Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:১৩ অপরাহ্ণ

তলস্তয়ের প্রকৃতিদর্শন

লিও তলস্তয়। ৯ সেপ্টেম্বর এই বিশ্ববিখ্যাত লেখকের জন্মদিন। রুশ সাতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক তো বটেই বিশ্বসাহিত্য অঙ্গনে শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক হিসেবে পরিচিত। তাঁর সাহিত্যভুবন বৈচিত্র্যময়। তাঁর লেখালেখিতে উঠে এসেছে প্রকৃতি ও পরিবেশসহ নানা প্রসঙ্গ। তলস্তয়ের লেখায় প্রকৃতি কখনো শুধু পটভূমি নয়। তাঁর লেখায় স্থান পেয়েছে বন, মাঠ, তুষারঝড় ও একটা একলা ওক গাছ। এসব তাঁর কাছে জীবন্ত চরিত্রের মতো। মানুষের মনের সঙ্গে এসব জীবন্ত চরিত্রের একটা নীরব কথোপকথনের চিত্রপট তৈরি করেছেন আপন মহিমায়। প্রকৃতি এখানে সৌন্দর্যের গল্প নয়। এটা সত্যের কাছে পৌঁছানোর একটা রাস্তা। তলস্তয়ের লেখায় প্রকৃতির সৌন্দর্য হঠাৎ পাওয়া কোনো ভাবনা না। সারা জীবন ধরে এটা তাঁর লেখায় ফিরে ফিরে এসেছে। শৈশবের গল্প থেকে শুরু করে শেষ বয়সের দার্শনিক রচনা পর্যন্ত। যেন প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর একটা আজীবনের কথোপকথন চলছিল। আর সেই কথোপকথনের ছাপ পড়েছে তাঁর প্রায় প্রতিটা বড় লেখায়।

‘ওয়ার অ্যান্ড পিস-এর দৃশ্যটা  কল্পনা করা যাক। প্রিন্স আন্দ্রেই একটা ওক গাছ দেখেন। গাছটা মরা মনে হয়। শাখা শুকনো, পাতাহীন। চারপাশে তখন বসন্ত, তরুণ গাছগুলো সবুজে ভরা। শুধু এই গাছটাই যেন প্রতিবাদ করে বসে আছে জীবনের বিরুদ্ধে। আন্দ্রেইও তখন তেমনই ক্লান্ত। যুদ্ধ তাকে ভেঙে দিয়েছে, বিশ্বাস হারিয়েছেন জীবনের ওপর থেকে। তলস্তয়ের লেখায় কিছুদিন পর একই গাছ ফিরে আসেন গল্পে। এবার সবুজ পাতায় ভরা। আর আন্দ্রেইয়ের ভেতরেও কিছু একটা বদলে যায়। নিঃশব্দে। কোনো ঘোষণা ছাড়াই। জীবনের প্রতি তাঁর হারানো বিশ্বাস আবার জেগে ওঠে। এই দৃশ্যটা পড়লে মনে হয়, তলস্তয় যেন বলতে চেয়েছেন, মানুষও গাছের মতোই! বাইরে থেকে মরা মনে হলেও, ভেতরে হয়তো এখনো জীবন লুকিয়ে থাকে। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার দৃশ্যেও লেখকের সেই একই সুর! মানুষের লড়াই, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অহংকার  বিশাল আকাশের সামনে এসব কত ছোট হয়ে যায়। আন্দ্রেই সেটা প্রথমবার বোঝেন সেই মুহূর্তে! যে মুহূর্তে  মাটিতে পড়ে থেকে, রক্তাক্ত অবস্থায়। তিনি হঠাৎ দেখেন সেই বিশাল, নীরব আকাশ। আর নিজের সব উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাঁর কাছে হাস্যকর মনে হয়!

আন্না কারেনিনা’র লেভিন চরিত্রটা অনেকটাই তলস্তয়ের নিজের ছায়া। শহরের আভিজাত্য তাকে টানে না। বরং টানে মাটি, ঘাস কাটার শ্রম, কৃষকদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার সেই মুহূর্ত। যখন লেভিন মাঠে কাস্তে হাতে নামেন, তখন তাঁর মনের সব জটিলতা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। এই প্রশান্তি তিনি শহরের কোনো বৈঠকখানায় খুঁজে পাননি! শুরুতে লেভিনের হাত কাঁপে, কাস্তে ঠিকমতো চলে না। কৃষকদের পাশে তাকে বেমানান লাগে। কিন্তু ধীরে ধীরে একটা ছন্দ চলে আসে শরীরে। মন তখন আর ভাবে না, শুধু শরীর কাজ করে যায়। এই অবস্থাটাকেই তলস্তয় দেখিয়েছেন এক ধরনের মুক্তি হিসেবে। চিন্তার ভার থেকে মুক্তি। তলস্তয় নিজেও পরে এই পথে হাঁটেন। ইয়াসনায়া পলিয়ানায় গিয়ে সহজ, গ্রামীণ জীবন বেছে নেন| নিজে হাতে জুতো সেলাই শিখেছিলেন, মাঠে কাজ করতেন কৃষকদের সঙ্গে। কৃষকের জীবন আর প্রকৃতির নিয়মে মানিয়ে নিয়েছেন। তাঁর কাছে এই দুটো আসলে একই সত্যের দুটো মুখ।

দ্য কসাক্স ’এ ওলেনিন নামের এক তরুণ ককেশাসের পাহাড়ে যান। বিশাল পর্বত, ঘন জঙ্গল আর তেরেক নদী। এসবের মধ্যে তিনি খুঁজে পান নিজের শহুরে জীবন থেকে মুক্তি। কসাকদের সরল জীবন দেখে তিনি বুঝতে পারেন, সভ্যতা আসলে মানুষকে তার নিজের থেকেই কত দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ওলেনিন যখন প্রথম পাহাড়গুলো দেখেন তখন তাঁর মধ্যে একটা অদ্ভুত অনুভূতি জাগে। শহরের সব হিসাব-নিকাশ, সব সামাজিক নিয়ম হঠাৎ তুচ্ছ মনে হয়। এখানে তলস্তয়ের সুরে একটা রুশোঘেঁষা রোমান্টিকতা আছে ঠিকই, কিন্তু এটা শুধু প্রকৃতিপূজা নয়। এটা একটা নৈতিক খোঁজ,সততার পথ। যেটা প্রকৃতির সরলতা থেকেই আসে।

দ্য উড-ফেলি’ গল্পেও একই রকম একটা টান আছে। ককেশাসের বনে সৈনিকদের ভেতরের অস্থিরতা, আর বনের নিস্তব্ধ ধৈর্য এই দুটো পাশাপাশি রাখলে একটা তীব্র বৈপরীত্য তৈরি হয়। মানুষের অস্থিরতা বনাম প্রকৃতির স্থিরতা- এই থিম তলস্তয়ের বারবার ফিরে আসা একটা জায়গা।

তলস্তয়ের কাছে প্রকৃতি শুধু জীবনের কথা বলে না, মৃত্যুর মুখোমুখিও দাঁড় করায়। ‘থ্রি ডেথস গল্পে তিনি তিনটে মৃত্যু পাশাপাশি রাখেন। একজন ধনী নারী, একজন দরিদ্র গাড়িচালক আর একটা গাছ। আশ্চর্য ব্যাপার হলো, গাছের মৃত্যুটাই এখানে সবচেয়ে শান্ত আর সবচেয়ে সুন্দর মনে হয়। মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায়, আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। গাছ তা করে না। চুপচাপ ফিরে যায় প্রকৃতির চক্রে। তলস্তয় এখানে অনেক কিছু বলতে চান। মানুষ যদি এভাবে সহজে মৃত্যুকে মেনে নিতে পারত, কষ্টটা হয়তো কম হতো- এটাই ছিল তলস্তয়ের অন্তরের ভাবনা।

মাস্টার অ্যান্ড ম্যান গল্পে প্রকৃতি আসে তার সবচেয়ে নিষ্ঠুর রূপে। তুষারঝড়ে পথ হারান দুজন মানুষ। এই ঝড়ের সামনে সামাজিক মর্যাদা, লোভ, শ্রেণিভেদসব যেন অর্থহীন হয়ে যায়। বরফের মধ্যে একজন ধনী ব্যবসায়ী আর তাঁর গরিব চাকর দুজনেই সমান অসহায়। কিন্তু এই সংকটই আবার মানুষের ভেতরের ভালো দিকটা জাগিয়ে তোলে। শেষ মুহূর্তে মনিব নিজের শরীর দিয়ে তাঁর চাকরকে বাঁচান। প্রকৃতির নিষ্ঠুরতাই যেন এখানে মানুষকে মহৎ হতে বাধ্য করে।

হাদজি মুরাদ উপন্যাসের শুরুতে একটা কাঁটাঝোপের বর্ণনা আছে। ভাঙা, ক্ষতবিক্ষত, তবু মাটি ছাড়েনি গাছটা। এই ছোট্ট গাছটার মধ্য দিয়ে তলস্তয় বলেন উপন্যাসের মূল চরিত্রের গল্পকীভাবে সে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও লড়ে যায়। একটা সামান্য কাঁটাগাছ অথচ তার মধ্যেই তলস্তয় খুঁজে পান জীবনের সবচেয়ে বড় পাঠ।

চাইল্ডহুড, বয়হুড, ইয়ুথ’-তলস্তয়ের এই আত্মজৈবনিক লেখায় ফিরে আসে তাঁর নিজের শৈশব। গ্রাম, বাগান আর প্রকৃতির সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার সেই বিস্ময়। বোঝা যায়, প্রকৃতির প্রতি তাঁর এই টান কোনো পরের জীবনে শেখা দর্শন নয়। এটা শৈশব থেকেই তাঁর সঙ্গে ছিল। ছোটবেলার সেই বাগান, সেই গাছপালা, সেই মাঠএসব তাঁর স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে ছিল। বড় হয়ে যখন তিনি লিখতে বসেন সেই স্মৃতিগুলোই ফিরে ফিরে আসে তাঁর লেখায়। ইয়াসনায়া পলিয়ানার মাঠ আর বাগান সারাজীবন তাঁর লেখার রসদ হয়ে থেকে গেছে।

তলস্তয়ের প্রকৃতিচিন্তাকে রোমান্টিক কবিদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক না। ওয়ার্ডসওয়ার্থ বা কিটসের কাছে প্রকৃতি মূলত সৌন্দর্য আর আবেগের জায়গা। তলস্তয়ের কাছে এটা নৈতিক প্রশ্ন। তাঁর লেখা বারবার একটা কথাই বলে। আর তা হলো সরল হও, নম্র হও, জীবন আর মৃত্যুকে সহজে নাও। আন্দ্রেইয়ের ওক গাছ শেখায় পুনর্জন্মের কথা। লেভিনের মাঠ শেখায় শ্রমের মর্যাদা। কসাক্সের পাহাড় শেখায় সভ্যতার মুখোশ কতটা ফাঁপা। আর তুষারঝড় শেখায় মানুষ আসলে কী দিয়ে তৈরি। প্রতিটা গল্প যেন একেকটা পাঠ। আর সব পাঠ মিলে একটা কথাই বলেপ্রকৃতির কাছে গেলে মানুষ নিজেকে চিনতে পারে। শেষ পর্যন্ত প্রকৃতি তলস্তয়ের কাছে একটা আয়না। এই আয়নায় তাঁর চরিত্ররা নিজেদের আসল মুখটা দেখতে পায়। আজকের এই যান্ত্রিক সময়ে, যখন আমরা প্রকৃতি থেকে দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছি, তলস্তয়ের এই লেখাগুলো যেন আমাদের ফিরে ডাকে। সেই পুরনো, ভুলে যাওয়া সম্পর্কের দিকে। যেখানে মানুষ আর প্রকৃতি একে অপরকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। হয়তো এখনো দেরি হয়নি। হয়তো এখনো আমরা শিখতে পারি সেই ওক গাছ, সেই মাঠ, সেই তুষারঝড়ের কাছ থেকে।

 

 

মন্তব্য করুন