অধ্যক্ষ
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৮:৫৬ অপরাহ্ণ
কোরআন ও হাদিসের আলোকে হাই তোলা সম্পর্কে।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে হাই তোলা সম্পর্কে।
১. হাই তোলা সম্পর্কে কোরআনের নির্দেশ
কোরআনে হাই তোলা নিয়ে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট আয়াত নেই। তবে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আর তোমরা তোমাদের রবকে বিনীতভাবে ও গোপনে
ডাকো। নিশ্চয়ই তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।”
— সুরা আল-আ‘রাফ,
৭:৫৫
এই আয়াত হাই তোলার সরাসরি বিধান নয়। তাই হাই তোলা সম্পর্কে মূল নির্দেশনা আমাদের সহিহ হাদিস থেকে জানতে হবে।
২. হাই তোলা শয়তানের পক্ষ থেকে, হাদিসে কী আছে?
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“হাই তোলা শয়তানের পক্ষ থেকে। অতএব,
তোমাদের কেউ যখন
হাই তোলে, তখন সে যেন তা যথাসম্ভব প্রতিহত করে।”
— সহিহ বুখারি: ৩২৮৯;
সহিহ মুসলিম:
২৯৯৪
আরেক বর্ণনায় এসেছে:
“তোমাদের কেউ যখন হাই তোলে,
তখন সে যেন তার
মুখের ওপর হাত রাখে, কারণ শয়তান তার মুখে প্রবেশ করে।”
— সহিহ মুসলিম: ২৯৯৫
এর অর্থ কী?
এখানে “শয়তানের পক্ষ থেকে” কথাটির অর্থ এই নয় যে, হাই তোলা নিজেই কোনো গুনাহ বা মানুষ ইচ্ছা করে শয়তানের কাজ করছে। বরং হাদিসে হাই তোলার সময় অসতর্কতা, অলসতা ও অনিয়ন্ত্রিত আচরণ থেকে বিরত থাকতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
৩. হাই উঠলে কী করতে হবে?
১. যথাসম্ভব হাই আটকে রাখার চেষ্টা করা
রাসুল ﷺ বলেছেন:
“যখন তোমাদের কারও হাই আসে,
তখন সে যেন
যথাসম্ভব তা প্রতিহত করে।”
— সহিহ বুখারি: ৬২২৬;
সহিহ মুসলিম: ২৯৯৪
অর্থাৎ, হাই উঠলে মুখ বড় করে না খুলে, সম্ভব হলে তা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা সুন্নাহ।
২. মুখ ঢেকে রাখা
হাই পুরোপুরি আটকানো সম্ভব না হলে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখতে হবে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমাদের কেউ যখন হাই তোলে,
তখন সে যেন তার
হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখে।”
— সহিহ মুসলিম: ২৯৯৫
কোন হাত?
হাদিসে নির্দিষ্টভাবে ডান বা বাম হাত বলা
হয়নি। তাই যে হাত দিয়ে সহজে মুখ ঢেকে রাখা যায়, তা ব্যবহার করা যায়।
৩. হাই তোলার সময় শব্দ না করা
হাই তোলার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে “আহ”, “হা হা” বা জোরে শব্দ করা অনুচিত। হাদিসে হাইকে নিয়ন্ত্রণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাসুল ﷺ বলেছেন:
“যখন তোমাদের কেউ হাই তোলে,
তখন সে যেন তার
মুখের ওপর হাত রাখে এবং ‘হা’ শব্দ না করে।”
— সুনান আবু দাউদ: ৫০২৬
(হাদিসটির অর্থ সহিহ বর্ণনার সঙ্গে
সামঞ্জস্যপূর্ণ)
৪. হাই তোলার সময় “আউযুবিল্লাহ” বা “আলহামদুলিল্লাহ” বলতে হবে কি?
অনেকের ধারণা, হাই উঠলে “আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম” বলতে হয়। কিন্তু হাই তোলার সময় এটি বলার নির্দিষ্ট কোনো সহিহ হাদিস নেই।
আবার, হাঁচি দিলে “আলহামদুলিল্লাহ” বলা সুন্নাহ, কিন্তু হাই তোলার পর “আলহামদুলিল্লাহ” বলার বিধান নেই।
সুতরাং:
- হাই উঠলে: মুখ ঢাকবেন, নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবেন।
- হাঁচি দিলে: “আলহামদুলিল্লাহ” বলা সুন্নাহ।
- হাই তোলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া সহিহ হাদিসে প্রমাণিত নয়।
৫. হাই তোলা কি গুনাহ?
না, স্বাভাবিকভাবে হাই তোলা নিজে গুনাহ নয়। এটি মানুষের স্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া। তবে হাই তোলার সময় মুখ না ঢেকে, ইচ্ছাকৃত শব্দ করে বা অশোভনভাবে আচরণ করা ইসলামের আদবের পরিপন্থী।
যদি হাই অনিচ্ছাকৃতভাবে আসে এবং আপনি তা আটকাতে না পারেন, তাহলে এতে গুনাহ হবে না। কারণ আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।
“আল্লাহ কাউকেও তার সাধ্যের অতিরিক্ত
দায়িত্ব দেন না।”
— সুরা আল-বাকারা,
২:২৮৬
৬. নামাজের মধ্যে হাই উঠলে কী করবেন?
নামাজের মধ্যেও হাই উঠতে পারে। তখন:
- যথাসম্ভব হাই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবেন।
- মুখ খুলে গেলে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখবেন।
- কিরাত বা নামাজের মনোযোগ নষ্ট না করার চেষ্টা করবেন।
- ইচ্ছাকৃতভাবে শব্দ করবেন না।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যখন তোমাদের কেউ নামাজে হাই তোলে,
তখন সে যেন
যথাসম্ভব তা প্রতিহত করে।”
— সহিহ মুসলিম: ২৯৯৫
৭. হাই তোলা ও হাঁচির মধ্যে পার্থক্য
|
বিষয়
|
হাই তোলা
|
হাঁচি
|
|
ইসলামী নির্দেশ |
নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা |
আল্লাহর প্রশংসা করা |
|
মুখ ঢাকার বিধান |
মুখ ঢাকতে বলা হয়েছে |
মুখ ঢাকাও উত্তম আদব |
|
“আলহামদুলিল্লাহ” |
নির্দিষ্ট সুন্নাহ নয় |
হাঁচির পর সুন্নাহ |
|
“ইয়ারহামুকাল্লাহ” |
প্রযোজ্য নয় |
হাঁচিদাতার “আলহামদুলিল্লাহ” বলার পর বলা হয় |
সংক্ষেপে হাই তোলার সুন্নাহ
হাই উঠলে ৪টি বিষয় মনে রাখুন:
- যথাসম্ভব হাই আটকে রাখুন।
- মুখ হাত দিয়ে ঢেকে রাখুন।
- ইচ্ছাকৃত শব্দ করবেন না।
- নামাজে হলে মনোযোগ বজায় রাখুন।
সারকথা: কোরআনে হাই তোলা সম্পর্কে সরাসরি কোনো বিধান নেই। তবে সহিহ হাদিসে হাই তোলাকে নিয়ন্ত্রণ করা, মুখ ঢেকে রাখা এবং শব্দ না করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এটি ইসলামের সুন্দর আদব ও সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত।
৪
৪ মন্তব্য