Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:৩৯ অপরাহ্ণ

সুলতানুল-আবারিক — «سُلْطَانُ الأَبَارِيقِ»

😆😆 সুলতানুল-আবারিক — «سُلْطَانُ الأَبَارِيقِ» 📢📢


এক শহরে ছিল একটি পুরোনো গোসলখানা। সেখানে প্রতিদিন বহু মানুষ গোসল করতে আসত। গোসলের জন্য সারিবদ্ধভাবে রাখা থাকত অসংখ্য বদনা বা পানির পাত্র। মানুষ প্রয়োজনমতো একটি বদনা নিয়ে পানি ব্যবহার করত, কাজ শেষে সেটি আবার নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে যেত।

সেই বদনাগুলোর দেখাশোনার দায়িত্বে ছিল এক ব্যক্তি।

তার কাজ ছিল খুবই সামান্য—


বদনাগুলো ঠিকঠাক রাখা, প্রয়োজন হলে তাতে পানি ভরে দেওয়া এবং মানুষকে সেগুলো ব্যবহার করতে দেওয়া।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, লোকটি তার এই ছোট্ট দায়িত্বটিকেই বিশাল এক কর্তৃত্বের আসন বানিয়ে ফেলেছিল। মনে হতো, গোটা গোসলখানার রাজত্বই যেন তার হাতে!


একদিন এক ব্যক্তি খুব তাড়াহুড়ো করে গোসলখানায় এলেন। সামনে একটি বদনা দেখতে পেয়ে সেটি হাতে নিয়ে ভেতরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।


হঠাৎ পেছন থেকে বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ এলো—


“এই! দাঁড়াও! ফিরে এসো!”


লোকটি থমকে দাঁড়ালেন। ফিরে এসে বললেন,

—“কী হয়েছে?”


বদনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি গম্ভীর মুখে বলল,

—“তুমি যে বদনাটা নিয়েছ, সেটা রেখে দাও। ওটা নয়, পাশের বদনাটা নাও।”


লোকটি অবাক!

সে প্রথম বদনাটি রেখে পাশের বদনাটি হাতে নিল। তারপর আর কোনো কথা না বলে গোসল করতে চলে গেল।

গোসল শেষে বদনাটি যথাস্থানে রেখে কৌতূহল সামলাতে না পেরে সে আবার লোকটির কাছে ফিরে এল।

বলল—

—“ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”


—“করো।”


—“আমি যে বদনাটা প্রথমে নিয়েছিলাম, আর আপনি যে বদনাটা নিতে বললেন—দুটোর মধ্যে তো কোনো পার্থক্যই নেই! দুটোতেই পানি রাখা যায়, দুটো দিয়েই গোসল করা যায়। তাহলে আমাকে এত দূর থেকে ফিরিয়ে এনে বদনাটা পরিবর্তন করালেন কেন?”


লোকটি বুক ফুলিয়ে, অত্যন্ত গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল—

“তাহলে এখানে আমার কাজটা কী?”

«فما هو عملي هنا إذن؟»

ব্যস!

এই একটি বাক্যই পুরো গল্পের প্রাণ।


তার কাছে মূল বিষয় ছিল না—মানুষটি কোন বদনা ব্যবহার করছে।


মূল বিষয় ছিল—মানুষটি যেন বুঝতে পারে, এখানে একজন “কর্তাব্যক্তি” আছেন!


সেই থেকে এমন মানুষকে ব্যঙ্গ করে বলা হয়—

“সুলতানুল-আবারিক” — বদনার সুলতান!

অর্থাৎ, যার হাতে সামান্য দায়িত্ব এসেছে, কিন্তু সে সেই সামান্য দায়িত্বকে এমনভাবে ব্যবহার করে যেন সে বিরাট কোনো সাম্রাজ্যের সম্রাট।


👇👇গল্পের শিক্ষণীয় বিষয় :-


১. ছোট দায়িত্ব মানেই বড় কর্তৃত্ব নয় কোনো দায়িত্ব পাওয়া মানে মানুষের ওপর অহেতুক কর্তৃত্ব করার লাইসেন্স পাওয়া নয়। দায়িত্বের প্রকৃত সৌন্দর্য হলো সেবা করা, ক্ষমতা প্রদর্শন করা নয়।


২. অপ্রয়োজনীয় নিয়ম তৈরি করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়

যেখানে কোনো পার্থক্য নেই, সেখানে শুধু কর্তৃত্ব দেখানোর জন্য নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া প্রতিষ্ঠান ও মানুষের—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।


৩. ক্ষমতা মানুষের চরিত্রের পরীক্ষা নেয় মানুষের হাতে ক্ষমতা এলে তার প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায়। কেউ ক্ষমতাকে সেবার মাধ্যম বানায়, আর কেউ সেটিকে অহংকারের অস্ত্র বানায়।


৪. কাজের চেয়ে কর্তৃত্বকে বড় করা বিপজ্জনক “আমার কাজ কী?”—এই প্রশ্নটি যদি মানুষের কল্যাণের বদলে নিজের কর্তৃত্ব প্রমাণের জন্য হয়, তাহলে সেই দায়িত্ব অচিরেই হাস্যকর হয়ে ওঠে।


৫. অযথা জটিলতা সৃষ্টি করা নেতৃত্ব নয় ভালো প্রশাসক জটিল বিষয়কে সহজ করেন। আর দুর্বল প্রশাসক অনেক সময় সহজ বিষয়কেও জটিল করে নিজের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করতে চান।


৬. পদ বড় নয়, দায়িত্ব পালনের মান বড় একজন ছোট কর্মচারীও মহান হতে পারেন, যদি তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। আবার বড় পদে থেকেও কেউ হাস্যকর হয়ে যেতে পারেন, যদি তিনি পদমর্যাদাকে অহংকারের কারণ বানান।


৭. কর্তৃত্বের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কল্যাণ ক্ষমতা, পদ ও দায়িত্ব—এসব মানুষের কাজ সহজ করার জন্য; মানুষের জীবন কঠিন করার জন্য নয়।


৮. অহংকার মানুষকে হাসির পাত্রে পরিণত করে যে ব্যক্তি সামান্য ক্ষমতা পেয়েই নিজেকে অপরিহার্য মনে করেন, মানুষ একসময় তাকে সম্মান না করে ব্যঙ্গ করতে শুরু করে।


৯. প্রতিষ্ঠানে “বদনার সুলতান” তৈরি হলে অগ্রগতি থেমে যায়। অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা যেকোনো সংগঠনে যখন কেউ নিজের ছোট্ট দায়িত্বকে ব্যক্তিগত ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত করেন, তখন কাজের গতি কমে যায়, মানুষ বিরক্ত হয় এবং পরিবেশ নষ্ট হয়।


১০. সত্যিকারের নেতৃত্ব মানুষকে বলে—“কীভাবে সাহায্য করতে পারি?” আর কৃত্রিম নেতৃত্ব বলে—“আমার অনুমতি ছাড়া কিছু হবে না!”


👇👇 শেষকথা :-

“সুলতানুল-আবারিক” তাই শুধু একটি হাসির গল্প নয়; এটি আমাদের চারপাশের এক শ্রেণির মানুষের আয়না। কারও হাতে যদি একটি বদনার দায়িত্ব থাকে, সে যেন নিজেকে বদনার সুলতান মনে না করে।


কারণ— 

দায়িত্ব মানুষকে বড় করে না; দায়িত্ব পালনের মহত্ত্বই মানুষকে বড় করে। পদ যত ছোটই হোক, সেবার মানসিকতা থাকলে মানুষ মহান হয়; আর পদ যত বড়ই হোক, অহংকার থাকলে সে “বদনার সুলতান” হয়।


#তথ্যসূত্র: অনলাইন। তবে এই গল্পটি প্রথম শুনেছিলাম আমার সাবেক কর্মস্থল এর পরম শ্রদ্ধাভাজন পরিচালক জর্ডানের নাগরিক জনাব সুবহী সুলাইমান মুহাম্মদ জারাদাত স্যারের কাছে।

মন্তব্য করুন