সহকারী শিক্ষক
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৮:০০ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
এই সময়ের এক কিশোরী।
তার হাতে স্মার্টফোন নেই। নেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করার অভ্যাস। নেই ভার্চুয়াল জগতে হারিয়ে যাওয়ার নেশা।
তার হাতে আছে বই।
আর বইয়ের পাতায় আছে তার একান্ত পৃথিবী।
সে জান্নাতুল মাওয়া মীম। হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার পুটিজুরী শরৎচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় সকল বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।
কিন্তু মীমের গল্পটা শুধু জিপিএ-৫-এর গল্প নয়।
কারণ জিপিএ-৫ তো অনেকেই পায়।
জিপিএ-৫ পাওয়ার পাশাপাশি ১২৮টি বই পড়ে ফেলার গল্পটি একটু অন্যরকম।
মীম, নবম-দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই পড়ে ফেলেছে প্রায় ১০০টি বই। এ পর্যন্ত তার পড়া বইয়ের সংখ্যা ১২৮। এর মধ্যে ৭১টি উপন্যাস, ১৯টি নাটক, ২০টি গল্পগ্রন্থ ও ১০টি আত্মজীবনী। শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরই পড়েছে ৪৪টি ছোটগল্প।
তার পাঠের তালিকায় আছে রবীন্দ্রনাথের গোরা, চোখের বালি, গল্পগুচ্ছ; বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী; সমরেশ মজুমদারের উত্তরাধিকার, কালবেলা, কালপুরুষ, সাতকাহন; মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি; রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের অবরোধবাসিনীসহ বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য কালজয়ী সৃষ্টি।
ভাবুন তো, যে বয়সে একটি মেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলের পর্দায় চোখ রাখে, সেই বয়সে মীম চোখ রেখেছে বইয়ের পাতায়। যে সময়ে আঙুল ছুটে চলে স্ক্রিনে, সে সময়ে তার আঙুল ছুটেছে বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাতে।
মীম মোবাইল ব্যবহার করত না।
এটি হয়তো তার বই পড়ার সবচেয়ে বড় রহস্য।
তবে শুধু সাহিত্যের বই পড়লেই তো ভালো ফলাফল আসে না। মীম বই পড়েছে, আবার পাঠ্যবইও পড়েছে সমানতালে। সাহিত্য পড়েছে, আবার পড়াশোনার জন্য সময়ও রেখেছে। আনন্দের সঙ্গে পড়েছে, কিন্তু দায়িত্ব ভুলে যায়নি।
তার সাফল্যের পেছনে ছিল রুটিনমাফিক পড়াশোনা, সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং নিজের প্রতি শৃঙ্খলা।
আমাদের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা আছে-সিলেবাসের বাইরে বেশি সাহিত্য পড়লে পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হতে পারে। মীম যেন সেই ধারণাটির সামনে দাঁড়িয়ে একটি জীবন্ত উত্তর হয়ে উঠেছে।
সে প্রমাণ করেছে-
বই পড়া সময় নষ্ট করা নয়।
বই পড়া পড়াশোনার পথে বাধা নয়।
বরং সঠিকভাবে সময়কে সাজাতে পারলে বই মানুষকে আরও ভালো শিক্ষার্থী, আরও ভালো বক্তা, আরও ভালো চিন্তাশীল মানুষ করে তুলতে পারে।
মীম শুধু বই পড়ে না। সে কবিতা আবৃত্তি করে, বিতর্ক করে, উপস্থাপনা করে। আমার কাছ থেকে নিয়মিত বই নিয়ে পড়েছে। আবার বাহুবলের একমাত্র উচ্চারণ ও আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ‘চারুপাঠ’-এ শিখেছে প্রমিত উচ্চারণ ও কবিতা আবৃত্তি।
তাই মীমের সাফল্য আমার কাছে শুধু একটি ফলাফলের কাগজ নয়। এটি একটি সুন্দর বিশ্বাসের জয়-একজন শিক্ষার্থী একই সঙ্গে ভালো ফলাফল করতে পারে, আবার ভালো পাঠকও হতে পারে।
আজ মীমের সঙ্গে কথা বলেছি। তার বই পড়ার অভিজ্ঞতা, পড়াশোনার রুটিন, মোবাইল থেকে দূরে থাকার অভ্যাস এবং সাফল্যের গল্প উঠে এসেছে এই ভিডিও সাক্ষাৎকারে।
আমার প্রত্যাশা-মীমের এই গল্প শুধু প্রশংসা কুড়াবে না, বরং আরও অনেক শিক্ষার্থীর হাতে একটি বই তুলে দেবে।
হয়তো কোনো এক সন্ধ্যায় কোনো কিশোর তার মোবাইলটি এক পাশে রেখে বই খুলবে।
পাতা উল্টাবে।
তারপর ধীরে ধীরে আবিষ্কার করবে-
একটি বইয়ের ভেতরেও লুকিয়ে থাকতে পারে একটি বিশাল পৃথিবী!
আর সেই পৃথিবীতে প্রবেশের পথ ধরেই হয়তো একদিন জন্ম নেবে আরেকজন মীম।
লেখক: পংকজ কান্তি গোপ, সিনিয়র শিক্ষক, পুটিজুরী শরৎ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, বাহুবল, হবিগঞ্জ।
৫
৬ মন্তব্য