Loading..

ব্লগ

রিসেট

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:৩৭ পূর্বাহ্ণ

ইবাদুর রহমান : আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জীবনাদর্শ

ইবাদুর রহমান : আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জীবনাদর্শ

(—সূরা আল-ফুরকান ২৫:৬৩৭৬-এর আলোকে )

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক

মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর

মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার সম্পদ, বংশ, পদমর্যাদা, বাহ্যিক সৌন্দর্য কিংবা সামাজিক পরিচয়ে নয়; মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার ঈমান, তাকওয়া, চরিত্র, আমল আল্লাহর প্রতি আনুগত্যে। পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ বসবাস করে, কিন্তু সবাই আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা কুরআনে তাঁর প্রিয় বান্দাদের কিছু বিশেষ গুণ তুলে ধরেছেন। সূরা আল-ফুরকানের শেষাংশে তিনি তাঁদের পরিচয় দিয়েছেনইবাদুর রহমানঅর্থাৎ পরম দয়ালু আল্লাহর বান্দা হিসেবে।

তাঁদের জীবন শুধু ইবাদতকেন্দ্রিক নয়; বরং তাঁদের চলাফেরা, কথাবার্তা, রাতের ইবাদত, অর্থব্যয়, তাওহিদ, মানবজীবনের মর্যাদা রক্ষা, পবিত্রতা, তাওবা, সত্যবাদিতা, অনর্থক বিষয় থেকে দূরে থাকা, কুরআনের আয়াত গ্রহণ, পরিবার সন্তানের জন্য দোয়া এবং ধৈর্যসবকিছুতেই আল্লাহভীতি ভারসাম্যের প্রকাশ ঘটে।

অতএব ইবাদুর রহমান কোনো বিশেষ পরিচয়মাত্র নয়; এটি এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ, যেখানে আকিদার বিশুদ্ধতা, ইবাদতের সৌন্দর্য, চরিত্রের পবিত্রতা, সামাজিক দায়িত্ব, আত্মসংযম আখিরাতের প্রস্তুতি একসূত্রে গাঁথা।

. ইবাদুর রহমান’—পরিচয়ের মধ্যেই রয়েছে মর্যাদা

আল্লাহ তাআলা বলেন

আর রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, ‘সালাম
সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৬৩

এখানে আল্লাহ তাঁদের নিজের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে পরিচয় দিয়েছেনআর রহমানের বান্দা

বান্দা হওয়া ইসলামে অপমানের পরিচয় নয়; বরং এটিই মানুষের সর্বোচ্চ সম্মান। কারণ মানুষ যখন আল্লাহর বান্দা হওয়ার মর্যাদা লাভ করে, তখন সে সৃষ্টি জগতের কোনো বস্তু, প্রবৃত্তি, সম্পদ, ক্ষমতা বা মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে একমাত্র আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে সমর্পণ করে।

মুমিনের আত্মপরিচয়ের কেন্দ্র তাই হওয়া উচিতআমি আল্লাহর বান্দা। আমার জীবন তাঁর দেওয়া আমানত, আমার শক্তি তাঁর দান, আমার জ্ঞান তাঁর অনুগ্রহ এবং আমার প্রত্যাবর্তনও তাঁর কাছেই।

. নম্রতামুমিনের সৌন্দর্য

ইবাদুর রহমান-এর প্রথম বৈশিষ্ট্য হলোতারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে

নম্রতা মানে দুর্বলতা নয়। নম্রতা মানে নিজের মর্যাদা বিসর্জন দেওয়া নয়। বরং নম্রতা হলো অহংকার থেকে মুক্ত থাকা, মানুষের প্রতি শিষ্টাচার প্রদর্শন করা এবং নিজের শক্তি সামর্থ্যকে আল্লাহর দান হিসেবে উপলব্ধি করা।

অহংকারী ব্যক্তি মনে করে
আমি বড়,
আমি শ্রেষ্ঠ,
আমার জ্ঞান বেশি,
আমার সম্পদ বেশি,
আমার পদ বেশি।

কিন্তু মুমিন জানেআজ যে শক্তি আছে, কাল তা নাও থাকতে পারে; আজ যে সম্পদ আছে, কাল তা অন্যের হাতে চলে যেতে পারে; আজ যে জীবন আছে, একদিন তা শেষ হয়ে যাবে।

তাই প্রকৃত মুমিনের চলনে অহংকার থাকে না।

রাসুলুল্লাহ অহংকার সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না হাদিসে অহংকারের ভয়াবহতা স্পষ্ট করা হয়েছে।

তবে নম্রতার অর্থ সত্যের সামনে দুর্বল হয়ে যাওয়া নয়। মুমিন মানুষের প্রতি বিনয়ী, কিন্তু সত্য আল্লাহর বিধানের ব্যাপারে দৃঢ়।

. অজ্ঞের সঙ্গে অজ্ঞতার ভাষায় নয়, শান্তির ভাষায়

আল্লাহ বলেন, অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদের সম্বোধন করে, তারা বলেসালাম

এখানে মুমিনের চরিত্রের অসাধারণ একটি দিক ফুটে ওঠে। কেউ তাকে উত্তেজিত করলেই সে উত্তেজিত হয় না। কেউ কটু কথা বললেই সে কটু কথা ফিরিয়ে দেয় না। কেউ অজ্ঞতার পরিচয় দিলেই সে নিজের চরিত্র নষ্ট করে না।

কারণ মুমিন জানেঅন্যের অজ্ঞতা আমার চরিত্র নির্ধারণ করবে না।

কেউ অপমান করলে প্রতিশোধের ভাষায় উত্তর দেওয়া সহজ; কিন্তু সংযত থাকা কঠিন। আর সেই কঠিন পথই উত্তম চরিত্রের পথ।

তাই একজন ইবাদুর রহমান বিবাদ বাড়াতে নয়, শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তার মুখ থেকে অশ্লীলতা, গালাগাল, অপমান কটুবাক্য বের হয় না।

. রাতের নীরবতায় আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো

আল্লাহ তাআলা বলেন

আর যারা তাদের রবের জন্য সিজদারত দাঁড়ানো অবস্থায় রাত্রি যাপন করে।
সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৬৪

দিনের ব্যস্ততা মানুষকে দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত রাখে। কিন্তু রাতের নির্জনতা মুমিনকে তার রবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

ইবাদুর রহমান শুধু মানুষের সামনে ভালো নয়; তারা একান্ত নির্জনতাতেও আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর ইবাদত করে।

এখানেই ইখলাসের সৌন্দর্য।

মানুষের প্রশংসার জন্য ইবাদত করা সহজ হতে পারে; কিন্তু এমন সময়ে ইবাদত করা, যখন দেখার মতো কোনো মানুষ নেইএটি আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা আন্তরিকতার পরিচয়।

রাতের ইবাদত ফরজ নয়কিন্তু তাহাজ্জুদ অন্যান্য নফল ইবাদত মুমিনের ঈমানকে শক্তিশালী করে, হৃদয়কে কোমল করে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করে।

. ইবাদতের পাশাপাশি জাহান্নামের ভয়

ইবাদুর রহমান শুধু জান্নাতের আশা করে না; তারা জাহান্নামকেও ভয় করে।

তারা দোয়া করে

হে আমাদের রব! আমাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তি ফিরিয়ে নাও। নিশ্চয় এর শাস্তি অবিচ্ছিন্ন।

এখানে মুমিনের ভারসাম্যপূর্ণ ঈমান প্রকাশিত হয়েছে।

মুমিনের অন্তরে থাকে

আল্লাহর রহমতের আশা,
আল্লাহর শাস্তির ভয়।

শুধু ভয় মানুষকে হতাশ করতে পারে, আর শুধু আশা মানুষকে গাফেল করে দিতে পারে। ইসলামের শিক্ষা হলোআশা ভয়কে একসঙ্গে ধারণ করা।

যে ব্যক্তি জাহান্নামের ভয় করে, সে পাপকে হালকা মনে করে না। সে নিজের জীবনকে হিসাবের জন্য প্রস্তুত করে।

. দুনিয়ার জীবন নয়, আখিরাতের সফলতাই চূড়ান্ত লক্ষ্য

মানুষ সাধারণত ঘর, গাড়ি, অর্থ, সম্মান, চাকরি, ব্যবসা সামাজিক অবস্থান নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এসব প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু এগুলো মানুষের চূড়ান্ত সফলতা নয়।

চূড়ান্ত সফলতা হলোআল্লাহর সন্তুষ্টি এবং জান্নাত লাভ।

ইবাদুর রহমান তাই দুনিয়ার দায়িত্ব পালন করলেও আখিরাতকে ভুলে যায় না। তারা মনে রাখেএকদিন সব হিসাব দিতে হবে।

. অর্থব্যয়ে ভারসাম্য

আল্লাহ বলেন

আর তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না; বরং দুয়ের মাঝামাঝি থাকে।
সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৬৭

আয়াত ইসলামের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

ইসলাম অপচয় সমর্থন করে না। আবার প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কৃপণতাকেও প্রশ্রয় দেয় না।

একদিকে অপব্যয়

অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা,
দেখানোর জন্য ব্যয়,
অতিরিক্ত ভোগ,
সম্পদের অপচয়।

অন্যদিকে কৃপণতা

প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও পরিবারের অধিকার আদায় না করা,
অসহায়কে সাহায্য না করা,
আল্লাহর পথে ব্যয় করতে অনীহা,
নিজের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া।

ইসলাম উভয় চরমপন্থা থেকে দূরে থেকে মধ্যপন্থা ভারসাম্য শিক্ষা দেয়।

সূরা আল-ইসরায় আল্লাহ তাআলা অপচয় কৃপণতা উভয় বিষয়ে সতর্ক করেছেন। আবার সূরা আল-ফুরকানের আয়াত আমাদের শেখায়সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও তাকওয়া প্রয়োজন।

. তাওহিদ—‘ইবাদুর রহমান-এর মূল ভিত্তি

আল্লাহ বলেন

আর যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্যকে ডাকে না…”

এটি ইবাদুর রহমান-এর সবচেয়ে মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি।

ইসলামের প্রথম সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা হলো তাওহিদএকমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা।

আল্লাহই সৃষ্টিকর্তা, মালিক, পালনকর্তা বিধানদাতা। ইবাদত একমাত্র তাঁরই প্রাপ্য।

তাই মুমিনের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ঈমান দৃঢ় থাকে। সে দোয়া, ভয়, আশা, ভালোবাসা, তাওয়াক্কুল ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্বকে অটুট রাখে।

. মানবজীবনের মর্যাদা রক্ষা

আল্লাহ বলেন

আর যারা আল্লাহ যে প্রাণকে হত্যা করা নিষেধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না…”

ইসলাম মানুষের জীবনকে অত্যন্ত মূল্যবান মনে করে।

অন্যায় হত্যা শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না; এটি পরিবার, সমাজ মানবিকতার ওপর গভীর আঘাত করে।

তাই মুমিন অন্যায়ভাবে কারও প্রাণ নষ্ট করে না। সে মানুষের জান-মাল-সম্মানের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবন আল্লাহর দেওয়া আমানত। তাই ব্যক্তিগত রাগ, প্রতিশোধ, হিংসা কিংবা স্বার্থের কারণে হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই বৈধ নয়।

১০. ব্যভিচার থেকে পবিত্রতা রক্ষা

আল্লাহ বলেন

আর যারা ব্যভিচার করে না।

ইসলাম মানুষের যৌনজীবনকে পবিত্র, দায়িত্বশীল বৈধ পথে পরিচালিত করতে শিক্ষা দেয়।

ব্যভিচার ব্যক্তি পরিবারউভয়ের জন্যই ধ্বংসাত্মক। এটি বিশ্বাস ভেঙে দেয়, পরিবারকে দুর্বল করে, সন্তানদের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে এবং সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

তাই ইসলাম শুধু ব্যভিচার নিষিদ্ধ করেনি; বরং এর কাছেও যেতে নিষেধ করেছে

তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না; নিশ্চয় তা অশ্লীল এবং নিকৃষ্ট পথ।
সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩২

সুতরাং ইবাদুর রহমান নিজের দৃষ্টি, মন, চিন্তা আচরণকে পবিত্র রাখার চেষ্টা করে।

১১. পাপ যত বড় হোক, তাওবার দরজা বন্ধ নয়

ব্যভিচারসহ বড় গুনাহের কথা উল্লেখ করার পর আল্লাহ তাআলা আশার দরজা খুলে দিয়েছেন।

তিনি বলেন

তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পুণ্যে পরিবর্তন করে দেবেন। আর আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭০

আয়াত ইসলামের এক মহান সৌন্দর্য প্রকাশ করে।

মানুষ ভুল করতে পারে। মানুষ দুর্বল হতে পারে। কেউ পাপে পড়ে যেতে পারে। কিন্তু পাপের পর হতাশ হয়ে যাওয়াই মুমিনের পথ নয়।

মুমিনের পথ হলো

ভুল অনুতাপ তাওবা পাপ ত্যাগ ঈমান সৎকর্মে ফিরে আসা।

সত্যিকারের তাওবা মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।

তবে তাওবা শুধু মুখে ক্ষমা চাই বলা নয়। আন্তরিক তাওবার সঙ্গে পাপ থেকে ফিরে আসা, অনুতপ্ত হওয়া এবং পুনরায় পাপে না ফেরার দৃঢ় সংকল্প থাকা জরুরি। কারও অধিকার নষ্ট করলে সেই অধিকার যথাসম্ভব ফিরিয়ে দেওয়াও জরুরি।

১২. তাওবা মানে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা

আল্লাহ বলেন

আর যে তাওবা করে এবং সৎকাজ করে, তবে নিশ্চয় সে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে।
সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭১

তাওবা মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

যে ব্যক্তি পাপের পথে ছিল, সে যদি আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তার অতীত তার ভবিষ্যৎকে অবশ্যই নির্ধারণ করবেএমন নয়।

ইসলাম মানুষকে অতীতের পাপের বন্দি করে রাখে না; বরং তাওবার মাধ্যমে নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ দেয়।

তাই কাউকে তার অতীত পাপের কারণে চিরদিন অপমান করা উচিত নয়। আল্লাহ যখন বান্দার তাওবা কবুল করেন, তখন মানুষেরও উচিত সংশোধিত ব্যক্তিকে সংশোধনের পথে সহযোগিতা করা।

১৩. মিথ্যা সাক্ষ্য থেকে মুক্ত থাকা

আল্লাহ বলেন

আর যারা মিথ্যার সাক্ষ্য হয় না…”

সত্যবাদিতা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।

মিথ্যা সাক্ষ্য একজন নির্দোষ মানুষের অধিকার নষ্ট করতে পারে, একজন অপরাধীকে রক্ষা করতে পারে এবং সমাজে বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

তাই মুমিন সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে গ্রহণ করে।

সে আদালতে, ব্যবসায়, পরিবারে, প্রতিষ্ঠানে, শিক্ষাঙ্গনে কিংবা সামাজিক জীবনেকোনো ক্ষেত্রেই মিথ্যার আশ্রয় নেয় না।

১৪. অনর্থক কাজ থেকে সম্মানের সঙ্গে সরে যাওয়া

আল্লাহ বলেন

আর যখন তারা অনর্থক কথা-কর্মের পাশ দিয়ে চলে যায়, তখন সসম্মানে চলে যায়।

মানুষের জীবনে অনেক কথা, আলোচনা, বিনোদন কর্মকাণ্ড আসে, যার কোনো উপকার নেই।

মুমিন সব বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে না।

যেখানে অশ্লীলতা, গীবত, পরনিন্দা, মিথ্যা, ঝগড়া, বিদ্রূপ, অশোভন বিনোদন কিংবা সময়ের অপচয়সেখানে সে নিজেকে সংযত রাখে।

তার কাছে সময় একটি আমানত।

কারণ জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না।

১৫. কুরআনের আয়াত শুনে উদাসীন না থাকা

আল্লাহ বলেন

আর তাদের রবের আয়াতসমূহ স্মরণ করিয়ে দিলে তারা অন্ধ বধিরের মতো পড়ে থাকে না।

এটি অত্যন্ত গভীর শিক্ষা।

কুরআন শুধু তিলাওয়াত করার বই নয়; এটি জীবন পরিচালনার হিদায়াত।

মুমিন যখন কুরআনের কোনো নির্দেশ শোনে, তখন সে নিজেকে প্রশ্ন করে

এই আয়াত আমার জীবনে কী পরিবর্তন চায়?

নামাজের আয়াত এলে নামাজের দিকে ফিরে যায়।
সত্যের নির্দেশ এলে সত্যবাদী হয়।
অন্যায় থেকে নিষেধ এলে নিজেকে সংশোধন করে।
তাওবার আহ্বান এলে তাওবা করে।
পিতামাতার অধিকার শুনলে তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করে।

এটাই কুরআনের সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্ক।

১৬. পরিবারমুমিনের দায়িত্ব দোয়ার ক্ষেত্র

ইবাদুর রহমান শুধু নিজের নাজাতের কথা ভাবে না। তারা পরিবারের জন্যও দোয়া করে

হে আমাদের রব! আমাদের এমন স্ত্রী সন্তানাদি দান করুন, যারা আমাদের চোখের শীতলতা হবে; আর আমাদের মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন।
সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭৪

দোয়া পরিবার সম্পর্কে ইসলামের অসাধারণ একটি আদর্শ তুলে ধরে।

একজন মুমিন এমন স্ত্রী চায়, যিনি ঈমান, চরিত্র সহযোগিতায় পরিবারের শান্তির কারণ হবেন। সে এমন সন্তান চায়, যারা আল্লাহকে ভালোবাসবে, নামাজ কায়েম করবে, সত্য বলবে, মানুষের উপকার করবে এবং নৈতিক চরিত্র ধারণ করবে।

কিন্তু শুধু দোয়া করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।

সন্তানের জন্য উত্তম পরিবেশ সৃষ্টি করতে হয়।
তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হয়।
তাদের শিক্ষা দিতে হয়।
নিজেদের আচরণ দিয়ে আদর্শ স্থাপন করতে হয়।

কারণ সন্তান শুধু উপদেশ শুনে শেখে না; তারা বাবা-মায়ের আচরণ দেখেও শেখে।

১৭. মুত্তাকীদের নেতা’—ক্ষমতার নয়, আদর্শের নেতৃত্ব

এই দোয়ায় বলা হয়েছে

আর আপনি আমাদের মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন।

এখানে নেতৃত্ব বলতে শুধু পদ, ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব বোঝায় না। বরং এমন মর্যাদা বোঝায়, যাতে একজন ব্যক্তি তাকওয়া, জ্ঞান, ন্যায়, চরিত্র সৎকর্মে অন্যদের জন্য আদর্শ হয়ে ওঠে।

ইসলামী নেতৃত্বের সৌন্দর্য হলো
নেতৃত্ব মানে সেবা,
নেতৃত্ব মানে আমানত,
নেতৃত্ব মানে ন্যায়,
নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব,
নেতৃত্ব মানে মানুষের অধিকার রক্ষা।

যে নিজের পরিবারে ন্যায় করতে পারে না, সে বড় নেতৃত্বের দাবি করলেও প্রকৃত অর্থে নেতৃত্বের আদর্শ পূরণ করতে পারে না।

১৮. সবরের পুরস্কারজান্নাতের সুউচ্চ কক্ষ

আল্লাহ বলেন

তারাই, যাদেরকে জান্নাতে সুউচ্চ কক্ষ প্রতিদান হিসেবে দেওয়া হবে, যেহেতু তারা সবর করেছিল…”

সবর ইসলামী জীবনের অন্যতম প্রধান গুণ।

সবর মানে শুধু বিপদে চুপ থাকা নয়। বরং

ইবাদতে অবিচল থাকা,
পাপ থেকে নিজেকে বিরত রাখা,
বিপদে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা,
অন্যায়ের জবাবে সীমালঙ্ঘন না করা,
সৎপথে চলতে গিয়ে কষ্ট সহ্য করাএসবই সবরের অন্তর্ভুক্ত।

দুনিয়ায় ধৈর্য অনেক সময় কঠিন মনে হয়, কিন্তু আখিরাতে এর পুরস্কার অপরিসীম।

১৯. জান্নাতউত্তম আবাস

আল্লাহ তাআলা ইবাদুর রহমান-এর গুণাবলি বর্ণনা করার পর তাঁদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন।

সেখানে থাকবে নিরাপত্তা, সম্মান, শান্তি স্থায়িত্ব।

দুনিয়ার ঘর যত সুন্দরই হোক, তা অস্থায়ী। দুনিয়ার সম্পদ যত বেশি হোক, একদিন তা রেখে যেতে হবে। দুনিয়ার সম্মান যত বড়ই হোক, মৃত্যুর সঙ্গে তা শেষ হয়ে যেতে পারে।

কিন্তু জান্নাতের জীবন স্থায়ী।

তাই মুমিনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হলোঈমান, তাকওয়া সৎকর্ম।

২০. ইবাদুর রহমান হওয়ার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন

সূরা আল-ফুরকানের এসব আয়াত একত্রে দেখলে ইবাদুর রহমান-এর জীবনচিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তারা

আকিদায় মুওয়াহহিদ,
চরিত্রে নম্র,
কথায় শান্ত,
রাতে ইবাদতকারী,
আখিরাতের ব্যাপারে সচেতন,
ব্যয়ে মধ্যপন্থী,
জীবনের মর্যাদা রক্ষাকারী,
পবিত্র জীবনযাপনকারী,
তাওবার মাধ্যমে ফিরে আসা মানুষ,
সত্যের সাক্ষী,
অনর্থক বিষয় থেকে দূরে থাকা ব্যক্তি,
কুরআনের নির্দেশ গ্রহণকারী,
পরিবারের জন্য কল্যাণকামী,
তাকওয়ার নেতৃত্বের প্রত্যাশী এবং
সবরের অধিকারী।

এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো গুণ নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী চরিত্রের বিভিন্ন দিক।

২১. বর্তমান সমাজে ইবাদুর রহমান-এর গুণাবলির প্রয়োজন

বর্তমান পৃথিবীতে জ্ঞান প্রযুক্তি বেড়েছে, কিন্তু মানুষের মধ্যে অস্থিরতা, অহংকার, হিংসা, প্রতারণা, অপচয়, অশ্লীলতা, মিথ্যা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব নৈতিক অবক্ষয়ও অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সূরা আল-ফুরকানের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

যদি মানুষ নম্র হতোঅহংকার কমত।
যদি মানুষ সত্যবাদী হতোপ্রতারণা কমত।
যদি মানুষ তাওহিদে দৃঢ় হতোভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে মুক্তি পেত।
যদি মানুষ পবিত্রতা রক্ষা করতপরিবার নিরাপদ হতো।
যদি মানুষ ব্যয়ে ভারসাম্য রাখতঅর্থনৈতিক চাপ কমত।
যদি মানুষ কুরআনের নির্দেশ গ্রহণ করতচরিত্র উন্নত হতো।
যদি পরিবারে ঈমান তাকওয়ার শিক্ষা থাকতসন্তানদের ভবিষ্যৎ সুন্দর হতো।
যদি মানুষ সবর সংযম শিখতঅনেক বিবাদ শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যেত।

২২. একজন শিক্ষার্থীর জীবনে ইবাদুর রহমান-এর শিক্ষা

একজন শিক্ষার্থীও ইবাদুর রহমান-এর গুণাবলি অর্জন করতে পারে।

সে শিক্ষকের সঙ্গে বিনয়ী হবে,
সহপাঠীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে,
মিথ্যা বলবে না,
নকল করবে না,
অন্যের অধিকার নষ্ট করবে না,
সময় অপচয় করবে না,
নামাজের প্রতি যত্নবান হবে,
কুরআন বুঝে পড়বে,
মাতা-পিতার সেবা করবে এবং
নিজের ভবিষ্যৎকে আখিরাতের সফলতার সঙ্গে যুক্ত করবে।

জ্ঞান তখনই কল্যাণকর হয়, যখন তা মানুষের চরিত্র উন্নত করে।

২৩. একজন শিক্ষক অভিভাবকের জন্য শিক্ষা

ইবাদুর রহমান-এর গুণাবলি শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয়। শিক্ষক, অভিভাবক, নেতা, ব্যবসায়ী, কর্মকর্তা, কর্মচারীসবার জন্যই প্রযোজ্য।

একজন শিক্ষক যদি নম্র হন, শিক্ষার্থীরা তাঁকে ভালোবাসবে।
তিনি যদি সত্যবাদী হন, শিক্ষার্থীরা সত্য শিখবে।
তিনি যদি নামাজ তাকওয়ায় যত্নবান হন, শিক্ষার্থীরা বাস্তব আদর্শ পাবে।
তিনি যদি রাগ সংযত করেন, শিক্ষার্থীরাও সংযম শিখবে।

অভিভাবকের ক্ষেত্রেও একই কথা।

সন্তানকে শুধু বলা—‘ভালো হও’—যথেষ্ট নয়। বরং নিজেদের জীবনকেই ভালো হওয়ার বাস্তব উদাহরণ বানাতে হবে।

২৪. আত্মশুদ্ধির একটি দৈনিক হিসাব

ইবাদুর রহমান-এর গুণ অর্জনের জন্য প্রত্যেক মুমিন নিজের কাছে প্রতিদিন কিছু প্রশ্ন রাখতে পারে

আমি কি আজ অহংকার করেছি?
আমি কি কাউকে কষ্ট দিয়েছি?
আমি কি অপ্রয়োজনীয় কথা বলেছি?
আমি কি নামাজে অবহেলা করেছি?
আমি কি কোনো হারাম কাজে জড়িয়েছি?
আমি কি অপচয় করেছি?
আমি কি কারও অধিকার নষ্ট করেছি?
আমি কি মিথ্যা বলেছি?
আমি কি কুরআনের কোনো নির্দেশ জেনে তা অমান্য করেছি?
আমি কি পরিবারের সঙ্গে উত্তম আচরণ করেছি?
আমি কি আজ আল্লাহর কাছে তাওবা করেছি?

এভাবে আত্মসমালোচনা মানুষকে ধীরে ধীরে সংশোধনের পথে নিয়ে যায়।

উপসংহার

সূরা আল-ফুরকানের ৬৩ থেকে ৭৬ নম্বর আয়াত যেন একজন মুমিনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ চরিত্র-মানচিত্র। এখানে ঈমান আছে, তাওহিদ আছে, ইবাদত আছে, বিনয় আছে, আত্মসংযম আছে, অর্থনৈতিক ভারসাম্য আছে, মানবাধিকারের মর্যাদা আছে, পবিত্রতা আছে, তাওবা আছে, সত্যবাদিতা আছে, অনর্থক বিষয় বর্জন আছে, কুরআনের প্রতি সাড়া আছে, পরিবার গঠনের আদর্শ আছে, সবর আছে এবং সর্বশেষে রয়েছে জান্নাতের সুসংবাদ।

অতএব ইবাদুর রহমান হওয়া শুধু মুখের দাবি নয়; এটি জীবনব্যাপী সাধনা।

চলনে নম্রতা,
কথায় সালাম,
রাতে ইবাদত,
হৃদয়ে আখিরাতের ভয়,
ব্যয়ে ভারসাম্য,
আকিদায় তাওহিদ,
জীবনে পবিত্রতা,
ভুলে তাওবা,
কথায় সত্য,
আচরণে সংযম,
কুরআনে সাড়া,
পরিবারে ভালোবাসা,
জীবনে সবর
এসবের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে ইবাদুর রহমান-এর চরিত্র।

দুনিয়ার মানুষ আমাদের সম্পদ, পদ কিংবা বাহ্যিক পরিচয়ে মূল্যায়ন করুক বা না করুকআমাদের প্রকৃত সাফল্য হলো আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া।

তাই প্রতিদিন আমাদের অন্তর থেকে উচ্চারিত হোক

হে আমাদের রব! আমাদেরকে আপনার অনুগত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
আমাদের অন্তরকে অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ রিয়া থেকে পবিত্র করুন।
আমাদের তাওহিদকে দৃঢ় করুন, ইবাদতকে কবুল করুন, চরিত্রকে সুন্দর করুন।
আমাদের পরিবারকে ঈমান, তাকওয়া শান্তির পরিবার বানান।
আমাদের সন্তানদের নেককার মুত্তাকি বানান।
পাপ হয়ে গেলে আন্তরিক তাওবার তাওফিক দিন।
বিপদে সবর, নিয়ামতে শুকর এবং সর্বাবস্থায় আপনার ওপর তাওয়াক্কুল করার তাওফিক দিন।
কুরআনের আয়াত শুনে অন্ধ বধিরের মতো না থেকে তা বুঝে গ্রহণ জীবনে বাস্তবায়নের তাওফিক দিন।
আমাদেরকে ইবাদুর রহমান-এর গুণাবলি অর্জনের তাওফিক দিন এবং কিয়ামতের দিন আপনার রহমতে জান্নাতের সুউচ্চ কক্ষে স্থান দিন।

আমিন

 

মন্তব্য করুন