সহকারী শিক্ষক
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:০৮ অপরাহ্ণ
মনের আয়নায় নিজেকে দেখি
মনের আয়নায় নিজেকে দেখি!
আমি দেখতে বেশ কালো।
শুনেছি, ছোটবেলায় নাকি আমি আরও বেশি কালো ছিলাম। কখনো কখনো মজা করে ভাবি—আমি কাক-বংশের ছিলাম কিনা! হয়তোবা ছিলাম। কাকদের সঙ্গে আমার বেশ বন্ধুত্ব ছিল। তাদের কালো রং টুকুই হয়তো অজান্তে নিজের শরীরে মেখে নিয়েছি।
আমার জীবনের অনেকগুলো বসন্ত চলে গেছে।
না, বসন্ত বলা ঠিক হবে না। ভাদ্র বলা ভালো। কারণ আমার জন্মই তো ভাদ্র মাসে। জীবনের ক্যালেন্ডারে কতগুলো ভাদ্র এসে চলে গেল—আমি শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম।
কিন্তু বয়সের হিসাব আমাকে যতটা ভাবায়, তার চেয়ে বেশি ভাবায় জীবনের হিসাব।
আমি নিজের ভেতরটা বুঝি।
নিজের বাইরেটাও বুঝি।
আমি জানি, কোথায় আমি ভালো ছিলাম, কোথায় ছোট হয়ে গেছি। কোথায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারতাম অথচ দাঁড়াইনি। কোথায় একটি ভালো কাজ করতে পারতাম অথচ নিজের স্বাচ্ছন্দ্যকে বড় করে দেখেছি।
আমার সব অপরাধের কথা আমি জানি।
সবগুলো হয়তো মনে নেই, কিন্তু অনুভব করি।
আর সবচেয়ে বড় কথা—আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না।
আমার সবচেয়ে কঠিন বিচারক অন্য কেউ নয়, আমি নিজেই।
অন্য কেউ আমাকে যতটা কঠিনভাবে বিচার করতে পারে, আমি তার চেয়েও কঠিনভাবে নিজেকে দেখি। আয়নার সামনে দাঁড়ালে শুধু মুখটা দেখি না; নিজের ভেতরের মানুষটাকেও দেখতে চেষ্টা করি।
সেখানে অনেক আলো আছে, আবার অনেক অন্ধকারও আছে।
অনেক অপূর্ণতা আছে।
অনেক না-পারা আছে।
অনেক না-করা কাজের স্তূপ আছে।
জীবন আমাকে কত কিছু দিয়েছে!
মানুষ দিয়েছে, ভালোবাসা দিয়েছে, স্নেহ দিয়েছে, বন্ধুত্ব দিয়েছে। কত মানুষের কাছ থেকে কতটুকু করে পেয়েছি—কেউ হয়তো জানে না, আমিও হয়তো সবকিছুর হিসাব রাখিনি।
আমি শুধু নিয়েছি।
দুহাত ভরে নিয়েছি।
কিন্তু আজ পেছনে ফিরে তাকালে হঠাৎ মনে হয়—আমি দিয়েছি কী?
এই প্রশ্নটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
আমি কি কারও জীবনে সত্যিই একটু আলো হতে পেরেছি?
কেউ কি কোনোদিন আমার কথা মনে করে বলবে—
“এই মানুষটা আমার কঠিন সময়ে পাশে ছিল।”
কেউ কি বলবে—
“ওর জন্য আমার জীবনের পথটা একটু সহজ হয়েছিল।”
কেউ কি আমার অনুপস্থিতিতেও আমার কোনো ভালো কাজকে মনে রাখবে?
জানি না।
বরং অনেক সময় মনে হয়, আমি পৃথিবী থেকে শুধু নিয়েই যাচ্ছি। আর দেওয়ার সময় আমার হাত দুটো কেমন শূন্য হয়ে যায়।
কাউকে কিছু দিতে পারছি না।
কোনো ভালো কাজে নিজের অংশটুকু রাখতে পারছি না।
কারও দুঃখ একটু কমাতে পারছি না।
কারও মুখে স্থায়ী কোনো হাসির কারণ হতে পারছি না।
এই না-পারাটাই আমাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়।
একজন মানুষ হিসেবে এটাই হয়তো আমার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
তবে এখনও তো সব শেষ হয়ে যায়নি।
জীবনের কতগুলো ভাদ্র চলে গেছে—সেটা আমার হাতে নেই। কিন্তু সামনে যে কয়টা দিন পড়ে আছে, সেগুলো দিয়ে কী করব—সেটুকু হয়তো এখনও আমার হাতে আছে।
আমি বড় কিছু হতে চাই না।
শুধু এমন একজন মানুষ হতে চাই, যার অস্তিত্বে অন্তত একজন মানুষের সামান্য উপকার হয়েছে।
যে মানুষটি পৃথিবী থেকে দুহাত ভরে নিয়েছিল,
সে যেন চলে যাওয়ার আগে অন্তত এক মুঠো কিছু রেখে যেতে পারে।
হয়তো কোনো ভালো কাজ।
হয়তো কারও মুখের হাসি।
হয়তো কারও মনে রাখা একটি ভালো কথা।
হয়তো কোনো শিশুর চোখে জ্বেলে দেওয়া ছোট্ট একটি স্বপ্ন।
আর যদি সেটুকুও না পারি—
তাহলে আমার নিজের কাছেই আমার এই দীর্ঘ জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকে যাবে:
“ তুমি এত কিছু পেলে
কিন্তু দিয়ে গেলে কী?”
১
২ মন্তব্য