সহকারী শিক্ষক
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:২১ পূর্বাহ্ণ
শিক্ষায় শূন্য পাস নয়, শূন্য জবাবদিহিই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা

একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে ঝকঝকে ভবন। সরকারি অর্থে তৈরি হয়েছে শ্রেণিকক্ষ, আছে শিক্ষক-কর্মচারী, আছে অফিস, আছে বিদ্যুৎ, আসবাব ও শিক্ষা উপকরণ। প্রতি বছর শিক্ষার্থী ভর্তি হয়, ক্লাস হয়, বেতন দেওয়া হয়, নানা খাতে অর্থ ব্যয় হয়; কিন্তু বছরের শেষে পরীক্ষার ফলে দেখা গেল, একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি।
তখন প্রশ্ন ওঠে, ব্যর্থ কে? শুধু শিক্ষার্থী? নাকি শিক্ষক? প্রতিষ্ঠানপ্রধান? অভিভাবক? শিক্ষা প্রশাসন? নাকি পুরো ব্যবস্থাপনা?
এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাসের ফল শুধু একটি পরীক্ষার পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি ব্যবস্থার আয়না। আর সেই আয়নায় যদি বারবার একই ব্যর্থতার ছবি দেখা যায়, তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ফল প্রকাশ করা নয়, ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করা এবং দায় নির্ধারণ করা।
শূন্য ফলাফলকে সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখতে হবে: কোনো একটি বছরে একটি প্রতিষ্ঠানের ফল খারাপ হতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া, শিক্ষক সংকট, আর্থ-সামাজিক সমস্যা, দীর্ঘমেয়াদি শিখন ঘাটতি কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি এর কারণ হতে পারে। তাই একটি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী বানানো যুক্তিসংগত নয়।
কিন্তু যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়, শিখন অর্জন অত্যন্ত নিম্নমানের থাকে, শিক্ষক উপস্থিতি ও পাঠদান দুর্বল হয় এবং প্রশাসনিক তদারকি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে, তাহলে সেটিকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যায় না। তখন প্রয়োজন কঠোর মূল্যায়ন।
Md. Rafiqul Islam Talukder
প্রশ্ন করতে হবে, শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নিয়েছেন কি না। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে উপস্থিত ছিল কি না। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়া হয়েছে কি না। প্রতিষ্ঠানপ্রধান একাডেমিক নেতৃত্ব দিয়েছেন কি না। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তা নিয়মিত পরিদর্শন করেছেন কি না। অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না।
কারণ পরীক্ষার ফলাফল হঠাৎ করে তৈরি হয় না। শূন্য পাসের ফলাফল সাধারণত বছরের পর বছর জমে থাকা শিখন ঘাটতির শেষ দৃশ্য।
শুধু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করলেই সমাধান হবে না: শূন্য ফলের প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন—এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে কোনো একটি ফলাফলের পরদিনই প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হবে। বরং একটি তিন স্তরের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
প্রথমত, জরুরি একাডেমিক নিরীক্ষা। কেন শিক্ষার্থীরা ব্যর্থ হলো, তা নিরপেক্ষভাবে খুঁজে বের করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সংস্কার ও পুনরুদ্ধার কর্মসূচি। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিখন ঘাটতি পূরণ, অতিরিক্ত ক্লাস, অভিভাবক সম্পৃক্ততা, প্রতিষ্ঠানপ্রধানের নেতৃত্ব উন্নয়ন এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, ধারাবাহিক অকার্যকারিতার ক্ষেত্রে কঠোর সিদ্ধান্ত। পর্যাপ্ত সহায়তা ও সংস্কারের পরও যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর কার্যত অকার্যকর থাকে, শিক্ষার্থী ধরে রাখতে না পারে এবং শিক্ষার ন্যূনতম মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পুনর্গঠন, একীভূতকরণ কিংবা প্রয়োজন হলে প্রতিষ্ঠান বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
রাষ্ট্রের অর্থ শুধু একটি প্রতিষ্ঠান চালু রাখার জন্য ব্যয় করা হবে, কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীর জীবন বদলাতে পারবে না—এমন ব্যবস্থার যৌক্তিকতা অবশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
শিক্ষায় অপচয় মানে ভবিষ্যতের ওপর অপচয়: শিক্ষায় অর্থ ব্যয় অবশ্যই করতে হবে। বরং মানসম্মত শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগ অপরিহার্য; কিন্তু অর্থ ব্যয় এবং অর্থের সঠিক ব্যবহার এক বিষয় নয়।
ধরা যাক, একটি বিদ্যালয়ের জন্য একটি প্রকল্পে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ হলো। ভবন নির্মাণ হলো, আসবাব কেনা হলো, কম্পিউটার দেওয়া হলো। কাগজে প্রকল্প সফল। কিন্তু কয়েক বছর পর দেখা গেল, কম্পিউটারগুলো ব্যবহার হচ্ছে না, শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান নেই, শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি বাড়ছে এবং ফল ক্রমেই খারাপ হচ্ছে।তাহলে প্রকল্পটি কি সত্যিই সফল?
একটি ভবন দাঁড়িয়ে থাকা উন্নয়নের প্রমাণ হতে পারে না। উন্নয়নের প্রকৃত প্রমাণ হলো শিক্ষার্থীর শেখা, দক্ষতা অর্জন এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠা।
আমাদের শিক্ষা পরিকল্পনায় তাই ব্যয়ের হিসাবের পাশাপাশি ফলের হিসাবও জরুরি। কত টাকা ব্যয় হয়েছে, সেটি যেমন জানতে হবে; তেমনি জানতে হবে সেই টাকার বিনিময়ে শিক্ষার্থীরা কী পেল।
শিক্ষায় দুর্নীতির ক্ষতি অন্য অনেক খাতের চেয়েও ভয়াবহ। কারণ দুর্নীতির ফলে শুধু সরকারি অর্থের ক্ষতি হয় না, শিক্ষার মানও নষ্ট হয়।
নিয়োগে ঘুষ হলে যোগ্যতার পরিবর্তে অর্থ ও প্রভাব প্রাধান্য পায়। বদলি বা পদায়নে অনিয়ম হলে প্রশাসনিক ন্যায়বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষা উপকরণ কেনাকাটায় দুর্নীতি হলে নিম্নমানের সামগ্রী শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছায়। নির্মাণকাজে অনিয়ম হলে কয়েক বছরের মধ্যেই ভবনে ফাটল দেখা দিতে পারে। আর প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ হলে একটি প্রজন্ম তার প্রাপ্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
তাই ঘুষ গ্রহণকারী এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কোনো প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জনস্বার্থ রক্ষার সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ।
অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী বলা যাবে না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনানুগ বিচার; কিন্তু তদন্তের নামে অভিযোগকে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়। অপরাধ প্রমাণিত হলে পদ নয়, আইন কথা বলবে। পরিচয় নয়, প্রমাণ বিবেচিত হবে।
জবাবদিহি শুধু শিক্ষকের জন্য নয়: শিক্ষার দুর্বল ফল দেখলেই অনেক সময় আঙুল ওঠে শিক্ষকের দিকে। শিক্ষক অবশ্যই দায়বদ্ধ। নিয়মিত ক্লাস নেওয়া, শিক্ষার্থীর শিখন ঘাটতি চিহ্নিত করা এবং কার্যকর পাঠদান করা তার মৌলিক দায়িত্ব।
কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতার দায় শুধু শিক্ষকের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার অর্ধেকই দেখা হবে। একজন শিক্ষক যদি প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ না পান, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী থাকে, দীর্ঘদিন শিক্ষক পদ শূন্য থাকে, প্রতিষ্ঠানপ্রধান একাডেমিক নেতৃত্ব না দেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত তদারকি না করে, তাহলে পুরো ব্যবস্থাকেই প্রশ্ন করতে হবে। জবাবদিহির শৃঙ্খলটি হতে হবে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত।
শিক্ষক জবাবদিহির আওতায় থাকবেন। প্রতিষ্ঠানপ্রধান থাকবেন। শিক্ষা প্রশাসন থাকবে। প্রকল্প পরিচালক ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাও থাকবে। অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও থাকবেন। যেখানে দায়িত্ব আছে, সেখানে জবাবদিহি থাকতেই হবে।
শিক্ষার মান মাপতে হবে শুধু পাসের হার দিয়ে নয়: আরেকটি ভুল ধারণা আমাদের বদলাতে হবে। শুধু পাসের হার বাড়লেই শিক্ষা ভালো হয়েছে—এমন নয়।
একটি প্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করল; কিন্তু তারা যদি মৌলিক গণিত করতে না পারে, নিজের ভাষায় যুক্তি প্রকাশ করতে না পারে, তথ্য যাচাই করতে না পারে কিংবা বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান করতে না পারে, তাহলে সেই সাফল্য কতটা অর্থবহ?
তাই পরীক্ষার ফলের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর বাস্তব শিখন, উপস্থিতি, ঝরে পড়ার হার, মৌলিক দক্ষতা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং জীবনদক্ষতাকেও মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।
তবে শূন্য পাসের ফলকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত, যা শিক্ষা ব্যবস্থাকে গভীরভাবে পরীক্ষা করার দাবি জানায়।
প্রয়োজন স্বচ্ছ ও কঠোর শিক্ষা নিরীক্ষা: দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি এডুকেশন পারফরমেন্স অডিট বা শিক্ষা কার্যকারিতা নিরীক্ষা চালু করা যেতে পারে।
এখানে বিবেচনায় আসবে: শিক্ষার্থী উপস্থিতি, শিক্ষক উপস্থিতি, শ্রেণি কার্যক্রম, শিখন অর্জন, পরীক্ষার ফল, ঝরে পড়ার হার, আর্থিক ব্যয়, অবকাঠামোর ব্যবহার, শিক্ষা উপকরণের ব্যবহার এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধানের নেতৃত্ব। প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়মিত প্রকাশ করা হলে অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণও জানতে পারবেন তাদের এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেমন করছে।
তবে এই মূল্যায়ন যেন শাস্তির যন্ত্র না হয়ে ওঠে। এর উদ্দেশ্য হবে প্রথমে সমস্যা শনাক্ত করা, পরে সহায়তা দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।
জনগণের অর্থের প্রতি রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে: একটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি টাকা জনগণের টাকা। সেই অর্থের অপচয় মানে জনগণের সম্পদের অপচয়। একজন কৃষক মাঠে শ্রম দেন, একজন শ্রমিক ঘাম ঝরান, একজন চাকরিজীবী কর দেন। সেই অর্থের একটি অংশ শিক্ষা খাতে আসে। ফলে শিক্ষা খাতে ব্যয় হওয়া প্রতিটি টাকার সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা জড়িত। তাই জনগণের অর্থে পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ধারাবাহিকভাবে অকার্যকর হয়, তাহলে প্রশ্ন তোলা অন্যায় নয়। বরং প্রশ্ন না তোলাই অন্যায়।
এখন সময় এসেছে শিক্ষায় অপচয়, ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত জবাবদিহি ব্যবস্থা গড়ে তোলার। শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানকে অন্ধভাবে বন্ধ করা নয়; আবার বছরের পর বছর ব্যর্থতাকে প্রশ্রয় দেওয়াও নয়। আগে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, তারপর সংস্কারের সুযোগ, এরপরও ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে পুনর্গঠন, একীভূতকরণ কিংবা প্রয়োজন হলে বন্ধ—এই নীতিই হতে পারে বাস্তবসম্মত পথ।
একই সঙ্গে ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে থাকতে হবে দৃশ্যমান ও কার্যকর আইন প্রয়োগ। অভিযোগের দ্রুত তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক বিচার এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদের সাফল্যের সংজ্ঞা বদলাতে হবে।
শুধু ভবন নয়, শিক্ষার্থী তৈরি হয়েছে কি না—সেটিই হবে সাফল্যের মাপকাঠি। শুধু বরাদ্দ নয়, অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়েছে কি না—সেটিই হবে জবাবদিহির মাপকাঠি। শুধু ফল প্রকাশ নয়, ব্যর্থতার কারণ ও দায় নির্ধারিত হয়েছে কি না—সেটিই হবে প্রশাসনিক সাফল্যের মাপকাঠি।
শিক্ষা জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের কাজে অপচয়, ঘুষ ও দুর্নীতির কোনো স্থান থাকতে পারে না। তাই এখনই সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, শিক্ষার টাকা যাবে শিক্ষার্থীর শেখায়, অপচয়ের গর্তে নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলবে জবাবদিহিতে, অবহেলায় নয়। আর ঘুষ ও দুর্নীতির সঙ্গে আপস নয়, প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে আইনই হবে শেষ কথা।
কারণ শূন্য পাসের একটি প্রতিষ্ঠান হয়তো একটি সংকটের লক্ষণ; কিন্তু শূন্য জবাবদিহির শিক্ষা ব্যবস্থা পুরো জাতির জন্য বিপদ।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ময়মনসিংহ।


১৪
২৪ মন্তব্য