ও অভিন্ন ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক পরিচয় লাভ করল।


ইলিয়াস শাহের এই রাজনৈতিক একক শাসন কেবল সাম্রাজ্য বিস্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি বাংলায় একটি সমৃদ্ধ, সমন্বিত এবং মিশ্র সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাঁর উদারনৈতিক ও সর্বজনীন প্রশাসনিক নীতির ফলে স্থানীয় হিন্দু এবং মুসলিম উভয় জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় একে অপরের কাছাকাছি আসার সুযোগ পায়। এই আন্তঃধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি পরবর্তীতে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অভূতপূর্ব ও অতুলনীয় বিকাশের পথকে প্রশস্ত করে।

মন্তব্য করুন