Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের জাতিগোষ্ঠী ও পাহাড়-সমতলে দ্বন্দ্ব

জাতিগত পরিচয়, আদিবাসী বিতর্ক ও পারস্পরিক সহাবস্থান প্রশ্নের মিমাংসা? 


বাংলাদেশে বসবাসকারী মানুষের জাতিগত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নতুন কিছু নয়। এ ভূখণ্ডে কারা প্রথম বসতি স্থাপন করেছিল, কোন জনগোষ্ঠী কোথা থেকে কখন এসেছে, কার সঙ্গে কার সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক সংমিশ্রণ ঘটেছে—এসব বিষয়ে ইতিহাসবিদ ও নৃতাত্ত্বিকদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। নেগ্রিটো, অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠী সম্পর্কে প্রচলিত বিভিন্ন ধারণাও এ আলোচনার অংশ। তবে নাগরিক পরিচয়ের প্রশ্নে আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। এখানেই প্রশ্ন ওঠে—পাহাড়ি ও সমতলের মানুষের জাতিগত পরিচয় নিয়ে বারবার বিতর্ক ও সংঘাত কেন? এর পেছনে কি কেবল রাজনীতি, নাকি রয়েছে ইতিহাস, ভূমির অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও রাষ্ট্রীয় নীতির মতো আরও জটিল বিষয়?


আদিবাসী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, উপজাতি—পরিচয়ের বিতর্ক


পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সরকারি আইন ও প্রশাসনিক পরিভাষায় ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দটির ব্যবহার রয়েছে। সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’-এর অনন্য স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশের কথা বলা হয়েছে। ফলে এ বিষয়ে আইনি ও সামাজিক আলোচনায় শব্দগুলোর যথাযথ ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।


‘আদিবাসী’ শব্দটি কেবল একটি পরিচয়সূচক শব্দ নয়; আন্তর্জাতিক পরিসরে এটি ঐতিহাসিকভাবে কোনো ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক, স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, সামাজিক পরিচয় এবং বিভিন্ন অধিকারসংক্রান্ত আলোচনার সঙ্গেও যুক্ত। তাই শব্দটির ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও অধিকারকে উপেক্ষা করা সমাধানের পথ হতে পারে না।


তবে প্রশ্ন থেকে যায়—পাহাড়ে বসবাসকারী চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা সমতলে বসবাসকারী সাঁওতাল, গারোসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীকে ‘জাতি’ হিসেবে পরিচয় দিতে অসুবিধা কোথায়? তারা কেনো কেবল ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে পরিচিত হবে? ‘উপজাতি’ বলতে যদি কোনো বৃহত্তর জাতির অংশ বোঝানো হয়, তাহলে কোন বৃহত্তর জাতির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক—সে বিষয়েও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।


একইভাবে প্রশ্ন করা যায়, বাঙালিরা কোন জাতির উপজাতি? বাঙালি যেমন একটি স্বতন্ত্র জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অধিকারী, তেমনি চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল ও গারো জনগোষ্ঠীরও নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জাতিগত পরিচয় রয়েছে।


আমার মতে, জাতিগত পরিচয়ের প্রশ্নে অযথা শ্রেণিবিন্যাস বা হীনমন্যতা তৈরির পরিবর্তে প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর স্বাতন্ত্রকে স্বীকার করা জরুরি। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ন্যায্য মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সব নাগরিকের ক্ষেত্রে আইন মানা, অন্যের অধিকার ও সম্পত্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং পারস্পরিক দায়িত্ব পালনের নীতিও সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।


বাংলাদেশে বসবাসকারী জাতিগোষ্ঠী: সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর চূড়ান্ত জাতীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১৬ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৮ জন—মোট গণনাকৃত জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। অন্যদিকে, বাঙালিরা দেশের বৃহত্তম জাতিগত ও ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠী। তবে জনশুমারির ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শ্রেণি এবং জাতিগত পরিচয়ের বৃহত্তর সামাজিক ধারণা এক বিষয় নয়।


সরকারি গেজেটভুক্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা ৫০টি বলে ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদে জানানো হয়েছে।


বাংলাদেশের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য জাতিগোষ্ঠীর পরিচয়


১. বাঙালি


বাঙালি একটি স্বতন্ত্র ভাষাভিত্তিক ও সাংস্কৃতিক জাতি। দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় এ অঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণ, ভাষার বিবর্তন, সামাজিক বিনিময় এবং নানা সভ্যতার প্রভাবের মধ্য দিয়ে বাঙালি পরিচয় গড়ে উঠেছে। বাঙালি জাতির ইতিহাসকে কোনো একক নৃতাত্ত্বিক উৎস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।


বসবাস: সমগ্র বাংলাদেশ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।


জনসংখ্যা: বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বাঙালি। প্রায় ১৭ কোটি ৮০ লাখ।


ধর্ম: ইসলাম, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, খ্রিষ্টধর্মসহ বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী বাঙালি রয়েছেন।


ভাষা: বাংলা।


প্রধান উৎসব: ঈদ, পহেলা বৈশাখ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা, বড়দিনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব।


২. চাকমা


চাকমা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী। তাদের ইতিহাস ও উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত রয়েছে। চম্পকনগর, আরাকান ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে চাকমাদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক নিয়ে নানা বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে তাদের উৎপত্তি ও অভিবাসনের নির্দিষ্ট সময়ক্রম সম্পর্কে সব বিবরণ সমানভাবে প্রমাণিত নয়।


বসবাস: প্রধানত রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি; এ ছাড়া বান্দরবানসহ দেশের অন্যান্য স্থানেও চাকমাদের বসবাস রয়েছে।


জনসংখ্যা: জনশুমারি ২০২২-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে প্রায় ৪ লাখ ৮৩ হাজার ২৯৯ জন।


ধর্ম: প্রধানত বৌদ্ধধর্ম।


ভাষা: চাকমা ভাষা, যা ‘চাঙমা ভাচ’ নামেও পরিচিত।


লিপি: চাকমা লিপি।


প্রধান উৎসব: বিজু।


৩. মারমা


মারমা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি উল্লেখযোগ্য জাতিগোষ্ঠী। তাদের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মিয়ানমারের আরাকান বা বর্তমান রাখাইন অঞ্চলের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। মারমাদের ভাষা, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস ও উৎসবে এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন দেখা যায়।


বসবাস: প্রধানত বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি; এ ছাড়া পটুয়াখালী ও বরগুনাসহ দেশের অন্য কিছু এলাকাতেও মারমাদের বসবাস রয়েছে।


জনসংখ্যা: জনশুমারি ২০২২-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার ২৯৯ জন।


ধর্ম: প্রধানত থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম।


ভাষা: মারমা ভাষা।


প্রধান উৎসব: সাংগ্রাই।


৪. ত্রিপুরা


ত্রিপুরা একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী, যাদের বসবাস ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চলে। তাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, লোকসংস্কৃতি, সামাজিক ঐতিহ্য ও উৎসব।


বসবাস: প্রধানত খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান; এ ছাড়া কুমিল্লাসহ অন্যান্য এলাকাতেও বসবাস রয়েছে।


জনসংখ্যা: জনশুমারি ২০২২-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬২০ জন।


ভাষা: ককবরক।


ধর্ম: হিন্দুধর্মসহ বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুসারী রয়েছেন।


প্রধান উৎসব: বৈসু। বৃহত্তর পার্বত্য অঞ্চলে বৈসু, সাংগ্রাই ও বিজু উৎসবের সমন্বিত উদ্‌যাপন ‘বৈসাবি’ নামে পরিচিত।


৫. সাঁওতাল


সাঁওতাল দক্ষিণ এশিয়ার একটি বৃহৎ আদিবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। তাদের ঐতিহাসিক বিস্তৃতি ভারতের ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও ওডিশাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে। বাংলাদেশেও সাঁওতালদের দীর্ঘদিনের বসতি রয়েছে। কৃষি, লোকসংগীত, নৃত্য ও নিজস্ব সামাজিক ঐতিহ্য তাদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


বসবাস: রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর, রংপুর, জয়পুরহাটসহ উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায়।


জনসংখ্যা: জনশুমারি ২০২২-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার ৪৯ জন।


ভাষা: সাঁওতালি।


ধর্ম: ঐতিহ্যগতভাবে প্রকৃতি ও পূর্বপুরুষকেন্দ্রিক ধর্মীয় বিশ্বাসের চর্চা রয়েছে; পাশাপাশি হিন্দুধর্ম ও খ্রিষ্টধর্মের অনুসারীও রয়েছেন। ‘ঠাকুরজিউ’ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।


প্রধান উৎসব: সোহরাই ও বাহা।


৬. গারো (আ·চিক)


গারো বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী। তাদের বৃহত্তর ঐতিহাসিক বিস্তৃতি ভারতের মেঘালয় ও আশপাশের অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত। গারোদের নিজস্ব ভাষা, মাতৃসূত্রীয় সামাজিক ঐতিহ্য, সংগীত, নৃত্য ও উৎসব রয়েছে।


বসবাস: প্রধানত ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, টাঙ্গাইলের মধুপুর, জামালপুর, গাজীপুর এবং সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের কিছু এলাকায়।


জনসংখ্যা: জনশুমারি ২০২২-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে প্রায় ৭৬ হাজার ৮৪৬ জন। 


ভাষা: গারো ভাষা; নিজেদের পরিচয়ে ‘আ·চিক’ নামটিও ব্যবহৃত হয়।


ধর্ম: বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ গারো খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী। ঐতিহ্যগত ধর্মীয় বিশ্বাস ‘সংসারেক’-এর অনুসারীও রয়েছেন।


প্রধান উৎসব: ওয়ানগালা।


পাহাড়-সমতলের দ্বন্দ্ব: সমাধান কোথায়?


বাংলাদেশের পাহাড় ও সমতলের মানুষের মধ্যে সম্পর্ককে কেবল জাতিগত পরিচয়ের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে বাস্তব সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। ভূমির মালিকানা ও ব্যবহার, ঐতিহাসিক অভিবাসন, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য, নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস—এসব বিষয়ও সংঘাতের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার কারণ নির্ধারণ করতে হলে প্রমাণ ও প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।


পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বাঙালিসহ সব জনগোষ্ঠীর জীবন, সম্পদ, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করা কিংবা তার পরিচয়কে হেয় করা সমস্যার সমাধান নয়।


একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জাতিগত পরিচয় নিয়ে মতভিন্নতা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতভিন্নতা যেন বৈষম্য, বিদ্বেষ কিংবা সহিংসতার কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। প্রয়োজন নিরপেক্ষ ইতিহাসচর্চা, ন্যায়সংগত ভূমিনীতি, কার্যকর সংলাপ, আইনের সমান প্রয়োগ এবং সব জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা।


[email protected]

24 October, 2026


তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর জাতীয় প্রতিবেদন ও প্রাথমিক প্রতিবেদন; বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদ; বাংলাপিডিয়া; এবং সংশ্লিষ্ট জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে প্রকাশিত ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক তথ্য।

মন্তব্য করুন

ব্লগ