সহকারী শিক্ষক
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ
বর্তমান সময়ে শিক্ষকদের জন্য সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে জানা কেন জরুরি?
বর্তমান সময়ে শিক্ষকদের জন্য সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে জানা কেন জরুরি?
মনিরুল হক,
গত ৮ সেপ্টেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে দেশের সকল মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক অনলাইন প্রশিক্ষণ কোর্স বাধ্যতামূলক করেছে। ইউনিসেফের কারিগরি সহায়তায় প্রস্তুত ছয়টি মডিউলের এই কোর্সটি সম্পন্ন করে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সনদ সংগ্রহ করতে হবে, নিজস্ব পিডিএস পরিচিতি ব্যবহার করে নায়েমের নির্ধারিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে। খবরটি দেখে সাধারণভাবে মনে হতে পারে, এটি নিছক আরেকটি প্রশাসনিক নির্দেশনা। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এর মধ্যে একটি বড় বার্তা লুকিয়ে আছে, রাষ্ট্র নিজেই এখন স্বীকার করে নিচ্ছে যে পাঠদান পদ্ধতি বা মূল্যায়ন কৌশলের পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞানও একজন শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতার অংশ হয়ে উঠেছে।
প্রশ্ন হলো, কেন এই মুহূর্তে বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল? উত্তর খুঁজতে হলে আগে বুঝতে হবে, শ্রেণিকক্ষের সংজ্ঞাটাই আসলে কীভাবে বদলে গেছে।
শ্রেণিকক্ষ আর দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেইঃ
কয়েক বছর আগেও একজন শিক্ষকের কাজের পরিধি ছিল মূলত শ্রেণিকক্ষ, খাতা দেখা আর অভিভাবক সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখন সেই একই শিক্ষক ফেসবুক গ্রুপে বাড়ির কাজ দিচ্ছেন, হোয়াটসঅ্যাপে অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, প্রয়োজনে অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছেন, এমনকি মোবাইলেই পরীক্ষার ফলাফল পাঠিয়ে দিচ্ছেন। প্রতিটি নতুন মাধ্যম কাজ সহজ করেছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে একজন প্রতারক বা হ্যাকারের জন্য একটি করে নতুন দরজাও খুলে দিয়েছে। যিনি জানেন না কীভাবে একটি সন্দেহজনক লিংক চিনতে হয়, তিনি নিজের অজান্তেই সেই দরজা খুলে দিতে পারেন।
শিক্ষক এখন তথ্যের রক্ষকঃ
আগে যে তথ্য কাগজের খাতায় বা রেজিস্টারে বন্দি থাকত, তার একটি বড় অংশ এখন মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারে জমা থাকে, শিক্ষার্থীর নাম, রোল নম্বর, ফলাফল, অভিভাবকের ফোন নম্বর, এমনকি জন্মনিবন্ধনের তথ্য পর্যন্ত। এই তথ্য ভুল হাতে চলে গেলে তার প্রভাব একটি ফাইল হারানোর মতো সাধারণ ঘটনা থাকে না।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সোফোসের বরাত দেওয়া সেন্টার ফর ইন্টারনেট সিকিউরিটির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় বিরাশি শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কোনো না কোনো সাইবার নিরাপত্তা ঘটনার শিকার হয়েছে। সোফোসের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন আরও বলছে, শিক্ষা খাতে ঘটে যাওয়া র্যানসমওয়্যার হামলার সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত কারণ ছিল ফিশিং, প্রায় বাইশ শতাংশ ঘটনার পেছনে যার ভূমিকা পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের নিজস্ব পরিসংখ্যান হয়তো এই মাত্রায় নেই, তবে প্রবণতাটি একই দিকে ইঙ্গিত করে, ডিজিটাল যোগাযোগ যত বাড়ছে, ঝুঁকির জায়গাও তত বাড়ছে।
শিক্ষক শিক্ষার্থীর জন্য একটি দৃষ্টান্তঃ
শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের আচরণ দেখেই শেখে, শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, দৈনন্দিন অভ্যাসও। একজন শিক্ষক নিজেই যদি অচেনা লিংকে ক্লিক করেন, বছরের পর বছর একই পাসওয়ার্ড বদলান না, বা অপরিচিত নম্বর থেকে আসা পুরস্কার জেতার বার্তায় বিশ্বাস করে ফেলেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণ শেখানোর নৈতিক ভিত্তিটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। উল্টো দিকে, একজন সচেতন শিক্ষক নিজের অভ্যাসের মধ্য দিয়েই শ্রেণিকক্ষের সবচেয়ে কার্যকর পাঠটি দিতে পারেন, কোনো বক্তৃতা ছাড়াই।
গবেষণা যা বলছেঃ
জার্নাল অব সাইবারসিকিউরিটি এডুকেশন, রিসার্চ অ্যান্ড প্র্যাকটিসে প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ফিশিং, হ্যাকিং বা পরিচয় চুরির মতো পরিচিত হুমকি সম্পর্কে শিক্ষকদের একটা সাধারণ ধারণা থাকলেও, তুলনামূলক নতুন ও জটিল ধরনের আক্রমণ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান সীমিত থেকে যাচ্ছে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ হলো, এই ফারাকটিই একজন শিক্ষককে অজান্তে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে, কারণ আক্রমণকারীরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পাল্টাচ্ছে। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় ভেরাইজনের ২০২৫ সালের বৈশ্বিক তথ্য লঙ্ঘন প্রতিবেদনের একটি তথ্যে, শিক্ষা খাতে ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন সংক্রান্ত সাইবার হামলার প্রায় ছিয়াশি শতাংশ ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়েছে চুরি যাওয়া লগইন তথ্য, যার একটি বড় উৎস দুর্বল বা বারবার ব্যবহৃত পাসওয়ার্ড।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় সাধারণ কিছু ঝুঁকিঃ
ক. ফেসবুক, ইমেইল ও বিদ্যালয়ের পোর্টালে একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা।
খ. পরিচিত নম্বর সেজে আসা প্রতারণামূলক বার্তা বা বিকাশ কিংবা নগদের ভুয়া লেনদেনের ফাঁদে পা দেওয়া।
গ. শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য বা প্রশ্নপত্র অসতর্কভাবে খোলা গ্রুপে শেয়ার করে ফেলা।
ঘ. ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রচার করা, যেখানে আইডি হ্যাক হলে সেই তথ্যও ঝুঁকিতে পড়ে যায়।
ঙ. সন্দেহজনক কিছু ঘটলে কার কাছে জানাতে হবে, তা না জানা।
করণীয়ঃ
ক. প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা ও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড রাখা, এবং যেখানে সুযোগ আছে সেখানে দ্বিস্তর যাচাই চালু রাখা।
খ. অচেনা লিংক বা সংযুক্তিতে ক্লিক করার আগে প্রেরকের পরিচয় ভালোভাবে যাচাই করা।
গ. ব্যক্তিগত ও পেশাগত যোগাযোগের মাধ্যম যতটা সম্ভব আলাদা রাখা।
ঘ. মাউশি ও নায়েমের নতুন সাইবার নিরাপত্তা কোর্সের মতো প্রশিক্ষণকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না দেখে বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ হিসেবে নেওয়া।
ঙ. সন্দেহজনক কিছু নজরে এলে তা প্রতিষ্ঠান প্রধান বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো, নিজে থেকে বিষয়টি চেপে না রাখা।
সাইবার নিরাপত্তা শেখার অর্থ এই নয় যে একজন শিক্ষককে হঠাৎ প্রযুক্তিবিদ হয়ে উঠতে হবে। এর মূল কথা বরং সহজ, সচেতন থাকা এবং সন্দেহজনক কিছু দেখলে থেমে ভাবার অভ্যাস গড়ে তোলা। প্রযুক্তি প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে আরও গভীরভাবে ঢুকে পড়ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর শিক্ষা উপকরণ থেকে শুরু করে অনলাইন মূল্যায়ন পর্যন্ত। এই পরিবর্তনের মধ্যে একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে সাধারণ অথচ দৃঢ় একটি সতর্কতাবোধ, যা তাকে এবং তার শিক্ষার্থীদের, উভয়কেই নিরাপদ রাখে।
মোঃ মনিরুল হক
সহকারী শিক্ষক,
আমলাবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়,
খোকসা, কুষ্টিয়া
০১৭২২ ২৭৩২৭২
১৪
২৪ মন্তব্য