সহকারী শিক্ষক
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:০৮ পূর্বাহ্ণ
শুকনো ঝালের বাবু!!!!
শুকনো ঝালের বাবু!
আমার জীবনে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। কারও সঙ্গে দেখা হয়েছে, কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে, কারও সঙ্গে হয়েছে বেশ ভাবের আদান-প্রদান। কত মানুষ এসেছে জীবনে, কত মানুষ হারিয়ে গেছে সময়ের স্রোতে! কাউকে মনে রেখেছি, কাউকে ভুলে গেছি। কাউকে ভালো চোখে দেখেছি, কাউকে দেখেছি একটু বাঁকা চোখে। এটাই বোধ হয় জীবন। এখানে সব মানুষ এক রকম নয়, সব অভিজ্ঞতাও এক ছাঁচে তৈরি হয় না।
তা যা-ই হোক, আজ এক অদ্ভুত প্রজাতির মানুষ নিয়ে কিছু বলতে চাই। তবে সরাসরি মানুষটির প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটা গল্প বলে নেওয়া যাক।
এক বউ তার বরকে বলল, বাজার থেকে একটা গ্যাস লাইট কিনে আনতে। বরটি বাজারে গেল, বাজার-সদাইও করল, কিন্তু গ্যাস লাইট কেনার কথাটাই বেমালুম ভুলে গেল। বাড়ি ফিরে বউয়ের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে শেষ মুহূর্তে বুদ্ধি খাটিয়ে কিনে আনল এক আঁটি শুকনা ঝাল!
বাড়িতে ঢুকতেই বউয়ের প্রশ্ন, — তোমাকে গ্যাস লাইট কিনে আনতে বললাম, আর তুমি কিনে আনলে শুকনা ঝাল! ব্যাপারটা কী?
বরটি একটুও ঘাবড়াল না। বরং এমন এক আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে উত্তর দিল, যেন বাজার থেকে ভুল জিনিস কেনা নয়, সে রীতিমতো যুগান্তকারী কোনো আবিষ্কার করে এসেছে!
বলল, — আরে, গ্যাস লাইট তো এক জায়গায় আলো দেবে। কিন্তু শুকনা ঝাল যেখানে রাখবে, সেখানেই আলো দেবে!
ব্যস! যুক্তি শুনে বউয়ের কী অবস্থা হয়েছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। গ্যাস লাইটের সঙ্গে শুকনা ঝালের কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু লোকটির যুক্তিতে দুটোই আলোকিত হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে!
আসলে কিছু মানুষ আছে, যারা ভুল করলেও স্বীকার করে না। বরং এমনভাবে ভুলের ব্যাখ্যা দেয়, ভুলটাকেই একসময় সঠিক বলে মনে হতে শুরু করে। এরা যুক্তির কাছে হার মানে না, কারণ যুক্তির সঙ্গে এদের পরিচয় যতটা না, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরিচয় তার চেয়ে অনেক বেশি!
আমার পরিচিত একজন মানুষও ছিল ঠিক এই গোত্রের। নামটা আজ আর বলছি না। লোকটি মোটামুটি সচ্ছল পরিবারের সন্তান। সমাজে পরিচিতিও ছিল, মুখচেনা মানুষও বটে। তবে তার একটা অসাধারণ গুণ ছিল—সে অনর্গল মিথ্যা বলতে পারত। এমন মিথ্যা, এমন অবলীলায় মিথ্যা, এমন বুক ফুলিয়ে মিথ্যা—মাঝেমধ্যে মনে হতো, সত্য কথাটা বললে বোধ হয় তার জ্বর এসে যাবে!
লোকটি আসলে কিছুই পারত না। কিন্তু তার মুখের কথা শুনলে মনে হতো, পৃথিবীর তাবৎ প্রতিভা বুঝি একা তার শরীরেই এসে আশ্রয় নিয়েছে। অন্যরা যে কাজ শেখে, অনুশীলন করে, বছরের পর বছর পরিশ্রম করে দক্ষতা অর্জন করে, সে নাকি সেসব কাজ জন্মের পর থেকেই জানে! শুধু জানে না, অন্যদের চেয়ে ভালো জানে!
ধরুন, লঞ্চে উঠেছেন। লঞ্চের সারেং নদীর বাঁক বুঝে, স্রোত বুঝে, বাতাস বুঝে লঞ্চ চালাচ্ছেন। আমাদের এই মহাপুরুষ পাশে থাকলে নির্ঘাত বলে বসবেন, ‘আরে, এ আর এমন কী! আমি হলে এর চেয়ে ভালো চালাতাম!’
বাসে উঠলে বাসের চালকও নিরাপদ নন। তাঁরও চালানোর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এই ভদ্রলোক এমন ভাব করবেন, যেন বাসের স্টিয়ারিংটা তাঁর হাতে তুলে দিলেই বাস সোজা লন্ডন পৌঁছে যাবে!
কবিতার কথা উঠলে তিনি কবি। সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হলে সাহিত্যিক। পৃথিবীর কোন ছন্দে কবিতা লেখা হয়, কোন শব্দে কাব্যিক আবেগ তৈরি হয়, সেসব নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা নেই। কবিতা লিখতে পারেন কি না, সেটাও বড় কথা নয়; তাঁর আত্মবিশ্বাসের কাছে কবিতারও বোধ হয় পরীক্ষা দিতে হবে!
আর ফুটবল? ওরে বাবা, ফুটবলের কথা উঠলে তো তিনি একেবারে অন্য মানুষ! সেখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি—এমনকি ফুটবলের ইতিহাসের সব কিংবদন্তিকে একসঙ্গে মাঠে নামিয়ে দিলেও বোধ হয় তিনি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ প্রকাশ করবেন না।
পৃথিবীর সব খেলোয়াড় মাঠে ঘাম ঝরিয়ে অনুশীলন করেন, আর আমাদের এই মহাপ্রতিভা কথার মাঠেই বিশ্বকাপ জিতে বসে আছেন! তাঁর পায়ে বল দেওয়ার দরকার নেই, মুখ খুললেই গোল! প্রতিপক্ষের গোলপোস্ট দূরে থাক, শ্রোতাদের ধৈর্যটাই আগে ভেঙে পড়ে!
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, তাঁকে কোনো কাজ করতে দেখলে হয়তো বোঝাই যাবে না যে তিনি সেই কাজের ‘বিশ্ববিশারদ’। কিন্তু তাঁর মুখে নিজের কীর্তিকলাপের বিবরণ শুনলে মনে হবে, পৃথিবীর সব বড় বড় প্রতিষ্ঠান বুঝি তাঁকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য দরজায় লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে!
এমন মানুষকে দেখে আমার মাঝে মাঝে মনে হতো, পৃথিবীতে প্রতিভার অভাব নেই, অভাব শুধু প্রতিভা প্রমাণের। আর কারও কারও ক্ষেত্রে তো প্রতিভা না থাকলেও চলে—থাকতে হবে শুধু প্রতিভার বিবরণ দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা!
সত্যি বলতে কী, মানুষটি যদি নিজের বলা কথার অর্ধেকও পারত, তাহলেও হয়তো এত দিনে পৃথিবীর কোনো না কোনো ক্ষেত্রে একটা ইতিহাস তৈরি করে ফেলত। কিন্তু বাস্তবতা বড় নিষ্ঠুর! সেখানে শুধু মুখের জোরে লঞ্চ চলে না, বাস চলে না, কবিতা হয় না, ফুটবলও খেলা যায় না।
তবে একটা বিষয়ে লোকটির দক্ষতা ছিল অসাধারণ—নিজের অক্ষমতাকে এমন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঢেকে রাখা, যেন সেটাই তার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা!
আর এই দক্ষতার জন্য কোনো পুরস্কার দেওয়া হলে, আমার ধারণা, তিনি শুধু পুরস্কার গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হতেন না; বরং আয়োজকদের বুঝিয়ে দিতেন, পুরস্কারটা তাঁকে নয়, পুরস্কারটাকেই দেওয়া হয়েছে তাঁর সম্মান বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে!
০
০ মন্তব্য