পর্যায় সারণির পঞ্চরং
রসায়নের বাজারে এই ‘পর্যায় সারণি’ চিজটি হলো স্বয়ং চিত্রগুপ্তের খাতা! মেন্ডেলিভ সাহেব নামক এক রুশ হাকিম আফিংয়ের ঘোরে কিংবা ভদকার নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে একদিন স্বপ্ন দেখলেন এবং দুনিয়ার তাবৎ ভূত-প্রেত মার্কা মৌলিক পদার্থগুলোকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। ব্যস, তৈরি হয়ে গেল এক আজব চিড়িয়াখানা, যেখানে বাঘ আর ছাগলকে একই খাঁচায় পুরে রাখার রাজকীয় বন্দোবস্ত করা হয়েছে।
সারণির একদম বাঁয়ে, গ্রুপ-১ এ বসে আছেন লাইলি-মজনুর দল—হাইড্রোজেন, লিথিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম। এরা আবার যেমন-তেমন পাত্র নয়, ক্ষার ধাতু! এদের মেজাজ এতই চড়া যে জলের ছোঁয়া পেলেই একদম আতশবাজির মতো ফেটে পড়ে। এদের একটাই খাসলত—নিজের ঘরের ইলেকট্রনটি অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য এরা সারাক্ষণ ছটফট করছে। এ যেন সেই লখনৌয়ের নবাব, নিজের পকেটের শেষ আশরফিটি উজার করে না দিলে যার পেটের ভাত হজম হয় না।
আর ঠিক তার উল্টো দিকে, সারণির ডানে ওত পেতে বসে আছে হ্যালোজেন নামক একদল ডাকাত—ফ্লুরিন, ক্লোরিন, ব্রোমিন। রূপ-রঙে এরা খাসা, কিন্তু স্বভাবে একদম খলনায়ক। এদের কাজই হলো ওই বোকা নবাবদের ফুসলিয়ে ইলেকট্রন কেড়ে নেওয়া। সোডিয়াম আর ক্লোরিন যখন হাত মেলায়, তখন তৈরি হয় আমাদের পাতে দেওয়া নুন (NaCl)। ভাবুন একবার, দুই খ্যাপাটে পাগল মিলে তৈরি করল এমন এক নিরীহ জিনিস, যা না হলে বাঙালির ডাল-ভাতের কোনো ইজ্জত থাকে না!
তবে সবচেয়ে তাজ্জব ব্যাপার হলো সারণির একদম শেষের কলামটি। সেখানে বসে আছেন ‘নিষ্ক্রিয় গ্যাস’ নামক একদল পরম হংস! হিলিয়াম, নিওন, আর্গন। দুনিয়া রসাতলে যাক, কার্বন চার হাত বাড়িয়ে প্রেম করুক আর অক্সিজেন আগুন লাগাক—এঁদের কোনো বিকার নেই। এঁরা যেন কলকাতার কফি হাউজের সেই বুড়ো বাবু, যিনি কোণার টেবিলে বসে চুরুট ফুঁকছেন আর ভাবছেন, ‘দুনিয়ার সব ব্যাটাই ইডিয়ট!’ কোনো বিক্রিয়ায় এঁরা পা বাড়াবেন না, কোনো ইলেকট্রন দেবেনও না, নেবেনও না।
পরীক্ষার হলে বসে যখন এই সারণির ‘পর্যায়বৃত্ত ধর্ম’ মেলাতে যাই—আকার বাড়ে না কমে, ইলেকট্রন আসক্তি ডানে যায় না বাঁয়ে ঘোরে—তখন মগজের ঘিলু একদম কান্দাহারের বেদানা আর কাবুলের পেস্তার মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। একই গ্রুপে ওপর থেকে নিচে নামলে নাকি ব্যাসার্ধ বাড়ে! তা বাপু, ব্যাসার্ধ বাড়ুক আর কমুক, পরীক্ষার খাতায় আমাদের মার্কসের ব্যাসার্ধ যে ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে শূন্যের কোঠায় নামছে, সেই খবর মেন্ডেলিভ সাহেব রেখেছিলেন কি?
হে পর্যায় সারণির কারিগরগণ, তোমরা তো মৌলগুলোকে সাজিয়ে রেখে বৈকুণ্ঠে গিয়ে অমৃত সুধা খাচ্ছ, আর আমরা এখানে খাতার পাতায় ক্ষার আর অম্লের চক্করে পড়ে ডালহৌসি স্কয়ারের কেরানির মতো চোখের জল ফেলছি! এই সারণির গোলকধাঁধা থেকে পাস মার্কের ইজ্জতটুকু রক্ষা পেলে, আমি সোজা পুণ্ড্রবর্ধনের মাটিতে গিয়ে আখের গুড় দিয়ে ক্ষীর চড়াব আর রসায়নের বইখানা বুড়িগঙ্গায় বিসর্জন দেব!
১৪
২৪ মন্তব্য