সহকারী শিক্ষক
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:৫২ পূর্বাহ্ণ
জগতশেঠ পরিবার........
একসময় মুর্শিদাবাদের অর্থব্যবস্থার অন্যতম শক্তি ছিল জগতশেঠ পরিবার। বিপুল সম্পদ, হুন্ডি ব্যবসা, মুদ্রা বিনিময় এবং নবাবি রাজস্ব ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁদের গভীর যোগাযোগ ছিল। মুঘল দরবার থেকে ইউরোপীয় বাণিজ্যিক সংস্থা—অসংখ্য শক্তিশালী পক্ষ তাঁদের আর্থিক পরিষেবার ওপর নির্ভর করত। কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা জড়িয়ে পড়েছিলেন বাংলার রাজনীতিতেও। সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে বিরোধ, মীরজাফরের উত্থান এবং ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ তাঁদের ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দেয়।
যে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে তাঁরা সমর্থন করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে সেই কোম্পানির প্রশাসনিক বিস্তারই তাঁদের পুরনো আর্থিক প্রভাবকে দুর্বল করে দেয়। জগতশেঠদের সম্পদ নিয়ে আজও অসংখ্য অবিশ্বাস্য দাবি শোনা যায়, কিন্তু ইতিহাসের আসল গল্প আরও জটিল। বিপুল অর্থ, রাজনীতি, ক্ষমতার লড়াই এবং শেষ পর্যন্ত পতন—জগতশেঠদের কাহিনি আসলে বাংলার পরিবর্তনশীল ইতিহাসেরই এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
----
আঠারো শতকের বাংলায় এমন এক বণিক-ব্যাংকার পরিবার ছিল, যাদের হাতে শুধু বিপুল অর্থই ছিল না, নবাবি বাংলার অর্থব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশও নির্ভর করত। সেই পরিবারই জগতশেঠ। মুর্শিদাবাদের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তাঁরা ছিলেন বাঙালি জৈন ব্যাংকার পরিবার এবং ‘জগতশেঠ’ ছিল পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্রের বংশানুক্রমিক উপাধি। তবে অন্য ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁদের মূল উৎস রাজস্থানের মারওয়ার অঞ্চলের ওসওয়াল জৈন সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ মুর্শিদাবাদে বসতি গড়ে তাঁরা বাংলার অর্থজগতের অন্যতম শক্তিশালী পরিবারে পরিণত হন।
পরিবারটির উত্থানের শুরু হীরানন্দ সাহুর হাত ধরে। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি পাটনায় ব্যবসা শুরু করেন এবং ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে সম্পদ গড়ে তোলেন। তাঁর পুত্র মানিকচাঁদ পরে ঢাকায় চলে আসেন। তখন ঢাকা ছিল বাংলার রাজধানী এবং মসলিন ও নদীপথের বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মানিকচাঁদের ব্যবসা দ্রুত বিস্তৃত হয়। মুর্শিদ কুলি খান প্রশাসনিক কেন্দ্র ঢাকার বদলে মকসুদাবাদে সরিয়ে আনলে মানিকচাঁদও সেই নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছাকাছি চলে আসেন। পরে মকসুদাবাদই মুর্শিদাবাদ নামে পরিচিত হয়।
এই সময়েই পরিবারটির আর্থিক ক্ষমতা এক নতুন মাত্রা পায়। ফতেহচাঁদ, মানিকচাঁদের উত্তরসূরি, মুঘল দরবারের কাছ থেকে বিশেষ সম্মান লাভ করেন। ১৭২৩ সালে তাঁর সঙ্গে ‘জগতশেঠ’ উপাধিটি স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়। এর অর্থ দাঁড়ায় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বা জগতের ব্যাংকার। মুর্শিদ কুলি খানের রাজস্ব সংস্কারের ফলে বাংলার বিপুল রাজস্ব দিল্লিতে পাঠানোর প্রয়োজন তৈরি হয়েছিল। সেই অর্থ নিরাপদে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠাতে জগতশেঠদের হুন্ডি ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কয়েক কোটি টাকার সম্পদ সরাসরি বহন না করে কাগুজে আর্থিক আদেশের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করা সম্ভব হত।
জগতশেঠদের ক্ষমতা শুধু ঋণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মুর্শিদাবাদের টাঁকশাল ও মুদ্রা ব্যবস্থার সঙ্গেও তাঁদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বাংলায় আসা রুপোর বড় অংশ তাঁরা কিনতেন এবং মুদ্রা তৈরি ও বিনিময়ের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। বড় জমিদারদের রাজস্ব জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁরা জামিনদার হিসেবে কাজ করতেন। ইউরোপীয় বাণিজ্যিক সংস্থাগুলিও তাঁদের কাছ থেকে অর্থ ধার নিত। ১৭১৮ থেকে ১৭৩০ সালের মধ্যে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গড়ে বছরে প্রায় ৪ লক্ষ টাকা তাঁদের কাছ থেকে ঋণ নিত বলে একটি ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ফরাসিদের দেনার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা।
পরিবারটির সম্পদের পরিমাণ নিয়ে বহু কিংবদন্তি তৈরি হয়েছে। কোথাও তাঁদের বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী বলা হয়েছে, কোথাও আধুনিক মূল্যে সম্পদের পরিমাণ কয়েক লক্ষ কোটি টাকা পর্যন্ত হিসাব করা হয়েছে। কিন্তু এই আধুনিক অঙ্কগুলির নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক হিসাব নেই। তাই ৮.৩ লক্ষ কোটি টাকা বা এক লক্ষ কোটি ডলারেরও বেশি সম্পদের দাবি নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। তবে তাঁদের আর্থিক ক্ষমতা যে অসাধারণ ছিল, তার প্রমাণ অন্যত্র স্পষ্ট। ১৭৪২ সালের বর্গি আক্রমণে তাঁদের কাছ থেকে প্রায় ১৪ লক্ষ টাকা লুট হয়েছিল বলে একটি সূত্রে উল্লেখ রয়েছে; বৃহত্তর ক্ষতির হিসাব আবার ২ কোটি টাকারও বেশি বলা হয়েছে।
এই বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত তাঁদের রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে। সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে জগতশেঠদের সম্পর্ক ক্রমে খারাপ হয়। নবাব নিজের ক্ষমতা শক্ত করতে চাইছিলেন, অন্যদিকে জগতশেঠরা তাঁদের আর্থিক প্রভাব ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে আগ্রহী ছিলেন। মীরজাফর, রায় দুর্লভ এবং অন্যান্য অসন্তুষ্ট শক্তির সঙ্গে ইংরেজদের যে ষড়যন্ত্র গড়ে উঠেছিল, জগতশেঠরাও তার অংশ হয়ে ওঠেন। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের পতনের পর মীরজাফর নবাব হন এবং জগতশেঠরা নতুন ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপটি এরপরেই আসে। যে ইংরেজ শক্তিকে তাঁরা নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য সমর্থন করেছিলেন, সেই কোম্পানিই ধীরে ধীরে তাঁদের প্রয়োজন ফুরিয়ে দেয়। ১৭৬৩ সালে মীর কাশিমের হাতে জগতশেঠ পরিবারের মেহতাবচাঁদ ও স্বরূপচাঁদের করুণ মৃত্যু হয়। এরপর ১৭৬৫ সালে কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভ করলে রাজস্ব ও অর্থব্যবস্থার ওপর তাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকে। শেষ বড় আঘাত আসে ১৭৭২ সালে, যখন ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার সরকারি কোষাগার মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় সরিয়ে দেন। এর সঙ্গে মুর্শিদাবাদকেন্দ্রিক জগতশেঠদের পুরনো আর্থিক ক্ষমতার ভিত্তিও দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষ এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পরিবর্তনের ধাক্কায় যে পরিবার একসময় বাংলার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল, তাদের প্রভাব ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে যায়।
১
২ মন্তব্য