সহকারী অধ্যাপক
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:৪৬ পূর্বাহ্ণ
স্রষ্টা আল্লাহ (মানবসৃষ্টির বিস্ময় ও আল্লাহর কুদরতের মহাগাথা) মোঃ মুজিবুর রহমান
স্রষ্টা আল্লাহ
(মানবসৃষ্টির বিস্ময় ও আল্লাহর কুদরতের মহাগাথা)
(সূরা আল-মুমিনূন : ১২–১৪-এর আলোকে)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
শ্রদ্ধাভরে রচিত হোক মহিমাময় এক মহাগাথা,
যে গাথায় জাগে তাওহীদের পবিত্র আলোকবারতা।
কে দিল মানুষকে জীবন, কে দিল প্রাণের আলো,
কে সাজাল দেহের মাঝে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভালো?
আসমান-জমিন সৃষ্টি করে যিনি মহান,
তাঁরই কুদরতে গড়া মানবজীবন।
অন্ধকার গর্ভে যখন ছিল না কোনো পরিচয়,
তখনও আল্লাহ জানতেন তার ভবিষ্যৎময় পরিচয়।
তিনি রব, তিনি মালিক, তিনিই সৃষ্টিকর্তা,
তাঁরই হুকুমে জাগে প্রাণ, জাগে সৃষ্টির বারতা।
মানুষ যতই জ্ঞানী হোক, যতই বাড়ুক জ্ঞান,
স্রষ্টার কুদরত বোঝার নয় কোনো পূর্ণ অবসান।
মানুষের আদি পিতা আদম আলাইহিস সালাম,
মাটি থেকে সৃষ্টি—এ সত্য অম্লান।
মাটির উপাদানে গড়া মানুষের দেহ,
স্রষ্টার নিদর্শন এতে প্রকাশিত সর্বদেহ।
কেউ মাটি চেনে শুধু ধূলি বলে ক্ষণিক,
কেউ দেখে তাতে স্রষ্টার নিপুণ কারিগরি অনুপম দিক।
মাটির বুকেই জন্মে খাদ্য, ফলে প্রাণের ধারা,
সেই খাদ্যেই গড়ে মানুষ—কী বিস্ময় ভরা সারা!
মাটি থেকে উদ্ভিদ, উদ্ভিদ থেকে আহার,
আহারে গড়ে দেহ—কুদরত অপার।
তাই মানুষ যেন ভুলে না যায় নিজের পরিচয়,
সৃষ্টির পেছনে আছেন এক আল্লাহ—তাঁরই মহিমাময় জয়।
মানুষের পরবর্তী সৃষ্টি—এক ক্ষুদ্র নুতফাহ,
অতি সামান্য উপাদানে লুকায় জীবনের দিশা।
চোখে যার মূল্য যেন প্রায় কিছুই নয়,
আল্লাহর হুকুমে তাতেই ভবিষ্যৎ মানুষ রয়।
কে দিল তাকে গন্তব্য, কে দিল তাকে পথ?
কে রাখল সম্ভাবনা, কে করল জীবন রথ?
মানুষ ভাবে—আমি নিজেই আমার জীবনের কারিগর,
কুরআন শেখায়—তোমার রবই সৃষ্টির মহাস্রষ্টা, সর্বশক্তিধর।
ক্ষুদ্র সূচনায় লুকিয়ে থাকে বিরাট এক কাহিনি,
কুদরতের সামনে মানুষ সত্যিই কত ক্ষীণ প্রাণী!
অহংকার কেন তবে, কেন এত গর্ব?
যে জীবন নিজে বানাতে পারে না, সে কীসের এত সর্ব?
নুতফাহ থেকে আল্লাহ করেন ‘আলাকার সৃষ্টি,
ধাপে ধাপে প্রকাশ পায় তাঁর হিকমতের দৃষ্টি।
গর্ভের অন্ধকারে চলে সৃষ্টির আয়োজন,
মানুষের অজানা জগতে আল্লাহরই নিয়ন্ত্রণ।
তিন অন্ধকারের আড়ালে থাকে মানবশিশু গড়ে,
কেউ দেখে না সেখানে কী ঘটে অন্তরে।
তবু প্রতিটি ধাপে ধাপে রয়েছে পরিমিত বিধান,
স্রষ্টার জ্ঞান থেকে কিছুই নয় গোপন বা অজান।
কুরআন মানুষকে ডাকে ভাবতে, দেখতে, জানতে,
নিজের সৃষ্টি নিয়ে একটু গভীরভাবে ভাবতে।
যে নিজের শুরু জানে, সে বিনয়ী হয় প্রাণে,
স্রষ্টার মহিমা খোঁজে সে জীবনের প্রতিটি টানে।
‘আলাকাহ থেকে মুদগাহ—আরও এক নতুন ধাপ,
সৃষ্টির ধারায় ফুটে ওঠে রবের কুদরতের ছাপ।
যে ছিল অতি ক্ষুদ্র, তারই রূপ বদলায়,
আল্লাহর নির্ধারিত নিয়মে জীবন সামনে যায়।
ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে ভবিষ্যতের মানবদেহ,
প্রতিটি পর্যায়ে আছে স্রষ্টার হিকমত গভীর।
মানুষ নিজেকে যত বড়ই ভাবুক না কেন,
নিজের সৃষ্টি রহস্যে সে আজও কত অজ্ঞান!
জ্ঞান অর্জন করো—কুরআন দেয় সেই আহ্বান,
কিন্তু জ্ঞানের শেষে রেখো আল্লাহর সম্মান।
বিজ্ঞান যদি দেখে সৃষ্টির বাহ্যিক রূপ,
ঈমান দেখে তাতে স্রষ্টার কুদরতের অনুপম ছাপ।
মুদগাহ থেকে আসে অস্থির পর্যায়,
দেহের কাঠামো ধীরে ধীরে গড়ে যায়।
কী অপূর্ব বিন্যাস—কী নিখুঁত বিধান,
অস্থি, অঙ্গ, কাঠামো—সবই তাঁর দান।
হাত হবে কোথায়, পা হবে কোনখানে,
চোখ-মুখ ফুটে উঠবে কোন অপরূপ টানে—
মানুষ কি নিজ হাতে লিখেছে নিজের নকশা?
না, আল্লাহর কুদরতেই জীবনের এই ভাষা।
কঙ্কাল যেন দেহের শক্ত ভিত্তির মতো,
সৃষ্টির প্রতিটি ধাপই উদ্দেশ্যপূর্ণ যত।
যে স্রষ্টা অস্থির কাঠামো গড়েন এমন করে,
তাঁর কুদরত দেখে মুমিন নত হয় অন্তরে।
অতঃপর অস্থিকে আবৃত করা হলো মাংস দিয়ে,
দেহ পেল সৌন্দর্য, পেল পূর্ণতার ছায়া নিয়ে।
যেখানে প্রয়োজন কম, যেখানে প্রয়োজন বেশি,
আল্লাহর হিকমতে গড়ে ওঠে দেহের প্রতিটি অংশই।
কোথাও হাত, কোথাও পা, কোথাও হৃদয় প্রাণ,
কোথাও চোখে দৃষ্টি, কোথাও কানে শ্রবণদান।
জিহ্বায় দিলেন ভাষা, মনে দিলেন চিন্তা,
মানুষ পেল বোধশক্তি—কী মহান সেই দাতা!
একটি চোখের মূল্য বোঝে সে হারালে চোখ,
একটি কানের মূল্য বোঝে যখন শ্রবণ হয় ক্ষীণ।
সুস্থ দেহের প্রতিটি অঙ্গ আল্লাহর অনুগ্রহ,
তাই শুকরিয়ায় ভরে উঠুক মুমিনের হৃদয়।
তারপর—“অন্য এক সৃষ্টিরূপে” তাকে গড়লেন মহান,
পূর্ণতার পথে এগিয়ে গেল মানবজীবন।
শুধু দেহ নয়—বিবেক, বোধ, দায়িত্বের ভার,
মানুষ হলো পরীক্ষিত বান্দা—জীবন হলো আমানত তার।
সে শুনতে পারে, দেখতে পারে, চিনতে পারে সত্য,
ভুলের পরে তাওবা করে ফিরতে পারে যথার্থ।
ভালো-মন্দের পথের মাঝে পেয়েছে নির্বাচন,
এই দুনিয়া হলো পরীক্ষা—আখিরাত চূড়ান্ত স্থান।
এই দেহ ক্ষণস্থায়ী, জীবনও ক্ষণিক,
চিরস্থায়ী নয় পৃথিবীর কোনো সুখ-দুঃখের দিক।
আজ যে শিশু, কাল সে যুবক, একদিন হবে বৃদ্ধ,
অবশেষে মৃত্যুর ডাকে থামবে জীবনের গতি।
সবশেষে কুরআন জাগায় হৃদয়ের মহাধ্বনি—
“ফাতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকীন” ধ্বনি।
কত বরকতময় আল্লাহ, সর্বোত্তম স্রষ্টা তিনি,
তাঁরই কুদরত ছড়িয়ে আছে বিশ্বজগতজুড়ি।
মানুষ পারে গড়তে, পারে সাজাতে, পারে রূপ দিতে,
কিন্তু আল্লাহ ছাড়া কেউ পারে না শূন্য থেকে সৃষ্টি করতে।
কারিগর উপকরণ নেয়, জোড়া দিয়ে গড়ে রূপ,
আল্লাহই উপকরণেরও স্রষ্টা—তাঁর কুদরত অনুপম।
তাই কোনো সৃষ্টিকে স্রষ্টার আসনে বসিও না,
আল্লাহর বিশেষ গুণে কাউকে শরিক করো না।
তাওহীদের আলোয় রাখো হৃদয়ের বিশ্বাস,
শিরক থেকে বেঁচে থাকাই মুমিনের বড় আশ্বাস।
হে মানুষ, তুমি কে?—একদিন ছিলে ক্ষুদ্র,
আজ কেন তবে অহংকারে হৃদয় হলো কঠিন?
যে দেহের শুরু তুমি নিজেও জানো না,
সে দেহ নিয়ে কেন রবের সামনে মাথা নত করো না?
ধন আছে—কাল থাকবে কি, কে জানে?
ক্ষমতা আছে—কতক্ষণ থাকবে তা কে জানে?
যৌবন আছে—বার্ধক্য এসে করবে তাকে ক্ষয়,
জীবন আছে—মৃত্যু এসে থামাবে সবময়।
তাই অহংকার নয়, চাই বিনয়ের পথ,
সত্যের পথে চলাই হোক জীবনের শপথ।
আল্লাহর বান্দা যে, সে বিনয়ী হয়,
মানুষকে সম্মান দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়।
জ্ঞান অর্জন করো, কিন্তু জ্ঞানে যেন গর্ব না আসে,
জ্ঞান যেন মানুষকে রবের নৈকট্যে ভালোবাসে।
বিজ্ঞান শেখো, সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করো,
কিন্তু স্রষ্টাকে ভুলে গিয়ে জ্ঞানের অহংকার করো না।
সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা মানুষকে জ্ঞানী করে,
স্রষ্টার নিদর্শন দেখে ঈমান জাগে অন্তরে।
জ্ঞান যদি বিনয় শেখায়—সে জ্ঞান কল্যাণময়,
জ্ঞান যদি অহংকার শেখায়—সে জ্ঞান বিপদময়।
কুরআন চিন্তার দ্বার খুলে দেয় বারবার,
সৃষ্টির মাঝে দেখায় রবের নিদর্শন অপার।
তাই জ্ঞানী হও, কর্মী হও, সৎ হও প্রাণে,
আল্লাহর আনুগত্য রাখো জীবনের প্রতিটি টানে।
মায়ের গর্ভের অন্ধকার—কী রহস্যময় স্থান,
সেখানে বেড়ে ওঠে ভবিষ্যতের মানবজীবন।
না আছে তার নিজের কোনো আয়োজন,
তবু চলে সৃষ্টির মহান পরিকল্পনা নিরন্তর।
মা জানেন না শিশুর প্রতিটি গঠন কীভাবে হয়,
শিশুও জানে না তার ভবিষ্যৎ কী পরিচয়।
কিন্তু আল্লাহ জানেন সব—অতীত ও ভবিষ্যৎ,
তাঁর জ্ঞান পরিব্যাপ্ত—গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু।
তাই মায়ের মর্যাদা রেখো হৃদয়ের মাঝে,
তার কষ্টের কথা স্মরণ রেখো জীবনের কাজে।
যে গর্ভে মানুষ বেড়ে ওঠে আল্লাহর হুকুমে,
সে মায়ের সেবা হোক সন্তানের জীবনের অনুপম গুণে।
এই দেহ আমার নয়—এ রবের দেওয়া আমানত,
এই প্রাণও তাঁর দান—এ সত্য অতি অনন্ত।
চোখ পেয়েছি—তাই দেখি সত্য ও সঠিক পথ,
কান পেয়েছি—শুনি কুরআন, শুনি কল্যাণের কথা।
জিহ্বা পেয়েছি—মিথ্যা নয়, বলি সুন্দর বাণী,
হাত পেয়েছি—জুলুম নয়, করি মানুষের সেবা জানি।
পা পেয়েছি—হারাম পথে নয়, চলি ন্যায়ের পথে,
হৃদয় পেয়েছি—রাখি তাওহীদ, ইখলাস তার সাথে।
যে অঙ্গ আল্লাহ দিয়েছেন, তার হবে জিজ্ঞাসা,
কী কাজে ব্যবহার করেছি—সেটিই হবে পরীক্ষা।
তাই জীবনকে করো না অবহেলায় নষ্ট,
সৎকর্মে ভরিয়ে দাও জীবনের প্রতিটি ক্ষণ স্পষ্ট।
মানুষ শুধু খাবে, ঘুমাবে—এ জন্য নয় সৃষ্টি,
আল্লাহর ইবাদতই জীবনের মূল দৃষ্টি।
দুনিয়ার কর্মে থেকেও রবকে রেখো মনে,
হালাল পথে উপার্জন করো, সততা রেখো প্রাণে।
পিতা-মাতার সেবা করো, আত্মীয়কে দাও হক,
দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াও—এটাই ঈমানের ডাক।
অন্যের অধিকার নষ্ট করে সুখ খুঁজো না,
জুলুম করে দুনিয়াতে সফলতা ভেবো না।
সত্য বলো, আমানত রাখো, প্রতারণা বর্জন,
হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে করো হৃদয় নির্মল।
মানুষের প্রতি দয়া রাখো, ক্ষমা করো ভুল,
তবে আল্লাহর বিধান ভেঙে নয়—সত্যের পথেই চল।
আজ যে দেহে প্রাণের স্পন্দন, কাল হবে নিস্তব্ধ,
আজ যে চোখে পৃথিবী দেখা, কাল হবে অবসন্ন।
মৃত্যু কোনো গল্প নয়—প্রত্যেক প্রাণীর সত্য,
তারপর রবের সামনে হবে কর্মের হিসাব যথার্থ।
কবরের পথে যাবে মানুষ—ধন যাবে না সাথে,
ক্ষমতা যাবে না, থাকবে না প্রাসাদ পাশে।
থাকবে ঈমান, থাকবে আমল, থাকবে রবের দয়া,
সৎকর্মের ফলই তখন হবে বান্দার আশ্রয়।
তাই মৃত্যুকে স্মরণ করো, কিন্তু নিরাশ হয়ো না,
তাওবা করে রবের রহমত থেকে দূরে যেয়ো না।
আল্লাহ ক্ষমাশীল, বান্দা ফিরে এলে তিনি দয়া করেন,
সত্য তাওবার মাধ্যমে বান্দা কল্যাণের পথে ফেরে।
আকাশের তারা বলে—স্রষ্টা আছেন মহান,
সূর্যের আলো বলে—তাঁরই কুদরত দান।
চাঁদের সৌন্দর্য বলে—তাঁরই হুকুম চলে,
বাতাস, বৃষ্টি, নদী—সব তাঁর ইশারায় দোলে।
পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে তাঁরই হুকুমে স্থির,
সমুদ্রের ঢেউয়ে জাগে তাঁর শক্তির নীর।
পাখি আকাশে উড়ে তাঁরই দেওয়া ডানায়,
মানুষ চিন্তা করে—কে তাকে জ্ঞান দিল প্রাণায়?
নিজের শরীর দেখো—অসংখ্য নিদর্শন,
হৃদয়ের স্পন্দন, চোখের দৃষ্টি—সবই তাঁর দান।
তাই সৃষ্টি দেখে স্রষ্টাকে চিনো হে মানুষ,
তাঁরই সামনে নত করো অহংকারের মাথাটুকু।
শিশু হয়ে জন্ম মানুষ, অন্যের সাহায্য চায়,
নিজে দাঁড়াতে পারে না, মা তাকে কোলে নেয়।
তারপর সে বেড়ে ওঠে, শক্তি পায় ধীরে,
একদিন বার্ধক্য আসে—শক্তি যায় ফিরে।
যে যুবক আজ বলে—“আমি শক্তিশালী খুব”,
সময় তাকে শেখায়—মানুষ আসলে কত ক্ষুদ্র।
বার্ধক্য যখন আসে, দুর্বল হয় দেহ,
তখনও রবের দয়া ছাড়া নেই কোনো গতি-প্রবাহ।
তাই শক্তির দিনে দুর্বলকে করো না অবহেলা,
ক্ষমতার দিনে করো না জুলুমের খেলা।
আজ তুমি শক্তিশালী—কাল হতে পারো দুর্বল,
আল্লাহর ভয় রাখো, তবেই জীবন হবে সফল।
সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ—সবই রবের হাতে,
তাঁরই হুকুমে জীবন আসে, তাঁরই হুকুমে মাতে।
তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই সৃষ্টির অধিকার,
ইবাদত, দোয়া, ভরসা—তাঁরই প্রাপ্য অপার।
সৃষ্টির প্রতি সম্মান থাকবে, কিন্তু ইবাদত নয়,
আল্লাহ ছাড়া কারও জন্য সিজদা বৈধ নয়।
মুমিনের হৃদয়ে থাকবে তাওহীদের আলো,
শিরকের অন্ধকার থেকে দূরে থাকবে ভালো।
আল্লাহর গুণে কাউকে সমকক্ষ করা নয়,
তাঁর সৃষ্টিকে রবের আসনে বসানো নয়।
তিনি স্রষ্টা, আমরা সবাই তাঁর বান্দা,
এই বিশ্বাসেই মুক্তির পথে মুমিনের বন্ধন বাঁধা।
চোখের জন্য শুকরিয়া, কানের জন্য শুকরিয়া,
হৃদয়ের জন্য শুকরিয়া, জীবনের জন্য শুকরিয়া।
বুদ্ধি দিয়েছেন—শুকরিয়া, জ্ঞান দিয়েছেন—শুকরিয়া,
ঈমানের পথে চলার সুযোগ—এও বড় নিয়ামতিয়া।
খাদ্য পেলে বলো—আলহামদুলিল্লাহ,
সুস্থতা পেলে বলো—আলহামদুলিল্লাহ।
বিপদে ধৈর্য ধরো, সুখে করো শুকর,
রবের স্মরণে কাটুক জীবনের প্রতিটি প্রহর।
শুকর শুধু মুখের কথা নয়, কাজে তার প্রমাণ,
নিয়ামতকে সঠিক পথে ব্যবহার করাই শুকরির বিধান।
আল্লাহর দেওয়া শক্তি দিয়ে অন্যায় করো না,
তাঁর দেওয়া সম্পদ দিয়ে পাপের পথ ধরো না।
কুরআন শুধু তিলাওয়াতের পবিত্র গ্রন্থ নয়,
জীবন গড়ার পথনির্দেশ—তার মাঝে সত্যময়।
সৃষ্টির কথা বলে সে, বলে মানুষের পরিচয়,
বলে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব, আখিরাতের চূড়ান্ত জয়।
কুরআন পড়ে ভাবো—আমি কোথা থেকে এলাম?
কেন আমাকে পাঠানো হলো? কোথায় হবে আমার অবসান?
জীবন যদি হয় পরীক্ষা, তবে আমল কী আমার?
রবের সামনে দাঁড়ালে কী হবে জবাবদিহির ভার?
এই প্রশ্ন জাগুক মনে, জাগুক ঈমান,
অন্যায় থেকে ফিরুক প্রাণ, সুন্দর হোক জীবন।
কুরআনের আলোয় গড়ে উঠুক পরিবার ও সমাজ,
সত্য, ন্যায়, দয়া, আমানতে হোক মানবতার সাজ।
আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন জ্ঞান ও বিবেক,
দিয়েছেন বুঝবার শক্তি—সত্য-মিথ্যার পার্থক্য।
এই নেয়ামত দায়িত্ব, শুধু গৌরব নয়,
সৎ পথে ব্যবহার করলেই এর সার্থকতা হয়।
জ্ঞানী হয়ে জুলুম করলে জ্ঞান হয় অভিশাপ,
ক্ষমতা পেয়ে অন্যায় করলে বাড়ে গুনাহের চাপ।
ধন পেয়ে কৃপণ হলে হারায় কল্যাণ,
আর দানশীল হলে পায় রবের সন্তুষ্টির দান।
মানুষের আসল সৌন্দর্য শুধু মুখের রূপে নয়,
চরিত্র, তাকওয়া, আমল—সেখানেই মর্যাদা হয়।
অন্তর যদি নির্মল হয়, জীবন হয় সুন্দর,
আল্লাহর কাছে তাকওয়াই মর্যাদার মূল মাপকাঠি নির্ভর।
কেন হৃদয় ধুকধুক করে? কে রাখে তাকে সচল?
কেন ঘুমিয়ে পড়েও মানুষ সকালে হয় সবল?
কে দেয় ক্ষুধা, কে দেয় খাদ্য হজমের শক্তি?
কে দেয় চোখে দৃষ্টি, কানে শ্রবণের ভক্তি?
মানুষ শুধু বলে—“প্রকৃতি”, “নিয়ম”, “ব্যবস্থা”,
কিন্তু মুমিন দেখে—এসবও রবেরই ব্যবস্থা।
নিয়ম আছে—নিয়মদাতা কে, ভাবো একবার,
সৃষ্টি আছে—স্রষ্টা কে, খুঁজে দেখো অন্তরজুড়ে আবার।
কারণ-উপকরণ সবই আল্লাহর সৃষ্টি,
তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কোনো কিছুর নেই স্বাধীন শক্তি।
তাই জ্ঞান ও ঈমান পাশাপাশি চলুক,
সৃষ্টির বিস্ময়ে স্রষ্টার মহিমা হৃদয়ে জ্বলুক।
যে জানে তার শুরু ক্ষুদ্র—সে কেন হবে গর্বিত?
যে জানে তার শেষ মৃত্যু—সে কেন হবে উদ্ধত?
আজকের সৌন্দর্য কাল হবে মাটির ধূলি,
আজকের ক্ষমতা কাল হারাবে তার বুলি।
তাই নরম হও, বিনয়ী হও, সত্যের পথে চলো,
অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়াও, মানুষের হৃদয় জুড়াও ভালো।
কারও দুর্বলতাকে নিয়ে হাসাহাসি করো না,
নিজের নিয়ামত নিয়ে অহংকারে ভেসে যেয়ো না।
আল্লাহ যাকে চান সম্মান দেন, যাকে চান পরীক্ষা,
সুখ-দুঃখ উভয়ই বান্দার জন্য হতে পারে শিক্ষা।
মুমিন তাই বিপদে ধৈর্য ধরে, সুখে করে শুকর,
প্রতিটি অবস্থায় রবের ওপর রাখে পূর্ণ ভরসা ও সুকর।
শিক্ষক যদি জ্ঞান দেন—তাতে যেন থাকে আমানত,
শিক্ষার্থী যদি জ্ঞান নেয়—তাতে থাকুক আদব-শিষ্টতা।
জ্ঞান যেন শুধু পরীক্ষার খাতায় সীমাবদ্ধ না হয়,
জ্ঞান যেন চরিত্র গড়ে, সত্যের পথে মানুষকে নেয়।
শিক্ষক শেখাবেন—স্রষ্টাকে ভুলে যেও না,
শিক্ষার্থী বলবে—সত্য জেনে তা ত্যাগ করব না।
বইয়ের জ্ঞান আর জীবনের জ্ঞান হোক একসাথে,
কুরআন-সুন্নাহর আলো থাকুক নৈতিকতার সাথে।
শিক্ষা যদি মানুষকে মানুষ না করে তো কী লাভ?
ডিগ্রি থাকলেই কি পূর্ণ হলো জীবনের সব ভাব?
জ্ঞান, মনুষ্যত্ব, তাকওয়া, সৎগুণের চর্চা—
এসব মিলেই গড়ে ওঠে সফল জীবনের সার্থকতা।
যে মানুষ নিজের সৃষ্টি নিয়ে ভাবে গভীরভাবে,
সে অন্যের হক নষ্ট করবে কি সহজভাবে?
যে জানে আল্লাহ দেখেন তার গোপন প্রতিটি কাজ,
সে কি করবে অন্যায়, করবে মানুষের সর্বনাশ?
তাই ঘর থেকে শুরু হোক নৈতিকতার শিক্ষা,
সন্তানের মনে গড়ে উঠুক ঈমানের দীক্ষা।
বাবা-মা হোক আদর্শ, শিক্ষক হোক পথপ্রদর্শক,
সমাজে জাগুক সত্য, ন্যায়, দয়া ও সৌহার্দ্যবোধ।
ঘুষ, প্রতারণা, মিথ্যা, জুলুম হোক পরিত্যক্ত,
আমানত, সততা, ন্যায়বোধ হোক প্রতিষ্ঠিত।
মানুষ মানুষকে সম্মান করুক—হোক সমাজ সুন্দর,
আল্লাহর বিধান মেনে চলাই হোক জীবনের মুকুটধার।
একদিন সব মানুষকে রবের সামনে দাঁড়াতে হবে,
কেউ পালাতে পারবে না, কেউ লুকাতে পারবে না তবে।
যে দেহ গড়লেন তিনি, সেই দেহেরই হিসাব,
কীভাবে কাটালে জীবন—সেটিই হবে জবাব।
জ্ঞান ছিল—কী করলে? শক্তি ছিল—কোথায় দিলে?
সম্পদ ছিল—কোন পথে ব্যয় করলে?
সময় ছিল—কীভাবে কাটালে জীবনের দিন?
ঈমান ছিল—কতটা ছিল আমলে তার রঙিন?
তাই আজই নিজেকে গড়ে নাও, কাল হয়তো দেরি,
মৃত্যুর আগে তাওবা করো—এটাই বুদ্ধির ফেরি।
গুনাহ হলে ফিরে এসো, রবের দরজায় যাও,
ইস্তিগফারে ভরে হৃদয়—ক্ষমা প্রার্থনা করো।
নুতফাহ থেকে আলাকাহ, আলাকাহ থেকে মুদগাহ,
অস্থি থেকে মাংস—কী বিস্ময়ময় দিগন্তের দিশা!
তারপর অন্য সৃষ্টি—পূর্ণ মানবজীবন,
সকল পর্যায়ে ফুটে ওঠে আল্লাহর কুদরত-চিহ্ন।
যে মানুষ নিজের শরীর নিয়ে গর্ব করে,
সে যেন একবার নিজের সূচনাটুকু স্মরণ করে।
যে মানুষ ক্ষমতা নিয়ে অহংকারে হয় অন্ধ,
সে যেন মনে রাখে—মৃত্যু একদিন করবে তাকে নিঃস্ব।
মানুষ যতই জানুক, রবের জ্ঞান অসীম,
মানুষ যতই গড়ুক, আল্লাহর সৃষ্টি অনুপম।
সৃষ্টির বিস্ময় শেষ হবে না কোনোদিন,
আল্লাহর কুদরত থাকবে চিরকাল অমলিন।
হে আল্লাহ, তুমি রব, তুমি মহান স্রষ্টা,
তোমারই হুকুমে জাগে জীবনের বারতা।
তুমি দিলে নুতফাহ, তুমি দিলে দেহের রূপ,
তোমারই কুদরতে মানুষ হলো অপূর্ব অনুপম।
তুমি দিলে চোখ, তুমি দিলে শ্রবণ,
তুমি দিলে বিবেক, দিলে হৃদয়ে স্পন্দন।
তুমি দিলে জীবন, দিলে হিদায়াতের পথ,
তোমারই সন্তুষ্টি হোক আমাদের জীবনের রথ।
তোমার নিয়ামতে ভরা এই দেহ-মন-প্রাণ,
তোমারই দেওয়া সময়, তোমারই দেওয়া জ্ঞান।
তাই তোমারই ইবাদত করি, তোমাকেই করি স্মরণ,
তোমার বিধান মেনে চলাই হোক জীবনের শপথ-ধারণ।
অহংকার ত্যাগ করব, মিথ্যা ত্যাগ করব,
জুলুম-প্রতারণা থেকে নিজেকে দূরে রাখব।
হারাম পথ ছেড়ে দেব, হালাল পথে চলব,
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সত্য কথা বলব।
পিতা-মাতার সেবা করব, আত্মীয়ের হক দেব,
অসহায়ের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার হাত ধরব।
শিক্ষাকে কাজে লাগাব, জ্ঞানকে করব আলো,
নিজে ভালো হব, অন্যকেও ভালোবাসব ভালো।
দেহ আল্লাহর আমানত—রাখব তাকে পবিত্র,
মন আল্লাহর দিকে রাখব—করব অন্তর নির্মল।
জীবন ক্ষণস্থায়ী জেনে আখিরাতকে চাইব,
কুরআন-সুন্নাহর আলোয় নিজেকে গড়ব, গড়াব।
হে সর্বোত্তম স্রষ্টা, তুমি মহান,
তোমার কুদরত অপরিসীম, অসীম তোমার জ্ঞান।
মানবসৃষ্টির প্রতিটি ধাপে দেখি তোমার নিদর্শন,
তোমারই মহিমায় পূর্ণ হোক আমাদের অন্তর-মন।
ক্ষুদ্র সূচনা থেকে পূর্ণ মানবদেহ—
তোমার কুদরত ছাড়া সম্ভব নয় কিছুই যে।
তাই তোমার সামনে নত করি অহংকারের শির,
তোমার রহমত ছাড়া আমরা সবাই অসহায়, ক্ষীণ ও অধীর।
হে আল্লাহ, জ্ঞান দাও—যে জ্ঞান ঈমান বাড়ায়,
বিবেক দাও—যে বিবেক সত্যের পথে চালায়।
আমল দাও—যে আমল তোমার সন্তুষ্টি আনে,
তাকওয়া দাও—যে তাকওয়া গোপনেও তোমাকে মানে।
আমাদের দেহ, মন, প্রাণ—সব করো পবিত্র,
শিরক, কুফর, অহংকার থেকে রাখো অন্তর নির্মল।
কুরআন-সুন্নাহর পথে রাখো অবিচল,
সত্য, ন্যায়, দয়া, আমানতে করো জীবন সফল।
যেদিন ফিরতে হবে তোমারই দরবারে,
সেদিন যেন ঈমান থাকে আমাদের অন্তরে।
গুনাহ ক্ষমা করো, তাওবা কবুল করো,
জীবনের শেষ নিঃশ্বাসে ঈমান অটুট রাখো।
হে আল্লাহ—তোমার সন্তুষ্টিই হোক জীবনের আশা,
তোমার রহমতই হোক আমাদের শেষ ভরসা।
দুনিয়ায় দাও কল্যাণ, আখিরাতে দাও নাজাত,
ঈমানের সাথে মৃত্যু দাও—এটাই আমাদের মিনতি-প্রার্থনা আজ।
ফাতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকীন—
সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ, মহান ও চিরমহিমান্বিত তিনি।
তাঁরই নামে শুরু হোক জীবন, তাঁরই নামে শেষ,
তাঁর সন্তুষ্টির পথে চলাই হোক জীবনের শ্রেষ্ঠ আবেশ।
হে আল্লাহ, আমাদের বুঝার তৌফিক দাও,
কুরআনের শিক্ষা জীবনে বাস্তবায়নের তৌফিক দাও।
ঈমান, তাকওয়া, ইখলাস ও সৎকর্মে জীবন সাজাও,
দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দাও।
আমিন
৭
৭ মন্তব্য