Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৫৮ অপরাহ্ণ

একজন প্রশিক্ষক, যিনি শুধু শেখান না —হৃদয়ও ছুঁয়ে যান

একজন প্রশিক্ষক, যিনি শুধু শেখান না হৃদয়ও ছুঁয়ে যান

আবাসিক প্রশিক্ষণ মানেই দীর্ঘদিন পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থাকা। দিনের পর দিন ক্লাস, নির্ধারিত রুটিন, নতুন পরিবেশসবকিছু মিলিয়ে অনেক সময় প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে একাকিত্ব, পরিবারকে মিস করা কিংবা মানসিক চাপ তৈরি হয়। কিন্তু এমন একটি পরিবেশে যদি এমন একজন প্রশিক্ষক থাকেন, যিনি প্রশিক্ষকের চেয়ে একজন আপনজন ও বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়ান, তাহলে দীর্ঘ প্রশিক্ষণের সময়টুকুও হয়ে ওঠে আনন্দময় ও স্মরণীয়।

বিএমটিটিআই, গাজীপুরের সম্মানিত প্রশিক্ষক মোল্লা সালে সাহেব আমার কাছে ঠিক তেমনই একজন মানুষ।

তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ হলোতিনি প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীর মাঝের প্রচলিত দূরত্বটাকে খুব সহজেই কমিয়ে আনতে পারেন। তিনি কখনো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেন না, যেখানে প্রশিক্ষণার্থী মনে করবে, ‘আমি একজন ছাত্র, আর তিনি শুধু একজন শিক্ষক।বরং তাঁর আচরণে মনে হয় আমরা সবাই একই পরিবারের সদস্য। তাঁর আন্তরিকতা, হাসিমুখ, সহজ-সরল ব্যবহার এবং বন্ধুসুলভ আচরণ প্রশিক্ষণার্থীদের খুব দ্রুত আপন করে নেয়।

প্রশিক্ষণকে প্রাণবন্ত করার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা অনন্য। ইসলামি সংগীত, কবিতা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল পরিবেশনা কিংবা নানা ধরনের আনন্দঘন আয়োজনতিনি শুধু দর্শক হয়ে পাশে থাকেন না; নিজেও অংশগ্রহণ করেন। কখনো কোনো খাবারের আয়োজনে যুক্ত হন, কখনো নিজেই উদ্যোগ নিয়ে কোনো অনুষ্ঠান বা পরিবেশনার ব্যবস্থা করেন। ফলে প্রশিক্ষণ শুধু ক্লাসরুমের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সেখানে তৈরি হয় আনন্দ, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সম্পর্কের এক সুন্দর পরিবেশ।

আমার কাছে তাঁর এই দিকটি বিশেষভাবে ভালো লাগেতিনি প্রশিক্ষণকে শুধু শেখানোর একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াহিসেবে দেখেন না; তিনি এটিকে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরির একটি সুযোগ হিসেবেও দেখেন।

তাঁর আরেকটি অসাধারণ গুণ হলো তাঁর আন্তরিকতা ও বিনয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ব্যাচের ছোট-বড় ভাইদের সঙ্গে তিনি অত্যন্ত সহজ ও আপনভাবে মিশে থাকেন। তাঁদের সঙ্গে ছবি তোলেন, সেলফি দেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই মুহূর্তগুলোও শেয়ার করেন। বিষয়টি বাইরে থেকে খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে একটি অসাধারণ মানসিকতা রয়েছে।

অনেক সময় একজন ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে বড় ভাইয়ের শেখার ক্ষেত্রে এক ধরনের সংকোচ বা ইতস্ততবোধ কাজ করে। আমি বড়, সে ছোট’—এই অদৃশ্য দূরত্ব কখনো কখনো শেখার পথেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মোল্লা সালে সাহেব যেন নিজের আচরণের মধ্য দিয়ে সেই দূরত্বটিই ভেঙে দিতে চান। এই বিনয়ই তাঁকে আলাদা করে চেনায়।

আরেকটি বিষয় তাঁকে বিশেষভাবে ব্যতিক্রমী করে তোলে প্রশিক্ষণার্থীদের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত খোঁজখবর। কে কেমন আছেন, কার কী সমস্যা, কার কোথায় অসুবিধা এসব বিষয়ে তিনি তার সাধ্যমত আন্তরিকভাবে খোঁজ নেন। প্রয়োজনে সমাধানের পথও খুঁজে দেন। ফলে প্রশিক্ষণার্থীরা শুধু একজন প্রশিক্ষককে নয়, একজন অভিভাবকসুলভ মানুষকেও পাশে পান।

তাঁর সঙ্গে সময় কাটালে একটা বিষয় খুব সহজেই বোঝা যায়তিনি চান, প্রশিক্ষণার্থীরা শুধু কিছু তথ্য বা দক্ষতা নিয়ে ফিরে না যাক; বরং তাঁর কাছ থেকে শেখার একটি মানসিকতা নিয়ে ফিরে যাক।

তিনি নিজের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা কিংবা অন্য  বিষয় নিয়ে কখনো অহংকার করেন না। অথচ তাঁর মেধা, মনন ও অভিজ্ঞতার পরিধি যথেষ্ট সমৃদ্ধ। তিনি খুবই সাদামাটাভাবে পড়িয়ে যান। তাঁর মধ্যে আমি জানি’—এমন কোনো প্রদর্শনীর প্রবণতা নেই; বরং তাঁর আচরণে থাকে চলো, আমরা একসঙ্গে শিখি’—এই মানসিকতা।

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে তিনি মাদ্রাসার শিক্ষকদের উৎসাহিত করেন। শুধু উৎসাহ দিয়েই থেমে থাকেন না; কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, কীভাবে AI-কে শিক্ষাদানের কাজে কাজে লাগানো যায়, কীভাবে আধুনিক উপকরণ ব্যবহার করে পাঠদানকে আরও আকর্ষণীয় করা যায়এসব বিষয় তিনি হাতে-কলমে বুঝিয়ে দেন।

এখানেও তাঁর একটি বড় বৈশিষ্ট্য আছে তিনি শুধু কী করতে হবেবলেন না; বরং কীভাবে করতে হবেসেটাও দেখিয়ে দেন।

অনেক শিক্ষক ভালো পড়ান। অনেক প্রশিক্ষক আন্তরিকও হন। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যারা শেখানোর পাশাপাশি শেখার পরিবেশটাকেই বদলে দেন। মোল্লা সালে সাহেব আমার কাছে তেমনই একজন মানুষ।

তাঁকে দেখে মনে হয় একজন প্রশিক্ষক শুধু জ্ঞানের ভাণ্ডার হলেই যথেষ্ট নয়; তাঁকে হতে হয় একজন ভালো মানুষ, একজন শ্রোতা, একজন বন্ধু, একজন পথপ্রদর্শক এবং প্রয়োজনে একজন অভিভাবক।

তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। প্রশিক্ষণ শেষ হয়ে যাবে, আমরা যার যার কর্মস্থলে ফিরে যাব; কিন্তু একজন আন্তরিক, বিনয়ী ও হৃদয়বান প্রশিক্ষকের যে স্মৃতি আমাদের মনে থেকে যাবেসেটিই হয়তো তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন।

তিনি শুধু প্রশিক্ষণ দেন নাতিনি মানুষকে আপন করে নেন।
তিনি শুধু পাঠ শেখান নাশেখার আনন্দ জাগিয়ে দেন।
আর তিনি শুধু একজন প্রশিক্ষক ননতিনি একজন অনুপ্রেরণার নাম।

সর্বদা ভালো থাকবেন স্যার।

আমাদের জন্য দোয়া করবেন।

 

মো. সাইফুল ইসলাম

প্রভাষক (আরবি)

গজারিয়া, মুন্সিগঞ্জ

26th Arabic, CDME Scheme

মন্তব্য করুন